নিজস্ব সংবাদদাতা : বুধবার বিজেপির রাজ্য সভাপতির চেয়ারে শমীক ভট্টাচার্যের বসা কার্যত নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলেও, এই অধ্যায়ের পিছনে আছে রাজনৈতিক দীর্ঘ ছায়া। এর মধ্যে লুকিয়ে আছে রাজ্যের বিজেপির অন্তর্দ্বন্দ্ব, নেতৃত্বের আস্থা আর প্রাক্তন ও বর্তমান নেতৃত্বের অবস্থান নিয়ে জটিল হিসাবনিকাশ। সদ্য নির্বাচিত রাজ্য সভাপতিকে সংবর্ধনা দিতে ডাক নেই দিলীপ ঘোষের, এ যে নিছক ‘ডাক না পাওয়া’র ঘটনা নয়, বরং এটা দলীয় অভ্যন্তরীণ রাজনীতির জটিল সংকেত। এক সময়ে বাংলায় বিজেপির ‘মুখ’ বলা হত দিলীপকে। রাজ্য সভাপতি হিসেবে গেরুয়া শিবিরকে রাজনীতির মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনার নেপথ্যে তাঁর ভূমিকা কম নয়। মোদী-শাহ জমানায় বাংলার রাজনীতিতে বিজেপির প্রথম শক্তিশালী প্রধান বিরোধী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল দিলীপ। কিন্তু সেই দিলীপই আজ একরকম একঘরে।
দলীয় সূত্র বলছে, দিঘার জগন্নাথ ধামের অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে একই মঞ্চ ভাগ করে নেওয়াই নাকি দিলীপের ‘অপরাধ’। অথচ বাংলার রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রশাসনিক বা ধর্মীয় মঞ্চে শাসক-বিরোধী একসঙ্গে যাওয়া নতুন কিছু নয়। তবে বিজেপির একাংশের চোখে এটিই হয়ে গেছে ‘দল বিরোধী’ সখ্যতার প্রমাণ।
বস্তুত, দিলীপ ঘোষের অবস্থান নিয়ে বিজেপির মধ্যে দ্বন্দ্ব নতুন নয়। শমীক ভট্টাচার্য সভাপতি হওয়া মানে শুধু নতুন মুখ নয়, বরং একটা স্পষ্ট বার্তা দল চাইছে নতুন নেতৃত্বকে সামনে আনতে। দিলীপদের মতো পুরনো প্রভাবশালী মুখগুলোকে ধীরে ধীরে প্রান্তে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক, কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষকের সফর, এমনকি জনসংযোগ কর্মসূচি সবেতেই দিলীপ অনুপস্থিত। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, বিজেপি রাজনীতিতে ‘প্রাক্তন সভাপতি’ শব্দটি নিছক আলঙ্কারিক নয়। এমন পদমর্যাদার নেতাকে প্রকাশ্যে এভাবে অগ্রাহ্য করা দলের ভিতরে ঘটলার বার্তা ছড়িয়ে দেয়। ফলে দিলীপকে ঘিরে গুঞ্জনও অস্বাভাবিক নয়।
এই প্রেক্ষাপটে শমীক ভট্টাচার্যের কাছে আসল চ্যালেঞ্জ হবে দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখা। রাজ্য বিজেপি বিগত কয়েক বছরে বারবার দেখেছে, গোষ্ঠীদ্বন্দ্বে ক্ষতিগ্রস্ত হতে কত কম সময় লাগে। শুভেন্দু অধিকারীর মতো হেভিওয়েট নেতা, দিলীপ ঘোষের মতো অভিজ্ঞ ‘মাঠের মানুষ’ এবং কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের মধ্যে ভারসাম্য রাখা সহজ নয়। তৃণমূল যেখানে বিধানসভায় সংখ্যার বিচারে অদম্য, সেখানে বিজেপির পক্ষে শক্তি ধরে রাখতে গেলে আভ্যন্তরীণ বিভাজনই সবচেয়ে বড় বিপদ।
সবচেয়ে বড় কথা, শমীকের মতো নেতার রাজনৈতিক চেহারা ভদ্র, মার্জিত এবং বুদ্ধিজীবী ভাবমূর্তির। দিলীপ ঘোষ ছিলেন এর ঠিক উল্টো মেরুতে । খোলা গলায় আক্রমণাত্মক মন্তব্য, রাস্তায় নেমে লড়াই করার রাজনীতি। নতুন সভাপতি কীভাবে এই দুই ধারার সমন্বয় ঘটান, সেটাই দেখার বিষয়। সব মিলিয়ে বিজেপির রাজ্য রাজনীতিতে নতুন সভাপতি নির্বাচন যত না নতুন রাস্তায় এগোনোর সংকেত, তার চেয়ে বেশি ইঙ্গিত দিচ্ছে পুরনো দ্বন্দ্বের নতুন অধ্যায়ের।
