অসীম সেন
দশভূজার সামনে এগরোল ভক্ষণ নিয়ে শাস্ত্র কী বলেছে তা আলোচনার বিষয় নয়। দুর্গাপুজো নিয়ে ভক্তি আর আবেগ দড়ি টানাটানিতে জিতবে কে ? সেটাও আলোচনা থেকে সরিয়ে রাখা যাক। তাহলে আলোচনা কী নিয়ে হতে পারে ? আপাতত কিছু ফ্যাক্ট মাথার মধ্যে আকুলি বিকুলি করছে গোটা বঙ্গবাসীর। সেটা কী ? একটা মত উঠে আসছে দুর্গা পুজোয় নিরামিষাশী থাকাই বাঞ্চনীয়। প্রথম কথা, বিশ্বহিন্দু পরিষদ এরকম মুচলেকা জারি করেনি কখনও। তবুও কথা যখন উঠলই তাহলে বলা যেতে পারে বাংলায় দুর্গাপুজো মূলত শাক্ত মতে হয়। এছাড়াও বৈষব মতে এমনকি শৈব মতেও দেবীর আরাধনা হয়ে থাকে। শাক্ত মতে দেবী দুর্গাকে পরমাপ্রকৃতি, বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের আদিশক্তি ও মহিষাসুরমর্দিনী রূপেই পুজো করা হয়। কালিকা পুরাণ বা চণ্ডীপাঠের মাধ্যমে এই পুজো হয় এবং এই প্রথায় বলির প্রচলনও রয়েছে। গৌড়ীয় বৈষ্ণব ও ভাগবত পুরাণ অনুসারে, দেবী দুর্গা পরম শক্তির প্রকাশ হলেও তিনি শ্রীকৃষ্ণের ইচ্ছায় এই জগৎ পরিচালনা করেন। বৃহৎ নন্দীকেশ্বর পুরাণ বা ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ অনুযায়ী বৈষ্ণব মতেও দুর্গা পুজো হয়ে থাকে, যেখানে নিরামিষ উপাচার ও আত্মনিবেদনের ওপর বেশি জোর দেওয়া হয়। এছাড়াও দেবাদিদেবের অর্ধাঙ্গিনী হওয়ার কারণে হরগৌরী রূপে দেবীর পুজো হয় শৈব মতেও। আগেই বলা হয়েছে বাংলায় দেবী দুর্গার আরাধনা হয় মূলত শাক্ত মতে। তাই আমিষ ভোগের চল রয়েছে। এমনকি বেলুড় মঠের দুর্গাপুজোয় বিবেকানন্দের সময় থেকেই আমিষ ভোগ দেওয়া হয়। সেখানে মহাসপ্তমী, মহা অষ্টমী ও মহানবমীর সকালে গোটা ইলিশ মাছ ভাজা ও খিচুরি দিয়ে ভোগ দেওয়া হয়। সন্ধিপুজোর সময়ে মঠের নিয়ম অনুসারে পশুবলি না হলেও কালীঘাট মন্দির থেকে বলির প্রসাদী মাংস এনে রান্না করে মাকে নিবেদন করা হয়। তার মানে দেবী দুর্গা নিরামিষই খাবেন এমনটা মাথার দিব্যি নেই মোটে। কিন্তু তা বলে এগরোল খেতে খেতে পুজো মণ্ডপে ঢুকবেন, কনুই দিয়ে ডিম আর মাংসের কুচি মাখানো সস গড়িয়ে পড়বে সেটাও তো ভালো দেখায় না। দেবী কী খাবেন, কী পরবেন সেটা সৃষ্টির প্রারম্ভেই তিনি ডিসাইড করে নিয়েছিলেন। কিন্তু বিষয়টা হল। বর্তমানে থিমের পাল্লায় পড়ে মাকে কখনও পরিযায়ী শ্রমিক সাজানো হচ্ছে, কখনও বস্তিবাসী, কোথাও তিনি বিরাজ করছেন রাজবেশে। বিতর্ক উঠছে, দড়ি টানাটানি হচ্ছে। কিন্তু ওই যে বললাম দুর্গাপুজো নিয়ে আবেগ আর ভক্তি কখনওই ব্যালেন্স নয় বাংলায়। এখানে মেনকা আমাদের বাংলার গিন্নি। গিরিরাজ পাশের পাড়ার কাকা। আর সে হিসেবে দুর্গা ঘরের মেয়ে। তাই তিনি বস্তিরও মা, তাই তিনি পরিযায়ীদেরও মা তাই তিনি রাজবাড়িরও মা। সেক্ষেত্রে তাঁকে যে যেভাবে ডাকে, তাঁকে সেভাবে সাজানো হয়। দড়ি টানাটানি চলছে চলবে। চে গুয়েভারা প্রেমীদের সঙ্গে কেশব বলিরাম হেডগেওয়ারের আদর্শে উদ্বুদ্ধ মানুষদের মধ্যে তর্জা চলবে। তারই মধ্যে আশ্বিনের শারদ প্রাতে বেজে উঠবে আলোকমঞ্জির।