
প্রাইমা হোসাইন
নিশ্চিত মৃত্যু জেনেও থামছে না কর্মসংস্থানের আশায় মরিয়া বাংলাদেশের তরুণদের ঝুঁকিপূর্ণ বিদেশযাত্রা। বিশেষ করে সমুদ্রপথে ইউরোপযাত্রা। উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখিয়ে সংঘবদ্ধ মানবপাচার চক্র মৃত্যুকূপে ঠেলে দিচ্ছে দেশের শত শত তরুণকে। পরিসংখ্যান বলছে, সিলেট, সুনামগঞ্জ, মাদারীপুর ও শরীয়তপুর- দেশের এই চার জেলার তরুণদের মধ্যে বিপদসঙ্কুল পথে হলেও কর্মসংস্থানের জন্য বিদেশযাত্রার প্রবণতা সবচেয়ে বেশি। কিন্তু ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে প্রতিবছরই প্রাণ হারাচ্ছে বিশ্বের, বিশেষ করে বাংলাদেশের অসংখ্য মানুষ। মৃতদেহও মিলছে না অনেকের। তবু থামছে না এই ভয়ংকর মরণযাত্রা। চক্রের দালালরা লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়ে ভাগ্যান্বেষণের জন্য জীবনবাজি রাখা তরুণদের ঠেলে দিচ্ছে নির্যাতন, বন্দিদশা আর অনিশ্চিত মৃত্যুর দিকে। সর্বশেষ ২৭ মার্চ গ্রিস উপকূলে ১৮ বাংলাদেশির মৃত্যু আবারও সামনে নিয়ে এসেছে এই চক্রের নির্মমতাকে।
সর্বশেষ ঘটনার অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই বেদনাদায়ক ভয়ংকর ঘটনার কেন্দ্রে রয়েছেন সুনামগঞ্জের এক আদম পাচারকারীর নাম। লিবিয়ায় অবস্থান করে বাংলাদেশিদের গ্রিসে পাঠানোর পুরো প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করছেন এই ব্যক্তি। তথ্যানুযায়ী, নিহতদের মধ্যে ১২ জনের পরিবারের কাছ থেকে তিনি দুই কিস্তিতে জনপ্রতি প্রায় ১২ লাখ টাকা করে আদায় করেন। অর্থ নেওয়ার পরও তাদের নিরাপদ যাত্রা নিশ্চিত করা হয়নি; বরং ঠেলে দেওয়া হয়েছে ঝুঁকিপূর্ণ পথে। গণমাধ্যমের তথ্য বলছে, বাংলাদেশ-লিবিয়া রুটে দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় একটি শক্তিশালী আন্তর্জাতিক সিন্ডিকেট পুরো প্রক্রিয়াটি নিয়ন্ত্রণ করছে। এই চক্রের শিকড় ছড়িয়ে আছে গ্রাম থেকে আন্তর্জাতিক সীমানা পর্যন্ত। এতে জড়িত স্থানীয় দালাল, লিবিয়াভিত্তিক এজেন্ট এবং আন্তর্জাতিক পাচারকারীদের সমন্বিত নেটওয়ার্ক। এমনকি সাবেক সেনা কর্মকর্তা, প্রভাবশালী ব্যক্তি ও অনিবন্ধিত ট্রাভেল ব্যবসায়ীদের সম্পৃক্ততার তথ্যও মিলেছে।
জানা গেছে, মানব পাচার চক্র সাধারণত তিন স্তরে কাজ করে। প্রথম স্তরে থাকে স্থানীয় দালালরা, যারা গ্রামাঞ্চলের তরুণদের বিদেশে উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখিয়ে ফাঁদে ফেলে। দ্বিতীয় স্তরে রয়েছে লিবিয়াভিত্তিক এজেন্টরা, যারা বিদেশযাত্রার পর তরুণদের আটকে রেখে নির্যাতন চালায় এবং পরিবার থেকে মুক্তিপণ আদায় করে। তৃতীয় স্তরে রয়েছে আন্তর্জাতিক পাচারকারীরা, যারা ভূমধ্যসাগরে নৌযান পরিচালনা করে থাকে। এদের বেশিরভাগই লিবিয়া, সুদান বা চাদের নাগরিক। লিবিয়ায় ঝুঁকিপূর্ণ এই মরণযাত্রাকে দালালরা ‘গেম নামে অভিহিত করে। যেখানে অভিবাসন প্রত্যাশীদের আটকে রাখা হয়, সেগুলোকে বলা হয় ‘গেমঘর। বাস্তবে গেমঘরগুলোই ভয়ংকর বন্দিশালা। যেখানে নেই আলো, বাতাস, পর্যাপ্ত খাবার বা জল। সামান্য পানীয় জল চাইলেও চলে মারধর। নির্যাতনের মাত্রা এতই ভয়াবহ যে, সেখানেই অনেকের মৃত্যু ঘটে। ২৭ মার্চে সংঘটিত ঘটনায় যারা মারা গেছেন, তাদের ১২ জনই বাংলাদেশের সুনামগঞ্জের বাসিন্দা। তবে মোট ৪৩ জনকে ছোট একটি নৌকায় করে গ্রিসের উদ্দেশে পাঠানো হয়েছিল, যাদের ৩৮জনই বাংলাদেশি।
ভাগ্যের সন্ধানে বিদেশযাত্রা নতুন কিছু নয়। যুগ যুগ ধরে মানুষ উন্নত জীবনের আশায় সীমান্ত পাড়ি দিয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে যে চিত্র আমরা দেখছি, তা উদ্বেগজনকই নয়, ভয়াবহ। হাজার হাজার তরুণ আজ অবৈধ পথে বিদেশ যাওয়ার জন্য জীবনবাজি রাখছে। কেউ সাগরপথে, কেউ মরুভূমি পাড়ি দিয়ে, কেউ দালালচক্রের খপ্পরে পড়ে অমানবিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। এই অনিরাপদ, অনিশ্চিত এবং অনেক ক্ষেত্রে প্রাণঘাতী যাত্রা বন্ধ করা এখন সময়ের দাবি।
এই প্রবণতার পেছনে রয়েছে নানা কারণ। দেশে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের অভাব, দক্ষতার ঘাটতি, ন্যায্য মজুরি না পাওয়া, সামাজিক বৈষম্য- সব মিলিয়ে অনেক তরুণ নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশ হয়ে পড়ছে। তারা বিশ্বাস করতে শুরু করেছে, দেশের মাটিতে তাদের জন্য কোনো সুযোগ নেই। এই হতাশাকে পুঁজি করেই সক্রিয় হয়ে উঠেছে দালালচক্র। তারা মিথ্যা স্বপ্ন দেখিয়ে বিপুল অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে এবং তরুণদের ঠেলে দিচ্ছে মৃত্যুর মুখে।
আসল কথা হল- এই অবৈধ বিদেশযাত্রা খুব কম ক্ষেত্রেই সফলতার গল্প তৈরি করে। বরং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা পরিণত হয় ট্র্যাজেডিতে। নৌকাডুবিতে প্রাণহানি, সীমান্তে গুলিবিদ্ধ হওয়া, বিদেশে আটক হয়ে অমানবিক জীবনযাপন- এসবই এখন প্রায় নিত্যদিনের ঘটনা। একটি স্বপ্নের জন্য এমন ভয়ংকর মূল্য কখনোই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রথমেই প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ। দেশে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে, বিশেষ করে তরুণদের জন্য। কারিগরি ও দক্ষতা উন্নয়নমূলক শিক্ষা বাড়াতে হবে, যাতে তারা দেশেই কাজের সুযোগ পায় কিংবা বৈধ পথে বিদেশে যেতে সক্ষম হয়। একই সঙ্গে বিদেশে কর্মসংস্থানের বৈধ প্রক্রিয়াকে সহজ, স্বচ্ছ ও সুলভ করতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল- মানবপাচারকারী ও দালালচক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ। এদের কার্যক্রম নির্মূল না করা গেলে এই মৃত্যুঝুঁকির পথ কখনোই বন্ধ হবে না। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে আরও সক্রিয় ও জবাবদিহিমূলক হতে হবে। অন্যদিকে সমাজেরও দায়িত্ব রয়েছে। পরিবারগুলোকে সচেতন হতে হবে, যেন তারা কোনোভাবেই অবৈধ পথে বিদেশ যাওয়ার সিদ্ধান্তকে সমর্থন না করে। তরুণদের বোঝাতে হবে- ঝুঁকিপূর্ণ পথে নয়, ধৈর্য ও পরিশ্রমের মাধ্যমেই স্থায়ী সাফল্য আসে।
আমাদের মনে রাখতে হবে- প্রতিটি প্রাণ অমূল্য। একটি পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সদস্যকে হারানো মানে পুরো পরিবারকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেওয়া। তাই স্বপ্ন দেখবো, কিন্তু সেই স্বপ্নের জন্য জীবন নয়- জীবনের জন্যই স্বপ্ন। জীবনবাজির এই বিদেশযাত্রা বন্ধ করতে হবে- এটি শুধু একটি দাবি নয়, এটি একটি মানবিক দায়িত্ব। রাষ্ট্র, সমাজ এবং ব্যক্তি- সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে। তাহলেই আমরা আমাদের তরুণদের মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরিয়ে এনে নিরাপদ, সম্মানজনক ভবিষ্যতের পথে এগিয়ে নিতে পারবো।
লেখিকা আমেরিকায় বসবাসকারী সমাজসেবিকা ও সংগঠক