মৌসুমী পাল : ঠিক এক বছর আগে, ২০২৪ সালের ৭ জুন, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তৃতীয়বারের জন্য শপথ নিয়েছিলেন নরেন্দ্র মোদী। শপথের পরে ‘সবকা সাথ, সবকা বিকাশ, সবকা বিশ্বাস’-এর স্লোগান দেওয়া হলেও সংখ্যালঘুদের উপর অত্যাচার যে হারে বেড়েছে, তা প্রশ্ন তুলছে সরকারের দায়বদ্ধতা নিয়ে। সম্প্রতি অ্যাসোসিয়েশন ফর প্রোটেকশন অব সিভিল রাইটস (APCR) প্রকাশ করেছে এক বিস্ফোরক রিপোর্ট ‘হেট ক্রাইম রিপোর্ট: ম্যাপিং ফার্স্ট ইয়ার অব মোদী’জ থার্ড গভর্নমেন্ট’। এই রিপোর্টে বিস্তারিত ভাবে তুলে ধরা হয়েছে গত এক বছরে দেশে ঘটেছে মোট ৯৪৭টি বিদ্বেষমূলক অপরাধ, যার মধ্যে ৬০২ টি সরাসরি শারীরিক আক্রমণ এবং ৩৪৫ টি হেট স্পিচ। এই ভয়াবহ চিত্রের সবচেয়ে মর্মান্তিক দিক এই এক বছরে কমপক্ষে ২৫ জন মুসলিম নাগরিক প্রাণ হারিয়েছেন কেবলমাত্র তাঁদের ধর্মীয় পরিচয়ের জন্য। এই হিংসার আগুনে ছাড় পাননি হিন্দুরাও। এর আঁচ বেশি পড়েছে হিন্দু মহিলাদের উপর।
৭ জুন ২০২৪ থেকে এক বছর, অর্থাৎ ৭ জুন ২০২৫ অবদ্ধি এই রিপোর্টের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছিল। রিপোর্ট অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি হেট ক্রাইমের ঘটনা ঘটেছে উত্তরপ্রদেশে, তারপরেই রয়েছে মহারাষ্ট্র ও মধ্যপ্রদেশ মিলে মোট ১২ টি রাজ্যে। যার সবই বিজেপি শাসিত রাজ্য। অর্থাৎ একদিকে শাসক দলের নেতারা বারবার সংখ্যালঘুদের সুরক্ষার প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, এই রাজ্যগুলিই বিদ্বেষমূলক অপরাধের আঁতুড়ঘর হয়ে উঠেছে। বিজেপি সমর্থকদের চড়ানো সুর, “হিন্দু খাতরে মে হ্যায়” এই হিংসার আগুনে হাওয়া দেওয়ার কাজ করছে।
রিপোর্টের আরেকটি ভয়াবহ তথ্য শুধু গুণ্ডাবাহিনী বা কট্টরপন্থী গোষ্ঠী নয়, বিদ্বেষ ছড়ানোর কাজ করছেন শাসকদলের নেতা-মন্ত্রীরাও। সরাসরি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বিরুদ্ধেও ৫টি হেট স্পিচের অভিযোগ নথিভুক্ত হয়েছে এই রিপোর্টে। বিজেপি নেতাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ১৭৮ টি। দেশের বিভিন্ন মুখ্যমন্ত্রীদের বিরুদ্ধেও রয়েছে ৬৩ টি বিদ্বেষপূর্ণ মন্তব্যের ঘটনা। সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর মন্তব্যটি এসেছে অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা-র কাছ থেকে যিনি প্রকাশ্যে ঘোষণা করেছেন, “আমি মুসলিমদের বিপক্ষেই থাকব।” উল্লেখ্য আসামের জনসংখ্যা প্রায় ৩.৫ কোটি যার মধ্যে ১.৪ কোটি মুসলিম সম্প্রদায়ের, যা রাজ্যের মোট জনসংখ্যার ৪০%। শাসক দলের এই ধরনের মন্তব্য পরিস্থিতি আরও বিপজ্জনক করে তুলেছে বলে মত মানবাধিকার সংস্থাগুলির।

হেট ক্রাইমের ‘পিক সিজন’ ধরা পড়েছে উৎসবের মরশুমে গত বছরের অক্টোবর থেকে এই বছরের এপ্রিল। দুর্গাপুজো, দিওয়ালি, হোলি এই সব পার্বণ ঘিরে বিদ্বেষের তাপমাত্রা সবচেয়ে বেশি ছড়িয়েছে। শুধু অক্টোবর মাসেই ঘটেছে ৮০টি হেট ক্রাইম, যার শীর্ষে আছে উত্তরপ্রদেশ। যেখানে ধর্মীয় স্লোগান, শোভাযাত্রা বা উৎসবের আবহকে ব্যবহার করে মুসলিম, খ্রিস্টান, দলিত সম্প্রদায়ের মানুষদের উপর হামলা চালানো হয়েছে। এমনকি ‘লাভ জিহাদ’ এর অভিযোগও উঠে এসেছে একাধিকবার। মধ্যপ্রদেশের পান্না, সুজালপুরে মুসলিমদের উপর হামলার ঘটনা বেশি হারে প্রত্যক্ষ করা যায়। গত বছরই বিজেপির বাজরং দল একাধিক প্রেমিক-প্রেমিকাদের উপর চড়াও হয়ে লাভ জিহাদ-এর অভিযোগে আক্রমণ চালানোর জন্য মামলা দায়ের করা হয়েছছিল মধ্যপ্রদেশের সুজালপুরে। এছাড়া মহারাষ্ট্রের থানে, উত্তরপ্রদেশের বাঘপত এই তিন জায়গার ঘটনা বিশেষ ভাবে উঠে এসেছে রিপোর্টে। কোথাও প্রকাশ্যে মসজিদে হামলা, কোথাও দোকান লুটপাট, কোথাও ধর্মীয় চিহ্ন দেখে ট্রেনে, বাসে সংখ্যালঘুদের বেধড়ক মারধর।
অ্যাসোসিয়েশন ফর প্রোটেকশন অব সিভিল রাইটস দ্বারা প্রকাশিত বিবৃতিতে সবচেয়ে আতঙ্কের তথ্য হল ৯৪৭টি ঘটনার মধ্যে মাত্র ১৩% ঘটনায় এফআইআর দায়ের হয়েছে। অর্থাৎ প্রায় ৮৭% ক্ষেত্রে থানার চৌকাঠ পার হয়নি অভিযোগ। রিপোর্টে একাধিক জায়গায় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে তীব্র সমালোচনা করা হয়েছে। পুলিশের বিরুদ্ধে নির্লিপ্ততা, পক্ষপাতদুষ্টতা এমনকি অভিযুক্তদের আড়াল করার অভিযোগও উঠেছে।
রিপোর্টের তথ্য অনুযায়ী, মুসলিম বিদ্বেষী হেট স্পিচ দেবার শীর্ষে রয়েছে ঝাড়খন্ড। এই স্পিচগুলির বেশির ভাগ বিষয়বস্তু থাকে ওয়াকফ আইন, লাভ জিহাদ, ইমিগ্রিন্ট বাংলাদেশির অভিযোগ। বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্রমাগত হেট স্পিচের মাধ্যমে সমাজে বিদ্বেষের যে বিষ ছড়ানো হচ্ছে, তা দেশের ঐক্য ও গণতান্ত্রিক কাঠামোর জন্য বড় বিপদ হয়ে উঠছে। এই রিপোর্ট শুধু সংখ্যার খেলা নয়, এটাই ভারতের ‘নতুন বাস্তবতা’ হয়ে উঠছে বলে মনে করছেন বহু মানবাধিকার কর্মী।
ভারতে ১৯৫০-এ সংবিধান প্রণয়নের সময় বলা হয়েছিল ‘সব ধর্মের মানুষ সমান।’ আজ সেই কথাগুলি শুধুমাত্র বইয়ের পাতায় বন্দি ? APCR-এর দাবি, হেট ক্রাইমের প্রকৃত চিত্র আরও ভয়াবহ, কারণ বহু ঘটনা সামনে আসে না বা ভিক্টিমরা পুলিশের দ্বারস্থ হতে সাহস পান না। এই হেট ক্রাইমের ছায়া শুধু সংখ্যালঘুদের নয় গণতন্ত্রেরও বিপন্নতা। যে রাষ্ট্র সংখ্যালঘুদের রক্ষা করতে ব্যর্থ, সে রাষ্ট্র ভবিষতে সংখ্যাগুরুদেরও রক্ষা করতে পারবে না। আজ যেমন সংখ্যালঘুরা ভয় পায়, কাল কেউ-না-কেউ আরও দুর্বল হয়ে যাবে, তখন তাকেও নিশানা করবে এই সিস্টেম। এটাই ইতিহাসের শিক্ষা।
