মৌসুমী পাল : ইরানে তিনটি পরমানু কেন্দ্রে হামলা চালিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় শান্তির বার্তা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এই বাক্য আপাত শান্তির বার্তা মনে হলেও, এর অন্তর্নিহিত বার্তাটি ভয়াবহ ও ব্যাপক বিনাশক। কারণ, ট্রাম্পের গলায় “সমঝোতামূলক শান্তি” উচ্চারিত হচ্ছে। অর্থাৎ হয় শান্তি, নাহলে সায়েস্তা। তবে যুদ্ধরত কোনও দেশের বিশেষ পরমাণু ঘাঁটি গুলিতে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সেনাবাহিনী আঘাত হানে তখন সেটিকে নিছকই সীমিত অভিযান বলে মনে করা যায় না। বা সতর্কতামূলক বলা যায় না। বরং সেটা এক নতুন যুদ্ধের সূচনাকেই ইঙ্গিত করে।
ইজরায়েল-ইরান সংঘাত চলছিল টানটান উত্তেজনার মধ্যেই। উভয় পক্ষ পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ছুঁড়ছে, সেনা ও সাধারণ মানুষের মৃত্যু হয়েছে, ধ্বংস হয়েছে পরিকাঠামো, ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে সামরিক ব্যাবস্থপনা। ইরানকে দুই সপ্তাহ সময় দেবার ঘোষনা করার পর সেই সংঘাতে সরাসরি প্রবেশ করল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ইরানের পরমাণু কেন্দ্রগুলিতে বোমাবর্ষণের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র শুধু ইরানকে নয়, গোটা পশ্চিম এশিয়া সহ বিশ্বকে অনির্ধারিত এক যুদ্ধের দিকে এগিয়ে দিল।
২০১৫ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সাথে JCOPA চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল ইরান। সেই চুক্তি ট্রাম্প নিজেই ভেঙেছিলেন ২০১৮ সালে। আবর সেই চুক্তিতেই ইরানকে ফেরাতে চেয়েছিলেন ট্রাম্প। তাতে ইরান রাজি না হওয়ায় ইরানকে ধ্বংসের হুমকিও দিয়েছিলেন তিনি। বারংবার আমেরিকার ওই প্রস্তাব ফিরিয়ে দেবার পরই তাদেরই মদতে ইজরায়েল ইরানের ৯ টি পরমানু কেন্দ্রে হামলা চালায়। সেই ধ্বংসাত্মক হামলায় প্রাণ হারিয়েছিলেন ইরানের শীর্ষ নেতা ও পরমানু বিজ্ঞানী। এই হামলার প্রত্তুতরে ইজরায়েলের উপর হামলা করে ইরান। তারপর মুহুরমুহ হামলায় ক্ষতিগ্রস্থ দুই দেশ। সেই পরিস্থিতিতে ইরানের তিনটি পরমানু কেন্দ্রে আক্রমন করে খোদ আমেরিকা। এই অভিযানের পর ট্রাম্প দাবি করেছেন, “এই অভিযান শান্তি ফেরানোর অভযান”। কিন্তু বড় প্রশ্ন বোমার উপর ভর করে শান্তি ফেরানো কি আদৌ সম্ভব ?
ইরান দীর্ঘদিন ধরে পরমাণু অস্ত্র তৈরি করছে বলে অভিযোগ তুলে এসেছে আমেরিকা। কিন্তু IAEA বা অন্য আন্তর্জাতিক সংস্থা ইরানের বিরুদ্ধে কোনও চূড়ান্ত প্রমাণ পেশ করতে পারেনি। এমনকি, ইরান বহুবার নিজেদের কর্মসূচিকে শান্তিপূর্ণ ও নিয়ম মাফিক বলে দাবি করেছে। তবুও, আমেরিকার মতো শক্তিধর রাষ্ট্র সেই দাবিকে আমল না দিয়ে নিজেই সরাসরি পরমানু কেন্দ্রে হামলা করাকে এক কূটনৈতিক ষড়যন্ত্র বলে দাবি করা যেতে পারে। এই অবস্থান এক ধরনের ‘প্রিভেন্টিভ ওয়ার ডকট্রিন’-এর ইঙ্গিত দেয়। অর্থাৎ, কোনও দেশ ভবিষ্যতে বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে এই আশঙ্কা থেকেই আজ তাকে ধ্বংস করতে হবে ! ঠিক এই ধরনের যুক্তিতেই শুরু হয়েছিল ইরাক যুদ্ধ বা গালফ ওয়ার। এবং তার ফলাফল আজও বিশ্বের সামনে।
ইরান আগেই আমেরিকাকে সতর্ক করে সাফ জানিয়ে দিয়েছিল আমেরিকা যদি ইজরায়েলকে সমর্থন করা বন্ধ না করে তাহলে তার পরিনামও ভয়ঙ্কর হবে। ইরানে পরমানু কেন্দ্রে হামলা করার পর ইরানেরর সংবাদ মাধ্যম সরাসরি হুমকি দিয়েছে মিলেটারি বেসে আক্রমণ করার। এই হুমকিতে কিছুটা হলে ভীত হয়েছে ট্রাম্প সরকার। ইরাক, কাতার, বেহরানে থাকা তাদের সামরিক ঘাঁটিতে হামলা চালাতে পারে বলে অনুমান তাদের। এছাড়াও আতঙ্কবাদী হামলা চালাতে পারে বলে আশঙ্কা।
যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে হুমকি দিয়েছে তারা যেন পশ্চিম এশিয়াতে থাকা সেনা বেসে হামলা না করে। আমেরিকার এই হটকারি পদক্ষেপ শুধু পশ্চিম এশিয়াতে নয়, তার নিজের ঘরেও ভয় ঢুকিয়ে দিয়েছে। নিউ ইয়র্ক, ওয়াশিংটন, লস অ্যাঞ্জেলস সব বড় শহরে জারি হয়েছে হাই অ্যালার্ট। ধর্মীয় স্থান, কনস্যুলেট, সরকারি ভবন সর্বত্র টহল, নিরাপত্তা বাহিনীর মোতায়েন করা হয়েছে। এ থেকেই পরিষ্কার, মার্কিন প্রশাসন জানে এই পদক্ষেপের জবাব আসবেই। এবং সেই জবাব হুমকি নয়, বাস্তব বিপর্যয় হয়ে আসতে পারে, নাশ হতে পারে বহু প্রাণ, বিনিষ্ট হতে পারে বহু সম্পদ।
আমেরিকার হস্তক্ষেপে যুদ্ধ পরিস্থিতি খারাপ তো হয়েছে কিন্তু এ অবস্থান আরও অবনতি ঘটতে পারে যদি গাজা স্ট্রিপের মত ইজরায়েল ইরানেও সাধারণ মানুষকে লক্ষ্য করে অক্রমন করে। বিশ্ব রাজনৈতিক মানচিত্রের যা পরিস্থিতি, যেভাবে শক্তিধর মেরু গড়ে উঠছে, ততই সম্ভাবনা বাড়ছে বৃহৎতর সংঘাতের। একদিকে রয়েছে আমেরিকা এবং NATO এর অনান্য দেশগুলি, অন্যদিকে ইরানের সঙ্গে থাকতে পারে রাশিয়া-চীনের সমর্থন। এমন হলে দুই দেশের মধ্যে শুরু হওয়া সংঘর্ষ কেবল দুটো দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, এটা ভবিষ্যতের তৃত্বীয় বিশ্বযুদ্ধের ট্রেলার মাত্র। তবে এই সংঘর্ষে মিডিয়া, কূটনীতি ও সেনা শক্তির মিশেলে এই নতুন যুদ্ধের ধরণ আগের কোনও বিশ্বযুদ্ধের মতো হবে না। বরং এটা হতে পারে বৈশ্বিক ও মানবিক বিপর্যয়ের মিশ্র ভয়াবহ এক রূপ।
