নিজস্ব সংবাদদাতা : নদিয়ার কালীগঞ্জে এক মর্মান্তিক ঘটনার সাক্ষী রইল গোটা রাজ্য। সোমবার দুপুরে যখন গোটা রাজ্য তাকিয়ে ছিল কালীগঞ্জ বিধানসভা কেন্দ্রের উপনির্বাচনের ফলাফলের দিকে, তখন এক চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী তামান্না খাতুন বসেছিল পরিবারের সঙ্গে দুপুরের খাবার খেতে। কিন্তু সেই ভাত আর খাওয়া হল না। খাওয়ার মাঝপথেই আচমকা তাঁদের বাড়িতে আছড়ে পড়ে বোমা। মুহূর্তের মধ্যে মৃত্যু ঘটে মাত্র দশ বছর বয়সি তামান্নার।
মোলান্দি গ্রামের বাসিন্দা তামান্না খাতুনের মৃত্যু যেন চিরকালীন দাগ কেটে গেল ভোট-পরবর্তী হিংসার ইতিহাসে। তামান্নার পরিবারের দাবি, সোমবার দুপুরে ফলাফল ঘোষণার পর তৃণমূল প্রার্থী আলিফা আহমেদের বিজয় উল্লাসে মাতেন শাসকদলের কর্মী-সমর্থকরা। আর সেই বিজয় মিছিল থেকেই ছোড়া হয় বোমা, যার লক্ষ্য ছিল স্থানীয় বামপন্থী পরিবারগুলি। মোলান্দির বাড়িতে দুপুরবেলায় বিস্ফোরণ হয়। সকেট বোমার তীব্র আঘাতে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারায় তামান্না।
শোকস্তব্ধ গোটা পরিবার। মেয়ে হারানোর পর কথাও বলতে পারছেন না মা সাবিনা ইয়াসমিন। সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়ছেন বারবার। জ্ঞান ফিরে পেলেই শুধু কাঁদতে কাঁদতে বলছেন, “মেয়েটাকে খেতেও দিল না ওরা।” বারবার ঘুরেফিরে উঠে আসছে একটাই আর্তি, কারা নিল তাঁর মেয়ের প্রাণ?
তামান্নার কাকা মুস্তাক হোসেন, যিনি নিজেকে সিপিএম সমর্থক বলে দাবি করেছেন, বলেন, “১৩ রাউন্ড গণনার পর থেকেই বোমাবাজি শুরু করে তৃণমূল। বেছে বেছে আমাদের বাড়ি লক্ষ্য করেই বোমা ছোড়ে। মেয়েটা ভাত খেতে বসেছিল, তখনই এই কাণ্ড।” তাঁর কণ্ঠস্বর থেমে যায় শোকে।
এই ঘটনায় রাজ্যজুড়ে রাজনৈতিক স্তরে ব্যাপক চর্চা শুরু হয়েছে। বিরোধীদের অভিযোগ, তৃণমূলের বিজয়মিছিল থেকেই ছোড়া হয়েছে বোমা। বিজেপি কটাক্ষ করেছে, তৃণমূল রক্তপাত ছাড়া ভোটে জিততে পারে না। মৃতার মা জানিয়েছেন, “আমি দেখেছি কারা বোমা ছুঁড়েছে। আমরা সিপিএম করি। নাম জানি না, কিন্তু ওরা সবাই তৃণমূল করে।”
তৃণমূল অবশ্য এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। দলটির একাংশের দাবি, এই ঘটনা পূর্ব পরিকল্পিত, এবং এর পেছনে বিজেপি’র ষড়যন্ত্র থাকতে পারে। উদ্দেশ্য ছিল শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের পর পরিবেশ উত্তপ্ত করা। তবে সদ্য জয়ী তৃণমূল প্রার্থী আলিফা আহমেদ এমন বিতর্ক এড়িয়ে সরাসরি বলেন, “এই ঘটনার কোনও মানে হয় না। যে-ই দোষী হোক, তার কঠোর শাস্তি হওয়া উচিত। শিশুমৃত্যু মেনে নেওয়া যায় না।”
ঘটনার পরই টুইটে প্রতিক্রিয়া দেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বলেন, “এই ঘটনায় আমি অত্যন্ত মর্মাহত। দোষীরা কেউই ছাড় পাবে না। পুলিশকে কড়া পদক্ষেপ নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।” কৃষ্ণনগর জেলা পুলিশ দ্রুত ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে সোমবার রাতেই গ্রেফতার করে আদর শেখ, মানোয়ার শেখ, কালু শেখ ও আনোয়ার শেখ দের। তাঁদের বিরুদ্ধে একাধিক ধারায় মামলা রুজু হয়েছে এবং মঙ্গলবার আদালতে পেশ করা হবে।
এদিকে কৃষ্ণনগরের পুলিশ সুপার অমরনাথ কে জানান, মোলান্দি অঞ্চলে ২০২৩ সাল থেকে দুই রাজনৈতিক গোষ্ঠীর মধ্যে চাপা উত্তেজনা ছিল। সেই দ্বন্দ্ব থেকেই এই হিংসা ছড়াতে পারে। ময়নাতদন্ত এবং ফরেনসিক রিপোর্ট হাতে এলে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হবে বলেও জানান তিনি।
কিন্তু এক শিশুর জীবন থেমে গেছে রাজনৈতিক হিংসার কারণে। থেমে গেছে তার ক্লাসের খাতা, স্কুল ব্যাগ, ছোট ছোট স্বপ্ন। ছোট্টো তামান্নার মৃত্যু রাজনীতির নির্লজ্জ দিকটা আবারও সামনে এনে দিয়েছে যেখানে ভোট আসে, যায়, মিছিল হয়, পতাকা ওড়ে, কিন্তু জীবন? সে চুপচাপ থেমে যায় ভাতের থালার পাশে। বারবার মনে করিয়ে দেয়, রঙ বদলালেও হিংসা বেঁচে থাকে।
