নিজস্ব সংবাদদাতা : পথ দুর্ঘটনার আরেক মর্মান্তিক পরিনতির স্বাক্ষী হল কলকাতা। দিন দশেকের চরম লড়াইয়ের পর শেষ হল পঞ্চম শ্রেণির পড়ুয়া সৃঞ্জয় দত্তর শ্বাসপ্রশ্বাস। বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান সৃঞ্জয়ের বাড়ি বাগমারি এলাকায়। সল্টলেকের বিধাননগর মিউনিসিপ্যাল স্কুলের পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র ছিল। রোজকার মতো ৩ ডিসেম্বর সকালে বাবা গৌতম দত্তের সঙ্গে মোটরবাইকে চেপে বাড়ি থেকে স্কুলে যাচ্ছিল সে। ফুলবাগান থানা এলাকার মানিকতালা রোডে হঠাৎই একটি বেপরোয়া লরি তাদের বাইককে ধাক্কা দেয়। ছেলে ও বাবা দুজনেই বাইক থেকে ছিটকে পড়ে। লরির চাকায় আটকে পড়ে সৃঞ্জয়। সেই অবস্থায় লরিটি তাকে বেশ কিছুদূর টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যায়। গৌতমেরও হাত পায়ে চোট লাগে। সেই অবস্থায় গুরুতর জখম ছেলেকে ভ্যানে চাপিয়ে বাইপাসের ধারে একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যান গৌতম। সেখানেই চিকিৎসা চলছিল সৃঞ্জয়ের। গুরুতর অবস্থার জন্য তাকে রাখা হয়েছিল আইসিইউতে। সেই থেকে বাচ্চাটি মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছিল। এর মধ্যে ৫ তারিখ তার মারাত্মক জখম ডান পাটি বাদ দেওয়া হয়।
তাতেও শেষ রক্ষা হল না। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শুক্রবার মৃত্যু হল বালকটির। মাত্র ১১ বছর বয়সে ফুরিয়ে গেল একটা তরতাজা প্রাণ। এর দায় কার ? শহরে আর কত পথ দুর্ঘটনার বলি হবে একের পর এক প্রাণ ? প্রশ্ন উঠল এবারও। তবু কলকাতা পুলিশের টনক নড়ে না। ভুক্রতভুগীরা জানিয়েছেন, কলকাতার ট্রাফিক পুলিশের কাজ এখন যান নিয়ন্ত্রণ করা নয়, তার চেয়ে বেশি নজর সুযোগ সন্ধানের দিকে। একমাত্র সন্তান সৃঞ্জয়কে হারিয়ে তার বাবা-মায়ের দিশেহারা বিলাপ তাই কানে যাবে না কলকাতা ট্রাফিক পুলিশের কানে। তাই হামেশাই পথ দুর্ঘটনা ঘটে চলেছে, প্রাণ যাচ্ছে নিরীহ মানুষের। বিচার নেই তারও, বরং বহর বাড়ছে পুলিশের পুটলিতে।
শুক্রবার সৃঞ্জয়ের ক্ষতবিক্ষত শরীরে ফের কাটাছেঁড়া হচ্ছিল নীলরতন সরকার মেডিক্যাল কলেজের মর্গে। বাইরে তখন মৃত সৃঞ্জয়ের বিধ্বস্ত বাবা। আপন মনে ছেলের ছবি দেখছিলেন মোবাইলে। স্বাভাবিক ভাবে এক সন্তান হারা পিতার পায়ের নিচে মাটি আর কী ভাবে থিতু থাকে। নড়বড়ে শরীরে বিড়বিড় করছিলেন। বুক ফেটে বেরিয়ে আসছিল এক অবিশ্বাস্য বিয়োগের ব্যথা। মনে পড়ছিল সব শেষ হয়ে যাবার আগে শয্যাসায়ী ছেলের দু’ চার কথা, অস্পষ্ট তবু তা এতটাই তীব্রতা নিয়ে গৌতমকে নাড়া দিচ্ছিল যে বাইর থেকে থাকে ভীষণ অসহায় মনে হচ্ছিল। বারবার উঠে আসছিল বেদনাগ্রস্থ সন্তানহারা বাবার বিলাপ। এ দিন গৌতম বলেন, ‘‘সকাল ১০টায় হাসপাতালে যাওয়ার পরে চিকিৎসকেরা জানালেন, ছেলে মারা গিয়েছে। গত কাল রাতে সৃঞ্জয়ের হার্ট অ্যাটাক হয়েছিল।’’
শুক্রবার রাতে মুরারিপুকুর হিন্দু কবরস্থানে শেষকৃত্য করা হয় সৃঞ্জয়ের। শরীরে অনেক কাটাকাটি ধকল নিয়েছে তাই আগুন দিয়ে আর কষ্ট দিতে চাননি সৃঞ্জয়ের বাবা-মা। তাকে তাই শায়িত করা হয় মাটির বুকে, কবরে। বাবা-মায়ের একটাই সান্ত্বনাক, সেখানেই শান্তিতে ঘুমাক সন্তান।
