নিজস্ব সংবাদদাতা : কলকাতা ইসকনের সমস্ত পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হল রাধারমণ দাসকে। রবিবার সমাজমাধ্যমে এক বিবৃতির মাধ্যমে ইসকনের কলকাতার সহ-সভাপতি রাধারমণ দাস নিজেই সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ‘এক্স’ -এ একটি পোস্টের মাধ্যমে এই সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন। ইসকনের পক্ষ থেকেও একটি বিবৃতি দেওয়া হয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে, রাধারমণ দাসকে বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠানো হয়েছে। সেইসঙ্গে সংবাদমাধ্যম, সরকারি কর্তৃপক্ষ বা অন্য কোথাও ইসকনের হয়ে তিনি এতদিন যে প্রতিনিধিত্ব করে আসছিলেন সেখানেও নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে।
এক্সের ওই পোস্টে এ কথা স্বীকার করেছেন রাধারমণ। তিনি বলেছেন, “আমি শুভানুধ্যায়ী, ভক্তবৃন্দ, সংবাদমাধ্যমের সদস্য এবং সাধারণ মানুষকে জানাতে চাই যে, ইসকনের মধ্যে আমার সমস্ত দায়িত্ব থেকে আমাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি, সংবাদমাধ্যম, সরকারি কর্তৃপক্ষ বা কোনো জনমঞ্চে ইসকনের প্রতিনিধিত্ব না করার বা সংগঠনের হয়ে কথা না বলার নির্দেশও আমাকে দেওয়া হয়েছে।” তিনি জানান, বেশ কয়েকটি বিষয়ের জেরে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
তাঁকে পাঠানো বার্তা অনুযায়ী, বেশ কিছু কারণে তাঁকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে : বাংলাদেশে হিন্দু ও ভক্তদের ওপর নির্যাতন নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলা ও সংবাদমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দেওয়া এবং ঢাকার জেলে বন্দি ইসকন সন্ন্যাসী চিন্ময় কৃষ্ণ প্রভুর সমর্থনে ও তাঁর বিষয়ে কথা বলা।
তিনি আরও উল্লেখ করেছেন, মেনকা গান্ধী ইসকনের বিরুদ্ধে যে প্রকাশ্যে অভিযোগ তুলেছিলেন তার বিরুদ্ধে আইনি নোটিশ পাঠানোও এই বহিঃস্কারের আরও একটি কারণ। প্রসঙ্গত, মেনকা গান্ধী অভিযোগ এনেছিলেন যে ইসকন কসাইদের কাছে গরু বিক্রি করে। এছাড়া কৌতুকশিল্পী সুরলীন কৌর ইসকনের বিরুদ্ধে যে অবমাননাকর মন্তব্য করেছিলেন, তার প্রেক্ষিতে সাইবার অভিযোগ দায়ের করেছিলেন তিনি। তাঁর এই অপসারণের পিছনে এটাও একটা কারণ। এছাড়াও তাঁর অপসারণের পিছনে আরও কিছু কারণ দেখিয়েছে ইসকন। যা হল- ‘সনাতন ধর্ম নির্মূল’ গোষ্ঠীর প্রচারের জবাবে সনাতন ধর্মের সমর্থনে প্রকাশ্যে বক্তব্য রাখা, ১৯৭৬ সালের নিউ ইয়র্ক রথযাত্রার সঙ্গে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঐতিহাসিক যোগসূত্র নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করা এবং চূড়ান্ত কারণ: ২৯ মে, ২০২৬-এ একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলে সাক্ষাৎকার দেওয়া।”
নিজের বিরুদ্ধে নেওয়া পদক্ষেপ সত্ত্বেও, ইসকন কলকাতার এই অপসারিত সহ-সভাপতি জানিয়েছেন যে তিনি কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তকে সম্মান করেন এবং তাঁকে দেওয়া নির্দেশাবলী মেনে চলবেন। তিনি বলেছেন, “সেই অনুযায়ী, আমি সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করব না বা ইসকনের হয়ে এসব বিষয়ে আর কোনো জনসমক্ষে বিবৃতি দেব না। আমি সাংবাদিক ও সংবাদমাধ্যম সংস্থাগুলোর কাছে অনুরোধ করছি, তারা যেন এই অবস্থানকে সম্মান করেন এবং মন্তব্য বা সাক্ষাৎকারের জন্য অনুরোধ করা থেকে বিরত থাকেন।”
তবে উল্লেখ্য যে, পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান বিজেপি সরকার সম্প্রতি কলকাতা পৌরসভা এলাকার অন্তর্গত সরকারি ও সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত স্কুলগুলিতে রান্না করা মিড-ডে মিল সরবরাহের দায়িত্ব ইসকনকে দিয়েছে। এর পরপরই সোশ্যাল মিডিয়ায় এমন সব পোস্টে ছেয়ে যায় যে, মিড-ডে মিলে স্কুলপড়ুয়াদের আর ডিম দেওয়া হবে না। সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া সেইসব পোস্টের প্রেক্ষিতে, ইসকন কলকাতার তৎকালীন সহ-সভাপতি ও মুখপাত্র একটি বিবৃতি দিয়ে মানুষকে সতর্ক করেন যাতে তারা এ ধরনের বিভ্রান্তিকর পোস্টে বিভ্রান্ত না হন। নিজের সোশ্যাল মিডিয়া বিবৃতিতে রাধারমণ ইসকন-পরিচালিত প্রস্তাবিত মিড-ডে মিলের মেনু নিয়ে ছড়ানো বিভ্রান্তিকর পোস্টগুলোও যুক্ত করেন, যাতে মানুষ বুঝতে পারে যে ওই পোস্টগুলো ছিল “কাল্পনিক এবং সম্পূর্ণ বিভ্রান্তিকর”। তিনি যে এই বিভ্রান্তিকর পোস্টটি উল্লেখ করেছিলেন, তাতে দিনভিত্তিক একটি মেনু চার্ট দেওয়া হয়েছিল; সেই তালিকা অনুযায়ী খাবারগুলোতে পুষ্টিকর উপাদানের অভাব ছিল।
বিবৃতিতে রাধারমণ জানিয়েছিলেন, “আমার নজরে এসেছে যে কিছু মানুষ কলকাতায় মিড-ডে মিলের জন্য একটি প্রস্তাবিত মেনু শেয়ার করছেন। তবে আমি স্পষ্ট করতে চাই যে, এমন কোনো মেনু চূড়ান্ত করা হয়নি এবং এই তালিকাটি আমাদের দ্বারা প্রকাশ করা হয়নি।” তবে শনিবার অন্য একটি সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে, ইসকন কলকাতার প্রাক্তন সহ-সভাপতি উচ্চ প্রোটিনযুক্ত নিরামিষ খাবারের পক্ষে কথা বলেন।
তিনি আরও বলেন যে, আমিষভোজীদের তুলনায় নিরামিষভোজীদের প্রোটিন গ্রহণের মাত্রা বেশি। তিনি লিখেছিলেন, “বিজ্ঞানের নিরিখে বিচার করলে ভারতের প্রোটিন-মানচিত্র নিজেই তার প্রমাণ দেয়। যেসব রাজ্যে অধিকাংশ মানুষ নিরামিষভোজী, সেখানে প্রোটিন গ্রহণের হার মাছ-মাংস খাওয়ায় অভ্যস্ত রাজ্যের তুলনায় বেশি। বিজ্ঞানের তথ্য অনুযায়ী, ১০০ গ্রামে প্রোটিনের পরিমাণ হল—ডিম : ১৩ গ্রাম, মাছ : ২২ গ্রাম, সয়া চাঙ্কস : ৫২-৫৪ গ্রাম, পনির : ২২ গ্রাম, রাজমা : ২৪ গ্রাম, মুগ-মসুর-উড়দ ডাল : ২৫ গ্রাম এবং কালো ছোলা : ২২ গ্রাম।” সোশ্যাল মিডিয়ায় এই বিতর্কিত পোস্টটি করার ঠিক পরের দিনই ইসকন কলকাতার সমস্ত পদ থেকে রাধারমণ দাসকে সরিয়ে দেওয়া হল।