কুশল চক্রবর্তী
৮ ডিসেম্বর লোকসভায় অর্থ দপ্তরের মাননীয় প্রতিমন্ত্রী পঙ্কজ চৌধুরী জানিয়ে দিলেন বিগত পাঁচটি অর্থবর্ষে ৬.১৫ লক্ষ কোটি টাকার ঋণ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের খাতা থেকে মুছে ফেলা হয়েছে। এমনি দেখতে গেলে এটা একটা রুটিন ব্যাপার। ভারতীয় ব্যাঙ্কিং বাবস্থার নিয়ামক সংস্থা রিসার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া সময় সময় এটা করে থাকে। যাতে কিনা ব্যাঙ্কের হিসাব নিকাশের যে খাতা থাকে, তাকে অনেক বেশী আর্থিক ভাবে সবল দেখানো যায়।
ঋণ হচ্ছে ব্যাঙ্কের কাছে একটা সম্পদ। তার থেকে ব্যাঙ্ক যে সুদ সংগ্রহ করে তার থেকেই কিছু ব্যয় করে ব্যাঙ্কের লাভ উঠে আসে। যে সম্পদ সুদ দেয় না তাকে হিসাবের খাতায় সম্পদ দেখানো কি ঠিক ? তাই সেই ঋণগুলোকে মুছে ফেলা হয় ব্যাঙ্কের খাতা থেকে। কিন্তু ঋণ গ্রাহকদের ঋণের দায়ভার থেকে পুরোপুরি মুক্তি দেওয়া হয় না। নানা রকমের প্রক্রিয়ায় চলে ব্যাঙ্কের তরফ থেকে ঋণ নেওয়া টাকা উদ্ধারের চেষ্টার। নিয়মের কথকথায় এ সব কথা লেখা হলেও, বুঝতেই পারছেন অবস্থাটা নিশ্চয়ই সেরকম নয়। কারণ যে ব্যাঙ্ক তার প্রদেয় ঋণ সময়ের মধ্যে আদায় করতে পারল না, তা তাঁরা মুছে ফেলার পর সেই ঋণের উদ্ধারের কতটা চেষ্টা করবে ?
এখানেই আছে একটা টুইস্ট। ব্যাঙ্কের খাতা থেকে ঋণের ভার মোছার পর যদি ব্যাঙ্কের কেউ সেই ঋণের কিছু অংশও আদায় ফরতে পারে তবে সেই উদ্ধার করা ঋণের কিছু অংশ পাবে ব্যাঙ্ক বা ব্যাঙ্কের কোনও আধিকারিক। অর্থাৎ কিনা ব্যাঙ্কের আধিকারিকের একটা নিজস্ব উৎসাহ থাকবে সেই ঋণ উদ্ধারের যাতে কিনা সে কিছু বাড়তি রোজগার করতে পারে। দেখা যায় শাখায় নব নিযুক্ত কর্মচারীদের দিয়ে এই কাজ কারিয়ে নেয় উচ্চপদে আসীন আধিকারিকরা। খাটে নবীনরা আর লাভ করে প্রবীণ আধিকারিকরা।
এছাড়া আছে রিকভারি এজেন্টদের দিয়েও এই কাজ করানোর চল রয়েছে। এখানেও থাকে “বিশেষ” লোক বা সংস্থার লোকেদের নিযুক্ত করার ব্যাপার। আর এই নির্বাচন খুব স্বচ্ছ থাকে কিনা তা নিয়েও বহু প্রশ্ন রয়েছে। কিন্তু ঋণ মুছে ফেলার সবচেয়ে বড় ব্যাপার হল, যাদের ঋণ মুছে ফেলা হয়েছে তারা কারা, সে ব্যাপারে থাকে এক অদ্ভুত নীরবতা। আর কারা এদের
ঋণ পাইয়ে দেবার ব্যাপারে সহায়তা করেছিল, তাতেও থাকে যথেষ্ট অন্ধকার। এছাড়াও আছে, এই ঋণ ব্যাঙ্কের খাতা থেকে মুছে ফেলার ফলে ব্যাঙ্কও পেয়ে যায় আয়কর থেকে কিছু ছাড়। দেখা যায়, এই সব ঋণ মোছার ব্যাপারে বড় অঙ্কের ঋণ যারা নিয়েছে তাদের প্রাধান্যই বেশী। ছোট ছোট ঋণের মুছে ফেলার সংখ্যা অনেক কম। তাহলেই বুঝতে পারছেন যে টাকার বলে যারা “বাহুবলি” তারাই ঠিক সময়ে সটকে পড়তে পারছে।
পরিসংখ্যান বলছে ২৩-২৪ সালে কেন্দ্রীয় সরকার ব্যাঙ্কের সবমিলিয়ে ১৭০২৭৬ কোটি টাকা ঋণ ব্যাঙ্কের খাতা থেকে মুছে দিয়েছিল তার মধ্যে ৬৮৩৬৬ কোটি টাকার ঋণ ছিল বৃহৎ শিল্পপতিদের। তবে এই অর্থবর্ষে যে সরকারি ব্যাঙ্কের আনুমানিক ১.০৫ লক্ষ কোটি টাকার ঋণ ব্যাংকের খাতা থেকে মুছে ফেলা হল তারও কমসে কম ৪০ শতাংশ ঋণ বড় বড় শিল্পপতিদেরই হবে। তাহলে বুঝতেই পারছেন সরকারের প্রিয়জনেরা ঋণ নেবার সময়ও কতিপয় শিল্পপতিদের “সহায়তার” দান পাচ্ছে। আবার ঋণের পরিমান ব্যাংকের খাতা থেকে মুছে ফেলার জন্যও হয়ত কিছু “ভালোবাসা” পাচ্ছেন। আর প্রতিদিন সংবাদ মাধ্যমে ভেসে আসছে শীর্ষ থেকে মাঝারি সব মন্ত্রীদের কথায় সব শিল্পকে আদানি আম্বানিদের মত প্রাইভেট শিল্প গোষ্ঠীদের হাতে তুলে দেবার প্রতিশ্রুতি। এমনকি ভারতীয় প্রতিরক্ষা এবং পরমাণু ভিত্তিক জিনিস তৈরিতেও তাদের প্রাধান্য দেবার কথা উঠে আসেছ। আর আশঙ্কা আর ক্ষতির মুখ দেখছে ভারতের আপামর জনগন। তাদের জন্য তো অবশ্যই বিনিপয়াসায় আছে মাসে ৫ কেজি চাল বা গমের বন্দোবস্ত।
