তাপস মহাপাত্র
নির্বাচন কমিশন দলের নাম ও প্রতীক ফ্রিজ করে দেওয়ার পরই সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। নিশানায় নির্বাচন কমিশন। এই মামলায় যুক্ত করেছেন বিধানসভার বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কেও। জানা গেছে, আগামী সপ্তাহে প্রধান বিচারপতির বেঞ্চেই এই মামলার শুনানি হতে পারে। এর পরই রাজ্য রাজনীতির সমীকরণ বদলাতে থাকে। ৪ মে-র পর এই প্রথম সাংবাদিক সম্মেলনে হাজির হন মমতা। বিজেপি এবং কমিশনকে এক সারিতে ফেলে তীব্র আক্রমণ করেন তিনি। জানিয়ে দেন, নন্দীগ্রাম ও অসমের নওগাঁর উপনির্বাচনে কংগ্রেস প্রার্থীকে সমর্থন করবেন তাঁরা। এইদিকে কংগ্রেসকে সমর্থন জানানোর পরই পুরনো খুনের মামলায় গ্রেফতার হন নন্দীগ্রামের হাত শিবিরের প্রার্থী মিলন প্রধান।
এদিকে, শুক্রবার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নন্দীগ্রাম বিধানসভা এবং অসমের নাগাওঁ লোকসভা আসনের উপ নির্বাচনে কংগ্রেসকে সমর্থন করায় রাজ্য ও জাতীয় রাজনীতিতে জল্পনা তুঙ্গে। ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি করে এবার কংগ্রেসকে ‘স্বাভাবিক মিত্র’ হিসেবে অভিহিত করেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। মুর্শিদাবাদের রেজিনগর নিয়ে সিদ্ধান্তের কথা আপাতত তুলে রাখলেও পূর্ব মেদিনীপুরের নন্দীগ্রাম এবং অসমের নওগাঁও-র উপ নির্বাচনে কংগ্রেসকে সমর্থনের কথা জানিয়ে দেন তিনি।
শুক্রবার বিকেলে কালীঘাটে নিজের বাসভবনে আয়োজিত সাংবাদিক সম্মেলনে মমতা বলেন, “দেশের বৃহত্তর স্বার্থে আমরা নন্দীগ্রামে কংগ্রেস প্রার্থীকে সমর্থন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। রেজিনগরের বিষয়ে আমি পরে সিদ্ধান্ত নেব।” এইসঙ্গে তিনি জানিয়ে দেন, “আমরা আসামের নওগাওঁ লোকসভা উপনির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করব না।” ৪ মে বাংলার বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর এটিই ছিল তাঁর প্রথম সাংবাদিক সম্মেলন।
নন্দীগ্রাম থেকে তাঁর মনোনীত প্রার্থী সঞ্চিতা প্রধান দে নিজের মনোনয়ন প্রত্যাহার করে নেওয়ার পরই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন। এরপরই দেখা যায় আরেক ঘটনা।মমতা সমর্থনের কথা ঘোষণা করার প্রায় এক ঘণ্টা পরেই পুরোনো এক খুনের মামলায় গ্রেপ্তার হন নন্দীগ্রামের কংগ্রেস প্রার্থী মিলন প্রধান।
এদিকে, নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তের ফলে মমতা সাময়িকভাবে তাঁর দলের নাম ও প্রতীক ব্যবহারের অধিকার হারান। তাঁর গোষ্ঠীকে ‘মমতা অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস’ নাম ও ‘ফুটবল খেলোয়াড়’ প্রতীক দেয় নির্বাচন কমিশন। অন্যদিকে ঋতব্রত গোষ্ঠীকে ‘ডেমোক্রেটিক তৃণমূল কংগ্রেস’ নাম ও ‘খাম’ প্রতীক বরাদ্দ করা হয়। পশ্চিমবঙ্গ, মেঘালয় ও ত্রিপুরায় ‘মমতা অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস’ এবং ‘ডেমোক্রেটিক তৃণমূল কংগ্রেস’—উভয়কেই স্বীকৃত রাজনৈতিক দল হিসেবে গণ্য করা হবে বলে জানিয়ে দেয় নির্বাচন কমিশন।
বৃহস্পতিবার রাতে নির্বাচন কমিশন ‘অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস’ নাম ও এর প্রতীক ব্যবহারের ওপর স্থগিতাদেশ দিয়ে একটি অন্তর্বর্তীকালীন নির্দেশ জারি করে। মমতা দাবি করেন, রাত পৌনে একটা নাগাদ কমিশনের তরফে তাঁকে এই অন্তর্বর্তীকালীন নির্দেশের বিষয়ে জানানো হয়।
আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে, ক্ষমতায় থাকাকালীন কংগ্রেসের কঠোর সমালোচক হওয়া সত্ত্বেও মমতা এখন পুরোনো তিক্ততা ভুলে এগিয়ে যাওয়ার পথ বেছে নিয়েছেন। মমতা বলেছেন, “রাহুল জি আমাকে ফোন করেছিলেন। তাঁরা সবাই টুইট করেছেন। অরবিন্দ (কেজরিওয়াল) জি-ও টুইট করেছেন। আমরা যৌথভাবে লড়াই করব। কোনোভাবেই বিজেপির কাছে নতিস্বীকার করব না। আমরা আমাদের স্বাভাবিক মিত্রদের সমর্থন করতে পারি। কিন্তু আমরা সেই জঘন্য, নোংরা, ধূর্ত এবং মারাত্মক ভাইরাসের মতো শক্তিকে সমর্থন করতে পারি না। তাদের উদ্দেশ্য ও অভিসন্ধি স্পষ্ট।”
কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তকে মমতা ‘অসাংবিধানিক, বেআইনি এবং সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রতিহিংসা’ বলে অভিহিত করেছেন। মমতা বলেন, “শিবসেনা ও এনসিপি-র ক্ষেত্রে কী ঘটেছে, তা আমরা দেখেছি। বিজেপিকে সমর্থন করার জন্য আমাদেরও হুমকি দেওয়া হয়েছিল। দেশের ও জনগণের স্বার্থে আমরা তা প্রত্যাখ্যান করেছিলাম। তারা এসআইআর-এর পরিকল্পনা করেছিল, তারা নির্বাচন চুরি করেছিল, ইভিএম কব্জা করেছিল এবং গণনা এজেন্টদের বের করে দিয়ে সিআরপিএফ ও সিআইএসএফ কর্মীদের দিয়ে ভোট গণনা করিয়েছিল। কিন্তু আমরা কখনও ভাবিনি যে তারা আমাদের ২৯ বছরের পুরোনো দলের নাম ও প্রতীকও কেড়ে নেবে।” তাঁর অভিযোগ, বিজেপির বার্তাটি স্পষ্ট- হয় বিজেপি-সমর্থিত ওই বাজে দলটিতে যোগ দিন, নয়তো গ্রেপ্তার হোন। আমাদের প্রায় ১৪ হাজার কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এটি একটি বিশ্বরেকর্ড। এমনকি আফ্রিকার কোনো কোনো দেশেও এমনটা ঘটেনি।”
একইসঙ্গে ঋতব্রত তৃণমূলের আনা অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে মমতা বলেন, দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী নির্ধারিত সময়েই সাংগঠনিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। তিনি আরও বলেন, “এই অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ বেআইনি এবং আমরা এর বিরুদ্ধে আইনি লড়াই চালাব।” তাঁর প্রশ্ন, মনোনয়ন প্রক্রিয়া চলাকালীন কেন তাদের এমনটা করতে হল ? কেন রাতের অন্ধকারে গণতন্ত্রকে হত্যা করতে হবে ? আমরা আত্মসমর্পণ করব না। আমরা মাথা নত করব না। আমরা লড়াই চালিয়ে যাব এবং ঘুরে দাঁড়াব।”