শুক্লা মাইতি; অন্যায়ের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি বিজেপি সরকারের। ১৪ বছর পর পুনরায় খুলল প্রতিবাদী বরুণ বিশ্বাস খুনের ফাইল। ১৪ বছর পর সরকার বদল হলে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর জনতার দরবারে বিচারের আর্জি নিয়ে যান মৃত বরুণ বিশ্বাসের পরিবার। নতুন করে শুরু হয়েছে তদন্ত । CID তদন্ত ভার নেওয়ায় আশাবাদী মৃত বরুণের পরিবার।
দিনটা ছিল ২০১২ সালের ৫ জুলাই, সেদিনও প্রতিদিনের মতো স্কুল থেকে নিজের বাইকে বাড়ি ফিরছিলেন প্রতিবাদী শিক্ষক বরুণ বিশ্বাস। গোবরডাঙ্গা স্টেশনে নেমে বাইকে করে বাড়ি ফেরার আগেই স্টেশন চত্বরে গুলি করে বরুণ বিশ্বাসকে খুন করে দুর্বৃত্তরা। কলকাতার মিত্র ইনস্টিটিউশনের শিক্ষক ছিলেন তিনি। সেই সময় গাইঘাটার সুটিয়া এলাকায় ঘটে যায় একের পর এক নারী নির্যাতন ও গণধর্ষণের ঘটনা। এর অসামাজিক কাজে প্রতিবাদ জানিয়ে তৈরি করেন একটি মঞ্চ। যার নাম ছিল ” সুটিয়া গণধর্ষণ প্রতিরোধ মঞ্চ “। যার নেতৃত্বে ছিলেন গাইঘাটার সুটিয়া গ্রামের বাসিন্দা বরুণ বিশ্বাস। তবে কি তৃণমূল জামানায় ঘটে চলা অন্যায়ের প্রতিবাদ করাটাই ছিল তার অপরাধ?? প্রতিবাদী মঞ্চের প্রথম সারিতে থাকায় তাকে একাধিকবার হুমকির মুখে পড়তে হয়। শুধু নারী নির্যাতন নয়, এলাকার খাল বিল বুজিয়ে, কোথাও ইচ্চামতি ও যমুনা নদীর পাড় দখল করে অবৈধ নির্মাণ হয় সেই সময়। এইসব অসামাজিক কার্যকলাপের পিছনে ছিল রাজনৈতিক মদত। এলাকার বাসিন্দাদের অভিযোগ, মদতদাতারা ছিলেন এলাকার দাপুটে নেতা। এরই বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে বিভিন্ন সরকারি মহলে নালিশ জানাতে থাকেন বরুণ। প্রতিবাদের ফল ভোগ করতে গুলি করে খুন হতে হয় বরুণ বিশ্বাসকে। দীর্ঘক্ষণ রক্তাক্ত অবস্থায় বরুণ বিশ্বাস স্টেশন চত্বরে পড়ে থাকলেও তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার সাহস পাননি কেউ। কারণ, সেই সময় এলাকায় দুষ্কৃতীদের দাপট তটস্থ ছিলেন সাধারণ মানুষ। কয়েকঘণ্টা পরে বরুণ বিশ্বাসকে গোবরডাঙ্গা হাসপাতাল, ও পরবর্তীতে হাবরা হাসপাতালে নিয়ে গেলে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মৃত্যু হয়। সেই সময় বরুণ বিশ্বাসের খুনে গর্জে উঠেছিল রাজ্যের বাম সংগঠনগুলি, বাম ছাত্র সংগঠন SFI এর একাধিক মিছিলে মুখরিত হয়ে উঠেছিল কল্লোলিনী কলকাতা থেকে জেলার বিভিন্ন প্রান্ত। নির্বাক ছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার।
তারপর কেটে গিয়েছে ১৪ টা বছর, সেই পুরানো তৃণমূল জামানা থেকে রাজ্যের সরকার সবটাই পরিবর্তন হয়ে গিয়েছে ইতিমধ্যে। ১৪ বছর বাদে পরিবারের আবেদনে সাড়া দিয়ে নতুন করে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে বিজেপি সরকার। এই বিষয়ে বলতে গিয়ে দাদা অসিত বিশ্বাস বারবার বিগত সরকার আমলে তদন্তের নামে প্রহসনের অভিযোগ করেছেন । নতুন করে তদন্ত শুরু হওয়ায় আশায় বরুণ বিশ্বাসের দাদা।
২০১২ সালে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল জামানায় বিচার পাননি বরুণ বিশ্বাসের পরিবার। উপরন্তু বরুণ বিশ্বাসের দিদি প্রমিলা বিশ্বাস প্রথম থেকে দাবি করেছিলেন তৃণমূলের দাপুটে নেতা তথা মন্ত্রী জ্যোতিপ্রিয় মল্লিকের নির্দেশেই এই খুন হয়েছে। জ্যোতিপ্রিয় মল্লিকই মূল দোষী বলে বারবার গ্রেপ্তারের দাবি করে এসেছে বরুণ বিশ্বাসের দিদি প্রমিলা বিশ্বাস। বর্তমানে মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশের পর বরুণ বিশ্বাসের পরিবারের সঙ্গে কথা বলতে উত্তর ২৪ পরগণার গাইঘাটার সুটিয়ায় যায় CID তদন্তকারী দল।
বৃহস্পতিবার পরিবারের সাথে কথা বলে দীর্ঘ প্রায় আড়াই ঘন্টা বাদে বরুন বিশ্বাসের বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায় সিআইডির দুই প্রতিনিধি দল। পরিবারের অভিযোগ ২০১২ সালে বরুণ বিশ্বাস খুনে কয়েকজনকে গ্রেফতার করে পুলিশ মূল অভিযুক্ত ছিল এক নাবালক । বছর ষোলোর ওই নাবালকই গুলি চালিয়েছিল বলে জানা যায়। দুষ্কৃতিরা এই নাবালকের পরিবারকে টাকা দিয়ে বরুণ বিশ্বাসকে খুনের পরিকল্পনা করেছিল। বরুণের পরিবারের অভিযোগ, ১৪ বছর বিচারের আশায় থেকেও কোন লাভ হয়নি। উল্টে একের পর এক অভিযুক্তরাও জামিনে মুক্তি পেয়েছে । তাই রাজ্যে পালাবদল হওয়ার পর মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর দারস্থ হয়ে বরুণ বিশ্বাস খুনের ফাইল পুনরায় খোলার দাবি করে পরিবার। এখন দেখার নতুন করে CID তদন্ত শুরু হবার পর বিচারের দাবি পূরণ হয় কিনা বরুণ বিশ্বাসের পরিবারের। যেখানে বর্তমান রাজ্য সরকার অন্যায়ের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি অবলম্বন করার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ , সেখানে সঠিক ন্যায় বিচার পাওয়া সময়ের অপেক্ষা !