নিজস্ব সংবাদদাতা : পূর্ব মেদিনীপুর জেলার নন্দীগ্রাম উপনির্বাচনে আরও বড় জয়ের প্রত্যাশা করছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। সোমবার নন্দিগ্রামে একগুচ্ছ প্রকল্পের উদ্বোধন করতে গিয়ে এমন অভিপ্রায় প্রকাশ করলেন তিনি। তাঁর সরকারের বিভিন্ন কাজের কথা তুলে ধরে সোমবার মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী আসন্ন উপনির্বাচনে আগের জয়ের ব্যবধান আরও বাড়ানোর জন্য জনগণের কাছে আহ্বান জানান। তাঁর দাবি, “পূর্ববর্তী তৃণমূল সরকারের আমলে দীর্ঘদিনের অবহেলার যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, তাঁর প্রশাসন তা সমাধানের জন্য কাজ করে চলেছে।”
নন্দীগ্রামে পঞ্চায়েত ও গ্রামোন্নয়ন দপ্তরের এক অনুষ্ঠানে ভাষণ দেওয়ার সময় এই এলাকার সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ দিনের রাজনৈতিক সম্পর্কের কথা উল্লেখ করেন শুভেন্দু অধিকারী। এদিন তাঁর এই পুরোনো বিধানসভা কেন্দ্রের রাস্তা, সেতু ও স্বাস্থ্য পরিষেবাসহ একাধিক গ্রামোন্নয়ন ও পরিকাঠামো প্রকল্পের সূচনা করেন। সেই সঙ্গে তিনি জমি অধিগ্রহণ-বিরোধী আন্দোলনের কথাও স্মরণ করিয়ে দেন, যে আন্দোলন এই এলাকাকে পশ্চিমবঙ্গ রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছিল। এদিনের সভায় উপস্থিত জনতার প্রতি তাঁর আহ্বান, সামনের নির্বাচনে এই কেন্দ্রে বিজেপির জয়ের ব্যবধান যেন আরও বাড়ে। এভাবেই তিনি উন্নয়নমূলক কর্মসূচির মঞ্চকে আরও জোরালো রাজনৈতিক সমর্থনের আবেদনে রূপান্তরিত করেন।
তিনি বলেন, “নন্দীগ্রামই আমাদের অগ্রাধিকার। আপনারা আমাকে নির্বাচিত করেছিলেন এবং আমি প্রায় সাড়ে তিন মাস ধরে মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছি। এই স্বল্প সময়ে আমরা যে কাজ করেছি, তা কেবল শুরুর ধাপ মাত্র।” তিনি বলেন। শুভেন্দু আরও বলেন, “গতবার আপনারা আমাকে ৮২,০০০ ভোটের ব্যবধানে জিতিয়েছিলেন। এবার সেই রেকর্ড ভাঙতে হবে।” তিনি বারবার উপস্থিত জনতার কাছে প্রতিশ্রুতি চান যে, তারা তাঁকে যেন নতুন রেকর্ড গড়তে সহায়তা করে। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে নন্দীগ্রাম ও ভবানীপুর—উভয় কেন্দ্র থেকেই জয়ী হওয়ার পর বিধায়ক পদ থেকে ইস্তফা দেওয়ায় নন্দীগ্রাম বিধানসভা আসনটি শূন্য হয়ে পড়ে। নির্বাচন কমিশন এখনও এই কেন্দ্রে উপনির্বাচনের তারিখ ঘোষণা না করলেও সোমবার নন্দীগ্রামে এসে মুখ্যমন্ত্রী ভোটের দামামা বাজিয়ে গেলেন।
নন্দীগ্রাম বরাবরই অধিকারীর রাজনৈতিক পরিচয়ের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তিনি এই কেন্দ্র থেকে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে হারিয়েছিলেন। ২০২৬ সালের নির্বাচনেও আসনটি ধরে রেখেছিলেন শুভেন্দু অধিকারী। পাশাপাশি দক্ষিণ কলকাতায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিজের এলাকা ভবানীপুরেও তাঁকে পরাজিত করেছিলেন।
মুখ্যমন্ত্রী পূর্ববর্তী সরকারের—বিশেষ করে নন্দীগ্রামের উন্নয়ন ও ঝুলে থাকা প্রকল্পগুলোর—তুলনায় বর্তমান সরকারের কাজের একটি স্পষ্ট রাজনৈতিক পার্থক্য তুলে ধরার চেষ্টা করেন। তিনি অভিযোগ করেন, ওই নির্বাচনী কেন্দ্রটি হাতছাড়া হওয়ার পর আগের মুখ্যমন্ত্রী নন্দীগ্রামের রেল প্রকল্পটিকে আটকে রেখেছিলেন। তিনি দাবি করেন, প্রকল্পটির জন্য মাত্র ছয় একর জমির প্রয়োজন ছিল। সরকারে এসে ইতিমধ্যেই প্রায় সাড়ে তিন একর জমি রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের হাতে তুলে দিয়েছে তিনি। প্রস্তাবিত রেল সংযোগের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে শুভেন্দু বলেন, “বাকি জমিও আমরা দিয়ে দেব। আগামী বছরের মার্চের মধ্যে আমি নন্দীগ্রাম রেলওয়ে স্টেশন থেকে ট্রেনে চড়ব।”
এই অনুষ্ঠানে শুভেন্দু অধিকারী নন্দীগ্রাম আন্দোলনের ইতিহাস এবং সেই সময়কার সহিংসতার প্রসঙ্গও তুলে ধরেন। জমি অধিগ্রহণ-বিরোধী আন্দোলনের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, ব্রিটিশ শাসন এবং পরবর্তীকালের রাজনৈতিক নিপীড়ন—উভয়ের বিরুদ্ধেই রুখে দাঁড়ানোর ইতিহাস রয়েছে এই অঞ্চলের মানুষের। ২০০৭ সালের নন্দীগ্রাম জমি অধিগ্রহণ-বিরোধী আন্দোলন ছিল একটি প্রস্তাবিত রাসায়নিক হাব বা শিল্পকেন্দ্রের বিরুদ্ধে কৃষকদের তীব্র প্রতিবাদ; পুলিশের গুলিতে ১৪ জনের মৃত্যু এবং শেষ পর্যন্ত রাজ্যের বামফ্রন্ট সরকারের পতনের মধ্য দিয়ে যার পরিসমাপ্তি ঘটেছিল।
তিনি অভিযোগ করেন, নন্দীগ্রাম আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত মানুষদের জড়িয়ে থাকা বিভিন্ন মামলা ও সমস্যা সমাধানে আগের তৃণমূল সরকার ব্যর্থ হয়েছিল। তবে তিনি দাবি করেন, স্থানীয় বাসিন্দাদের বিরুদ্ধে দায়ের করা হাজার হাজার মামলা প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে। তিনি বলেন, “আপনাদের বিরুদ্ধে একটিও মামলা থাকবে না। আপনাদের বিরুদ্ধে দায়ের করা সব মামলা প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে।” মুখ্যমন্ত্রী অতীতের হিংসাত্মক ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর কথাও উল্লেখ করেন। তিনি জানান, নিহতদের পরিবারের জন্য মৃত্যুসনদ ও কর্মসংস্থানের মতো ঝুলে থাকা বিষয়গুলোর সুরাহা তার সরকার করেছে।
বাংলার রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে জনকল্যাণমূলক সুবিধা—বিশেষ করে স্বাস্থ্য সুরক্ষা, আবাসন সহায়তা এবং নারীদের জন্য আর্থিক সহায়তার বিষয়টিকে যুক্ত করার চেষ্টা করেন শুভেন্দু অধিকারী। পূর্ববর্তী সরকারের ‘স্বাস্থ্য সাথী’ প্রকল্পের সমালোচনা করে তিনি দাবি করেন, ‘আয়ুষ্মান ভারত’ এবং রাজ্যের স্বাস্থ্য বিমা কর্মসূচির আওতায় সুবিধাভোগীরা সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালের অনেক বড় নেটওয়ার্কের সেবা পাবেন এবং ৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত চিকিৎসার সুবিধা উপভোগ করতে পারবেন। তিনি বিশেষ করে রাজ্যের বাইরের বিভিন্ন শহরে বসবাসরত নন্দীগ্রামের পরিযায়ী শ্রমিকদের কথা উল্লেখ করেন। বলেন, নতুন ব্যবস্থার অধীনে তারাও স্বাস্থ্যসেবা সংক্রান্ত সুবিধাগুলো পাবেন।