নিজস্ব প্রতিনিধি, নদিয়া: সাংসদ মহুয়া মৈত্রের দায়ের করা অভিযোগের ভিত্তিতে ভিন রাজ্যে অভিযুক্তকে গ্রেফতার করতে গিয়ে চরম সমস্যার মুখে পড়ল নদিয়া জেলার কৃষ্ণনগর পুলিশের বিশেষ দল। নয়ডার এক যুবকের বিরুদ্ধে মহুয়া মৈত্র ও রাজনৈতিক কৌশলবিদ প্রশান্ত কিশোরের ভুয়ো কথোপকথন সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
ঘটনার সূত্রপাত গত ২৭ ফেব্রুয়ারি। কৃষ্ণনগরের সাংসদ মহুয়া মৈত্র কৃষ্ণনগর কোতোয়ালি থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, নয়ডার বাসিন্দা সুরজিৎ দাশগুপ্ত নামে এক ব্যক্তি সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি ভুয়ো চ্যাট প্রকাশ করেছেন, যেখানে মহুয়া মৈত্র ও প্রশান্ত কিশোরের মধ্যে কথোপকথন দেখানো হয়েছে। ওই চ্যাটটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তৈরি করে বিভ্রান্তি ছড়ানো হয়েছে বলে অভিযোগ।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, অভিযোগ পাওয়ার পর কৃষ্ণনগর পুলিশ জেলার ডিজিটাল ফরেনসিক বিভাগ ওই চ্যাটের প্রযুক্তিগত পরীক্ষা করে। ফরেনসিক রিপোর্টে নিশ্চিত করা হয়, চ্যাটটি সম্পূর্ণ ভুয়ো ও মনগড়া। এরপর অভিযুক্ত সুরজিৎ দাশগুপ্তের বিরুদ্ধে ভারতীয় দণ্ডবিধির একাধিক ধারায় মামলা রুজু করা হয় এবং তাকে থানায় হাজিরার জন্য নোটিস পাঠানো হয়।
অভিযোগ দায়েরের পর ৯ ফেব্রুয়ারি অভিযুক্তকে থানায় হাজিরার নির্দেশ দেওয়া হলেও তিনি উপস্থিত হননি। শুধু তাই নয়, পুলিশের সঙ্গে কোনওরকম যোগাযোগও করেননি বলে অভিযোগ। বারবার তলব সত্ত্বেও সাড়া না মেলায় কৃষ্ণনগর পুলিশ আদালতের দ্বারস্থ হয়। আদালতের নির্দেশে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়।
এই গ্রেফতারি পরোয়ানার ভিত্তিতে কৃষ্ণনগর কোতোয়ালি থানার চার সদস্যের একটি বিশেষ দল নয়ডায় অভিযুক্তকে গ্রেফতার করতে যায়। তবে সেখানেই ঘটে অপ্রত্যাশিত ঘটনা। পুলিশের দাবি, নয়ডায় পৌঁছে অভিযুক্তের খোঁজ করতে গিয়ে স্থানীয় পুলিশের বাধার মুখে পড়ে কৃষ্ণনগরের দল।
পুলিশ সূত্রে অভিযোগ, নয়ডার ফেজ-টু থানার অন্তর্গত চৌকি নম্বর ১১০-এর পুলিশ সদস্যরা কৃষ্ণনগরের বিশেষ দলকে কার্যত বাধা দেয়। অভিযুক্তকে গ্রেফতার করতে গেলে স্থানীয় পুলিশের হস্তক্ষেপে তা সম্ভব হয়নি। অভিযোগ রয়েছে, ওই পুলিশ সদস্যরা কৃষ্ণনগরের দলকে এলাকা ছেড়ে চলে যেতে বলেন এবং অভিযুক্তকে পালাতে সাহায্য করেন।
এমনকি আদালতের গ্রেফতারি পরোয়ানা থাকা সত্ত্বেও প্রায় দেড় ঘণ্টা ধরে কৃষ্ণনগরের পুলিশ দলকে থানায় বসিয়ে রাখা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। কৃষ্ণনগর কোতোয়ালি থানার আইসি জানিয়েছেন, স্থানীয় পুলিশ মৌখিকভাবে জানায়, “রাজনৈতিক উচ্চ মহল থেকে নির্দেশ রয়েছে গ্রেফতার না করার।”
আইসি আরও দাবি করেছেন, অভিযুক্ত সুরজিৎ দাশগুপ্ত নাকি ভারতীয় জনতা পার্টির স্থানীয় মিডিয়া সেলের সঙ্গে যুক্ত। এই কারণেই তাকে গ্রেফতার করা যাচ্ছে না বলে স্থানীয় পুলিশ ইঙ্গিত দেয় বলে অভিযোগ।
বর্তমানে কৃষ্ণনগরের বিশেষ দল এখনও নয়ডাতেই অবস্থান করছে এবং অভিযুক্তকে গ্রেফতারের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বিষয়টি ইতিমধ্যেই ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। আদালতের নির্দেশ মেনেই পরবর্তী আইনানুগ পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন কৃষ্ণনগর কোতোয়ালি থানার আইসি।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই রাজ্যের পুলিশের মধ্যে সমন্বয় ও সহযোগিতা নিয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে। আদালতের গ্রেফতারি পরোয়ানা থাকা সত্ত্বেও অভিযুক্তকে গ্রেফতার করা না যাওয়ায় প্রশাসনিক স্তরে চাপানউতোর শুরু হয়েছে। গোটা বিষয়টি রাজনৈতিক রঙ নিয়েছে কি না, তা নিয়েও আলোচনা চলছে। এখন দেখার, অভিযুক্তকে আদৌ গ্রেফতার করা সম্ভব হয় কি না এবং দুই রাজ্যের পুলিশের মধ্যে এই সংঘাত কোন দিকে মোড় নেয়।
