ওঙ্কার ডেস্ক : জনজীবনে সমস্যা তৈরি করে এমন বাঘেদের উদ্ধার করে তাদের জন্য প্রাকৃতিক আবাস্থল বানিয়েছে নেপাল। এরা মূলত সেইসব বাঘ, যারা মানুষের নিরাপত্তার জন্য সরাসরি হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। এদের মধ্যে প্রায়শই থাকে বয়স্ক বা আহত বাঘ, যারা স্বাভাবিক শিকার ধরতে অক্ষম। তাদের জন্য সুরক্ষিত অভয়ারণ্য গড়ে তোলার পর এবার নজর ইকো-ট্যুরিজমের দিকে। নেপাল তার দক্ষিণের জেলা চিতওয়ানের ‘চিতওয়ান জাতীয় উদ্যানে’ দেশের প্রথম বাঘ অভয়ারণ্য গড়ে তোলার পরিকল্পনা নিয়েছে।
ধারাবাহিক সংরক্ষণ প্রচেষ্টার ফলে ২০০৯ সালে ১২১টি বাঘের তুলনায় ২০২২ সালে নেপালে বাঘের সংখ্যা প্রায় তিনগুণ বেড়ে ৩৫৫-এ দাঁড়িয়েছে। তবে, বাঘের সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে মানুষ ও বাঘের সংঘাতের ঘটনাও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। যার ফলে বাঘ উদ্ধার কেন্দ্রগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি হয়েছে। এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলায় নেপাল সরকার বাঘ অভয়ারণ্যটি গড়ে তোলার পরিকল্পনা করে। এর মাধ্যমে একদিকে যেমন ক্রমে বেড়ে ওঠা ‘সমস্যাসঙ্কুল বাঘেদের’ থাকার ব্যবস্থা করা হচ্ছে, তেমনি এই স্থানটিকে একটি প্রধান ইকো-ট্যুরিজম গন্তব্য হিসেবেও গড়ে তোলা হবে।
জাতীয় উদ্যান ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ বিভাগের বরিষ্ঠ ইকোলজিস্ট হরি ভদ্র আচার্য জানিয়েছেন, “প্রস্তাবিত অভয়ারণ্যটি চিতওয়ানের দেবনগরে প্রায় ৫২ হেক্টর জমির ওপর গড়ে তোলা হবে। এর নকশা এমনভাবে করা হয়েছে যাতে ১৮ থেকে ২০টি বাঘ সেখানে থাকতে পারে।” তিনি আরও বলেন, “বর্তমানে উদ্ধার করা সমস্যাসঙ্কুল বাঘগুলোকে বিভিন্ন স্থানে ছোট খাঁচায় রাখা হচ্ছে। আমাদের মূল লক্ষ্য হল তাদের জন্য অনেক বড় একটি ঘেরা জায়গা বা এনক্লোজার তৈরি করা, যেখানে তারা আরও স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারবে। একইসঙ্গে জনজীবনে নিরাপত্তাও নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।”
জাতীয় উদ্যান ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সরকার ২০২৬-২৭ অর্থবছরের (যা জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হবে) জন্য এই প্রকল্পে ইতিমধ্যেই ৩ কোটি নেপালি রুপি বরাদ্দ করেছে। দেবনগরে অবস্থিত বন্যপ্রাণী উদ্ধার কেন্দ্রটিকে সম্প্রসারিত করে এই অভয়ারণ্যটি গড়ে তোলা হবে; এই কেন্দ্রে ইতিমধ্যেই পশুচিকিৎসার সুবিধা এবং উদ্ধার করা প্রাণীদের রাখার মতো ব্যবস্থা রয়েছে। এই প্রকল্পের লক্ষ্য হল বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের পাশাপাশি পরিবেশ-বান্ধব পর্যটন বা ‘ইকো-ট্যুরিজম’-এর ব্যবস্থা করা, যাতে অভয়ারণ্যটির দীর্ঘমেয়াদী পরিচালনার জন্য—যেমন প্রাণীদের খাবার ও রক্ষণাবেক্ষণ—প্রয়োজনীয় অর্থ বা রাজস্ব আয় করা সম্ভব হয়।
প্রস্তাবিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, দর্শনার্থীরা উঁচু ক্যানোপি ব্রিজ ও পর্যবেক্ষণ টাওয়ার থেকে অথবা নির্ধারিত পথে চলাচলকারী বিশেষ মডেলের সুরক্ষিত সাফারি গাড়িতে বসে বাঘ দেখতে পারবেন। তখন বাঘগুলোর নিরাপদ বেষ্টনীর ভেতরে অবাধ বিচরণে বাধা পড়বে না।
হরি ভদ্র আচার্যের মতে, বন করিডোর দিয়ে বন্যপ্রাণীর চলাচলে যাতে কোনো ব্যাঘাত না ঘটে, সেভাবেই এই অভয়ারণ্যটির নকশা করা হয়েছে। এটি তিনটি প্রধান অংশে ভাগ করা থাকবে : এক, ‘হোল্ডিং সেন্টার’ বা প্রাথমিক রাখার জায়গায় দুটি বাঘ। দুই, উঁচু পর্যবেক্ষণ এলাকা থেকে দেখা যায় এমন বেষ্টনীতে চারটি বাঘ। তিন, ‘জিপ সাফারি’ জোনে ১০ থেকে ১২টি বাঘ রাখার ব্যবস্থা থাকবে।
তিনি বলেন, “পুরুষ ও স্ত্রী বাঘগুলোকে অবশ্য একসঙ্গে রাখা সম্ভব। সব মিলিয়ে, এই অভয়ারণ্যে ১৮ থেকে ২০টি বাঘ রাখার মতো ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।” তাঁর মতে, “বাঘগুলো বেষ্টনীর ভেতরে অবাধে ঘুরে বেড়াবে, আর দর্শনার্থীরা বিশেষ মডেলের সুরক্ষিত খাঁচার মতো সাফারি গাড়িতে চড়ে ওই এলাকাটি ঘুরে দেখবেন। নির্ধারিত সাফারি রুট এবং ‘ফায়ার লাইন’ গাড়িগুলোকে বন্যপ্রাণী থেকে আলাদা রাখবে।” দর্শনার্থী ও প্রাণী—উভয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অভয়ারণ্যে তিন স্তরের বেষ্টনী ব্যবস্থা থাকবে, যার মধ্যে রয়েছে শক্তিশালী দ্বৈত সীমানা বেষ্টনী এবং অভ্যন্তরীণ প্রতিবন্ধক।
হরি ভদ্র আচার্য জানান, সুস্থ ও বন্য পরিবেশে বিচরণকারী বাঘের পরিবর্তে শুধুমাত্র ‘সমস্যাসঙ্কুল বাঘ’—যাদের আর বন্য পরিবেশে ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়—তাদেরই এই অভয়ারণ্যে রাখা হবে। তিনি তিনটি প্রধান পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করেছেন যার ফলে বাঘ ও মানুষের মধ্যে সংঘাতের সৃষ্টি হয়। নতুন এলাকার সন্ধানে বেরিয়ে পড়া তরুণ বাঘেরা অনেক সময় ঘনবসতিপূর্ণ বাঘের এলাকা থেকে লোকালয়ের দিকে চলে আসে এবং সেখানে গবাদি পশু বা মানুষের ওপর আক্রমণ শুরু করতে পারে।
এলাকা দখলের লড়াইয়ে আহত বাঘেরা প্রায়শই তাদের স্বাভাবিক শিকার ধরার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে; ফলে তারা লোকালয়ের কাছাকাছি থাকা সহজ শিকারের দিকে ঝুঁকে পড়ে। এছাড়া বয়স্ক বাঘেরাও দাঁত ও থাবা ক্ষয়ে যাওয়ার কারণে শিকার ধরার ক্ষমতা হারিয়ে লোকালয়ের দিকে চলে আসে। হরি ভদ্র আচার্য বলেন, “এ ধরনের বাঘের আক্রমণ থেকে মানুষ ও তাদের গবাদি পশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই এই বাঘ অভয়ারণ্য গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হয়েছে।”
প্রস্তাবিত এই অভয়ারণ্য নির্মাণের কাজ এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। হরি ভদ্র আচার্যর নেতৃত্বে গঠিত একটি কারিগরি কমিটি এই প্রকল্পের বিষয়ে একটি কনসেপ্ট রিপোর্ট জমা দিয়েছে। তাঁর মতে, “শীঘ্রই একটি বিস্তারিত প্রকল্প রিপোর্ট তৈরি করা হবে, যেখানে প্রকল্পের নকশা, বাস্তবায়নের পরিকল্পনা এবং সম্ভাব্য ব্যয়ের হিসাব উল্লেখ থাকবে। নির্মাণকাজ শুরু হলে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তুলতে অন্তত দুই থেকে তিন বছর সময় লাগতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।”