ওঙ্কার ডেস্ক:রাশিয়া থেকে তেল আমদানিকে কেন্দ্র করে আমেরিকার অবস্থান নিয়ে তীব্র সমালোচনা করলেন ভারতের বিদেশমন্ত্রী এস. জয়শঙ্কর। এক আন্তর্জাতিক মঞ্চে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি অভিযোগ করেন, রাশিয়ার তেল কেনা নিয়ে বর্তমানে যে দেশগুলি ভারতের সমালোচনা করছে, অতীতে তারাই ভারতকে এই তেল আমদানি করতে উৎসাহিত করেছিল। তাঁর মতে, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে অনেক সময় নীতির চেয়ে স্বার্থই বেশি গুরুত্ব পায় এবং সেই কারণেই বিভিন্ন দেশের অবস্থানে বারবার পরিবর্তন দেখা যায়।
জয়শঙ্কর বলেন, ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর বিশ্বজুড়ে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল। সেই সময় তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং বিশ্ববাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার জন্য ভারতকে রাশিয়া থেকে তেল কেনার বিষয়ে উৎসাহ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এখন একই বিষয়কে কেন্দ্র করে ভারতের বিরুদ্ধে শুল্ক আরোপ কিংবা বাণিজ্যিক চাপ সৃষ্টির চেষ্টা করা হচ্ছে। এই অবস্থানগত পরিবর্তনকে তিনি ‘দ্বিচারিতা’ বলে অভিহিত করেন।
বিদেশমন্ত্রী আরও স্পষ্ট করেন যে, ভারতের পররাষ্ট্রনীতি এবং অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণভাবে দেশের জাতীয় স্বার্থকে সামনে রেখেই নেওয়া হয়। দেশের প্রায় ১৪০ কোটি মানুষের জ্বালানি চাহিদা পূরণ করা সরকারের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। তাই সাশ্রয়ী মূল্যে এবং নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে জ্বালানি পাওয়া গেলে ভারত সেই সুযোগ গ্রহণ করবে। কোনও আন্তর্জাতিক চাপ বা রাজনৈতিক মন্তব্যের ভিত্তিতে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে আপস করা হবে না বলেও তিনি ইঙ্গিত দেন।
জয়শঙ্কর পশ্চিমা দেশগুলির সমালোচনা করে বলেন, অনেক দেশ ভারতের রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন তোলে, অথচ অতীতে তারাই এমন দেশগুলিকে অস্ত্র বিক্রি করেছে, যাদের কাছ থেকে ভারত নিরাপত্তা সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে। ফলে অন্য দেশের সিদ্ধান্ত নিয়ে মন্তব্য করার আগে নিজেদের ভূমিকাও পর্যালোচনা করা প্রয়োজন বলে তিনি মন্তব্য করেন।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্য এবং আমেরিকার বাণিজ্য নীতির প্রসঙ্গও উঠে আসে তাঁর বক্তব্যে। জয়শঙ্করের মতে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও কূটনীতির ক্ষেত্রে সমতা এবং পারস্পরিক সম্মানের নীতি অনুসরণ করা উচিত। কোনও দেশের ওপর চাপ সৃষ্টি করে তার নীতি নির্ধারণ করানোর চেষ্টা দীর্ঘমেয়াদে ইতিবাচক ফল বয়ে আনে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদেশমন্ত্রীর এই বক্তব্য ভারতের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতিরই প্রতিফলন। ইউক্রেন যুদ্ধের পর থেকে ভারত একদিকে যেমন রাশিয়ার সঙ্গে জ্বালানি বাণিজ্য বজায় রেখেছে, অন্যদিকে আমেরিকা ও পশ্চিমা দেশগুলির সঙ্গেও কৌশলগত সম্পর্ক শক্তিশালী করার চেষ্টা করেছে। সেই প্রেক্ষাপটে জয়শঙ্করের মন্তব্য স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, আন্তর্জাতিক চাপ সত্ত্বেও জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে ভারত নিজের অবস্থান থেকে সরে আসতে রাজি নয়। দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং কৌশলগত স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়েই ভবিষ্যতেও সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে তাঁর বক্তব্যে ইঙ্গিত মিলেছে।