তাপস মহাপাত্র
নেপালের জেন জি-র গণঅভ্যুত্থান থিতিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে মাথাচাড়া দিচ্ছে একটাই প্রশ্ন, এই আচমকা অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতি পিছনে ছায়াটি কার ? ভৌগলিক অবস্থান ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রেক্ষাপটে স্বাভাবিক ভাবে দুটো নামই উঠে আসে- আমেরিকা, না চিন। সাম্প্রতিক ঘটনা প্রবাহের দিকে নজর দিলে বেশ কিছু সমীকরণ উঁকি দিচ্ছে। তবে সেই সব সমীকরণের অনেক শর্তই যাচাই করা যেতে পারে শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান এবং বাংলাদেশের গন অভ্যুত্থানের অভিজ্ঞতা থেকে।
আগের তিনটি রাষ্ট্রারে অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতির সঙ্গে নেপালেও অনেকটাই মিলে যাচ্ছে। যা হল, দুর্নীতি এবং স্বজনপোষণ। প্রতিটি ক্ষেত্রেই গণরোষ জাগিয়েছে কোনো আবেগ প্রবণ ইস্যু যা ছাত্র ও তরুণ সমাজকে আন্দোলিত করেছে। বাংলাদেশের বেলায় যা ছিল কোটা সিস্টেম, নেপালের বেলায় তেমনি দেখা গেল সমাজ মাধ্যমের উপর নিষেধাজ্ঞা। চিনের তিয়েন-আন-মেন স্ক্যোয়ারের ঘটনা আজও ইতিহাস। সেখানেও প্রবল অশান্তি দেখা গিয়েছিল ছাত্র যুব সমাজে। গ্লাস্তনস্ত ও পেরেস্ত্রৈকা-র পিছনেও ছিল রাশিয়ার অধুনা শিক্ষিত সমাজ। অর্থাৎ যে কোনো পরিবর্তনের পিছনে তরুণ শক্তিই যে মানদণ্ড হয়ে ওঠে তা বারবার প্রমাণিত হয়েছে। এ দেশে ’৭১-এর নকশাল আন্দোলনও ছড়িয়ে পড়েছিল তরুণ সমাজের উপর ভর করে। কারণ একটাই তরুণদের আবেগ প্রবণ মন যে কোনো বাধাকেই উপেক্ষা করে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে। নেপালের ক্ষেত্রেও তার অন্যথা হয়নি। কিন্তু এই আবেগকে কাজে লাগাতে যে শক্তি কলকাঠি নাড়ে তারা রয়ে যায় নেপথ্য কারিগর। সেখানে থাকে উদ্দেশ্য কিংবা অভিসন্ধি। যা বৃহত্তর রাজনীতি পরিচালিত। ফলে নেপালের এই গণঅভ্যুত্থানের পিছনে আসলে কোনো অভিসন্ধি আছে কিনা সেটাই এখন উঠে আসছে নানান পর্যবেক্ষণে। তা নাহলে মাত্র মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে এই গৃহযুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি হয় কি ?
একইভাবে নেপালে ২০০৮ সালে রাজতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসে মাওবাদী ও কমিউনিস্টরা। গঠিত হয় গণতান্ত্রিক-প্রজাতন্ত্র। যদিও রাজতন্ত্রের অবসানের পর নেপাল কোনো স্থায়ী সরকার পায়নি। একের পর এক ১০ জন প্রধানমন্ত্রী বদল হলেও নেপালে থিতু হতে পারেনি।
এবার জেগেছে জেন জি। কিন্তু এই গণঅভ্যুত্থান শুধুমাত্র স্বতঃস্ফূর্ত নাকি একটি বৃহত্তর ষড়যন্ত্রের বহিঃপ্রকাশ তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। অনেকেই মনে করছেন, এই অস্থিরতা হল দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলে সরকার পতনের নেপথ্যে এক গভীর ষড়যন্ত্র। এর আগে আমরা দেখেছি শ্রীলঙ্কায়, বাংলাদেশে, পাকিস্তানে, মায়ানমারে। কয়েক বছরের মধ্যে এই দেশগুলিতে সরকার ফেলার একটা খেলা শুরু হয়েছে যেন।
নেপালের তরুণ সমাজের একটি বিরাট অংশের দাবি রাজতন্ত্র ফিরিয়ে আনা ও হিন্দুরাষ্ট্র গঠনের। কারণ অনেকেরই ভিতর থেকে গণতন্ত্রের অন্তঃসারশূন্য ও স্বজনপোষণ, দুর্নীতির বাস্তবিক রূপ ইতিমধ্যে প্রকাশ পেয়েছে। আর এরই সুযোগ নিয়ে চলেছে বৈদেশিক শক্তি। পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা থেকে নেপাল পর্যন্ত এই অভ্যুত্থানের পিছনে কি কাজ করছে কোনো চরবাহিনী ? এই তত্ত্বটিও উঠে আসছে বারবার। নেপালে যার শুরুই হয়েছিল নেপো কিড প্রচারের মাধ্যমে। সাধারণ যুবসমাজ যেখানে দারিদ্র্যের সঙ্গে লাগাতার লড়াই করে চলেছে সেখানে কী ভাবে রাজনৈতিক নেতাদের ছেলেমেয়েরা রাজকীয় জীবন যাপন করে ! পরিসংখ্যান বলছে, গত এক বছরে প্রায় ৭,৪০,০০০ নেপালি কাজের খোঁজে অন্য দেশে পাড়ি দিয়েছে। তাই নেপাল পরিস্থিতির আড়ালে উঠে আসছে ‘কালার রিভলিউশন’। সভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাবার পর যা মার্কিন ষড়যন্ত্রের একটা কৌশল হিসেবে পরিচিত ছিল। কেউ বা এর পিছনে ‘টিকটক’ তত্ত্ব টেনে আনছেন। নেপাল সরকার সে দেশে সোশ্যাল মিডিয়া নিষিদ্ধ করতে গিয়ে শুধুমাত্র পশ্চিমী সোশ্যাল মিডিয়াগুলির উপর কোপ দিয়েছিল। কিন্তু খোলা ছিল চিনের টিকটক। ফলে এই আন্দোলন সত্যিকারের গণমুখী নাকি কোনো চালিকা শক্তি কাজ করছে এটাই এখন বিচার্য বিষয়।
