শীতের মরশুমে সদ্যজাত শিশুর যত্ন নেওয়া অভিভাবকদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। জন্মের পর প্রথম কয়েক সপ্তাহে শিশুর শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা পুরোপুরি তৈরি হয় না। ফলে অতিরিক্ত ঠান্ডা যেমন শিশুর জন্য অস্বস্তিকর হতে পারে, তেমনই অতিরিক্ত পোশাক, ঘাম বা বদ্ধ ঘরও নানা সমস্যার কারণ হতে পারে। তাই শীতকালে নবজাতকের যত্নে প্রয়োজন উষ্ণতা, পরিচ্ছন্নতা, পর্যাপ্ত পুষ্টি এবং নিয়মিত নজরদারির সমন্বয়।
ঘরের তাপমাত্রা আরামদায়ক রাখুন
শীতকালে শিশুকে এমন ঘরে রাখুন যেখানে সরাসরি ঠান্ডা বাতাস ঢোকে না। জানালা-দরজা প্রয়োজনমতো বন্ধ রাখা যেতে পারে, তবে ঘর একেবারে বদ্ধ করে রাখা উচিত নয়। দিনের বেলা আবহাওয়া অনুকূল থাকলে কিছুক্ষণ জানালা খুলে ঘরে বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা করা ভালো। শিশুর ঘুমের জায়গা হিটার বা ব্লোয়ারের একেবারে সামনে রাখা ঠিক নয়। অতিরিক্ত গরম বাতাস শিশুর ত্বক ও শ্বাসনালিতে শুষ্কতা তৈরি করতে পারে।
পোশাক পরানোর ক্ষেত্রে ভারসাম্য জরুরি
নবজাতককে শীত থেকে বাঁচাতে নরম, আরামদায়ক এবং স্তরযুক্ত পোশাক পরানো ভালো। মাথা, হাত ও পা প্রয়োজন অনুযায়ী ঢেকে রাখা যেতে পারে। তবে এত বেশি পোশাক পরাবেন না যাতে শিশু ঘেমে যায়। শিশুর ঘাড় বা বুকের অংশ স্পর্শ করে বোঝা যায় শরীর অতিরিক্ত গরম হয়ে যাচ্ছে কি না। হাত-পা কিছুটা ঠান্ডা থাকলেই যে শিশুর শরীর ঠান্ডায় কাবু হয়েছে, এমন নয়।
শিশুর পোশাক পরিষ্কার, শুকনো এবং নরম হওয়া জরুরি। উলের পোশাক সরাসরি শিশুর ত্বকের সংস্পর্শে না দিয়ে ভিতরে সুতির পোশাক পরানো ভালো।
বুকের দুধই প্রধান খাবার
শীতকালেও সদ্যজাত শিশুর জন্য মায়ের বুকের দুধই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খাবার। জন্মের পর প্রথম ছয় মাস সাধারণত শিশুকে মায়ের দুধ ছাড়া আলাদা করে জল, মধু বা অন্য কোনও পানীয় দেওয়ার প্রয়োজন হয় না, যদি না চিকিৎসক বিশেষ কোনও পরামর্শ দেন। শিশু যখন ক্ষুধার সংকেত দেয়, তখন তার চাহিদা অনুযায়ী বুকের দুধ খাওয়ানো উচিত।
শিশু পর্যাপ্ত দুধ পাচ্ছে কি না, প্রস্রাবের পরিমাণ, শিশুর সতেজতা এবং ওজন বৃদ্ধির মতো বিষয়গুলির দিকে নজর রাখা প্রয়োজন।
স্নানের সময় বিশেষ সতর্কতা
শীতকালে প্রতিদিন দীর্ঘ সময় ধরে শিশুকে স্নান করানোর প্রয়োজন নেই। স্নানের আগে ঘরটি আরামদায়ক উষ্ণ করে নিন এবং প্রয়োজনীয় সব জিনিস হাতের কাছে রাখুন, যাতে শিশুকে একা রেখে কিছু আনতে যেতে না হয়। খুব গরম জল ব্যবহার করবেন না। কুসুম গরম জলই উপযুক্ত। স্নানের পর নরম তোয়ালে দিয়ে আলতো করে শিশুর শরীর শুকিয়ে দ্রুত পোশাক পরিয়ে দিন।
শিশুর ত্বক শুষ্ক হয়ে গেলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী উপযুক্ত ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করা যেতে পারে। সুগন্ধিযুক্ত বা প্রাপ্তবয়স্কদের প্রসাধনী শিশুর ত্বকে ব্যবহার না করাই ভালো।
ঘুমের সময় নিরাপত্তা
শীতের রাতে শিশুকে উষ্ণ রাখতে ভারী কম্বল, বালিশ বা নরম খেলনা দিয়ে ঘিরে রাখা উচিত নয়। এগুলি শিশুর মুখ ঢেকে দিতে পারে এবং শ্বাসপ্রশ্বাসে সমস্যা তৈরি করতে পারে। শিশুকে চিৎ করে, শক্ত ও সমতল বিছানায় শোয়ানো নিরাপদ। একই বিছানায় অতিরিক্ত কম্বল বা অন্যান্য নরম জিনিস না রাখাই ভালো।
সংক্রমণ থেকে দূরে রাখুন
শীতকালে সর্দি-কাশি ও বিভিন্ন শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণ ছড়ানোর প্রবণতা বাড়তে পারে। তাই শিশুকে ধরার আগে প্রত্যেকের হাত সাবান দিয়ে পরিষ্কার করা জরুরি। সর্দি-কাশি বা জ্বর রয়েছে এমন ব্যক্তিকে শিশুর খুব কাছে না আসাই ভালো। বাইরে থেকে এসে সরাসরি শিশুকে কোলে নেওয়ার আগে হাত-মুখ পরিষ্কার করা উচিত।
নবজাতককে অপ্রয়োজনে ভিড়ের মধ্যে নিয়ে যাওয়া বা অনেক মানুষের কোলে দেওয়া এড়িয়ে চলুন। শিশুর ঘরেও ধূমপান একেবারেই করা উচিত নয়।
রোদ ও পর্যবেক্ষণ
শীতের মৃদু রোদ আরামদায়ক হলেও নবজাতককে সরাসরি তীব্র রোদে দীর্ঘক্ষণ রাখা উচিত নয়। ঘরের পরিবেশ আরামদায়ক থাকাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। শিশুর শরীরের তাপমাত্রা, খাওয়ার পরিমাণ, প্রস্রাব, ঘুম এবং স্বাভাবিক আচরণ নিয়মিত লক্ষ্য করুন।
শিশু যদি অস্বাভাবিকভাবে নিস্তেজ হয়ে যায়, দুধ খেতে না চায়, শ্বাস নিতে কষ্ট হয়, দ্রুত শ্বাস নেয়, শরীর অস্বাভাবিক ঠান্ডা বা গরম লাগে, ত্বক বা ঠোঁট নীলচে হয়ে যায় কিংবা জ্বর দেখা দেয়, তাহলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। নবজাতকের ক্ষেত্রে নিজের সিদ্ধান্তে ওষুধ দেওয়া উচিত নয়।