ওঙ্কার ডেস্ক: নিপা ভাইরাস নামটি শুনলেই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এই মারণ ভাইরাসের নামকরণের পেছনে রয়েছে একটি বাস্তব স্থান ও এক ভয়াবহ ইতিহাস। ১৯৯৮-৯৯ সালে মালয়েশিয়ায় প্রথমবার এই অজানা রোগের প্রাদুর্ভাব নজরে আসে। নেগেরি সেম্বিলান প্রদেশের কাম্পুং সুংগাই নিপা নামে একটি গ্রাম থেকেই প্রথম সংক্রমণের ঘটনা সামনে আসে। ওই গ্রামের একাধিক বাসিন্দা হঠাৎ করে জ্বর, মাথাব্যথা, শ্বাসকষ্ট ও স্নায়বিক সমস্যায় আক্রান্ত হন। চিকিৎসা ও গবেষণার সময় সেখানকার রোগীদের শরীর থেকেই প্রথম এই ভাইরাস শনাক্ত করা সম্ভব হয়। সেই কারণেই ভাইরাসটির নাম রাখা হয় ‘নিপা’।
তৎকালীন সময়ে বিষয়টি আরও উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে যখন দেখা যায়, আক্রান্তদের অনেকের ক্ষেত্রেই রোগটি এনসেফালাইটিসে রূপ নিচ্ছে এবং মৃত্যুহারও বেশ বেশি। তদন্তে জানা যায়, শূকর পালনের সঙ্গে যুক্ত বহু মানুষ এই সংক্রমণে আক্রান্ত হয়েছেন। পরে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত করেন, ফলখেকো বাদুড়ই এই ভাইরাসের প্রাকৃতিক বাহক। বাদুড়ের লালার মাধ্যমে দূষিত ফল বা খাবার থেকে ভাইরাস শূকরের শরীরে প্রবেশ করে এবং সেখান থেকে মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে।
নিপা ভাইরাস একটি জুনোটিক ভাইরাস, অর্থাৎ প্রাণী থেকে মানুষের শরীরে সংক্রমিত হতে পারে। শুধু তাই নয়, এই ভাইরাস মানুষের থেকে মানুষেও ছড়াতে সক্ষম, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল ও বিপজ্জনক করে তোলে। সংক্রমিত ব্যক্তির ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে এলে বা তাঁর শরীরের নিঃসৃত তরলের মাধ্যমে এই রোগ ছড়ানোর আশঙ্কা থাকে। চিকিৎসকদের মতে, এই ভাইরাসে মৃত্যুহার অত্যন্ত বেশি এবং এখনও পর্যন্ত এর কোনও নির্দিষ্ট প্রতিষেধক বা কার্যকর টিকা আবিষ্কৃত হয়নি।
পরবর্তী সময়ে মালয়েশিয়ার বাইরে বাংলাদেশ ও ভারতের বিভিন্ন রাজ্যেও নিপাহ সংক্রমণের ঘটনা ধরা পড়ে। বিশেষ করে কেরালা ও পশ্চিমবঙ্গে নিপা ভাইরাস নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে একাধিকবার। প্রতিবারই প্রশাসন ও স্বাস্থ্য দপ্তরকে কঠোর নজরদারি, আইসোলেশন ও সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিতে দেখা গেছে।
চিকিৎসাবিজ্ঞানে অনেক সময়ই যে স্থানে প্রথম কোনও রোগ বা ভাইরাস শনাক্ত হয়, তার নামেই সেই ভাইরাসের নামকরণ করা হয়। ইবোলা বা জিকার মতো উদাহরণ তার প্রমাণ। সেই ধারাবাহিকতায় মালয়েশিয়ার একটি ছোট্ট গ্রামের নাম আজ গোটা বিশ্বে পরিচিত হয়ে উঠেছে এক ভয়ঙ্কর ভাইরাসের পরিচয় হিসেবে। নিপা নামটি তাই শুধু একটি রোগ নয়, বরং সতর্কতার এক স্থায়ী স্মারক।
