ওঙ্কার ডেস্ক: মহারাষ্ট্রের সাম্প্রতিক হিন্দিভাষী শ্রমিক নিগ্রহ বিতর্ক চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল দেশের রাজনীতির ছকে বড় পরিবর্তন আসছে। এতদিন পর্যন্ত ‘ধর্ম’ ছিল ভোট-রাজনীতির প্রধান হাতিয়ার। হিন্দু-মুসলিম বিভাজন, মন্দির-মসজিদ বিতর্ক, রাম মন্দির থেকে লাভ জিহাদ সবকিছুতেই ঘুরেফিরে ধর্মের পরিচয় কেন্দ্র করেই। কিন্তু এখন সেই ছক বদলাচ্ছে। এখন অস্ত্র হচ্ছে ভাষা, সংস্কৃতি ও আঞ্চলিক পরিচয়।
ধর্ম নিয়ে রাজনীতির পর এবার ভাষা ও সাম্প্রদায়িক প্রথাকে কেন্দ্র করে হিংসা ছড়ানোর কাজ করে যাচ্ছে দেশের রাজনীতি দলগুলি। মহারাষ্ট্রে হিন্দিভাষী শ্রমিক ও ব্যবসায়ীদের উপর একের পর এক হামলার ঘটনায় উত্তাল মহারাষ্ট্র রাজনীতি। সরাসরি রাজ ঠাকরে ও উদ্ধব ঠাকরেকে কড়া ভাষায় আক্রমণ শানালেন বিজেপি সাংসদ নিশিকান্ত দুবে। গড্ডার এই বিজেপি সাংসদ সোমবার এক সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, “উত্তর ভারতের মানুষকে মারছো? যাও মহিম দরগায়, উর্দুভাষীদের মারার সাহস দেখাও!” দুবে আরও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, “উত্তরপ্রদেশ, বিহার বা তামিলনাড়ুতে আসুন, আপনাদের পিটিয়ে মারবে লোকজন!” তাঁর অভিযোগ, ঠাকরে ভাইরা হিন্দিভাষী মানুষের মধ্যে বিদ্বেষ ছড়াচ্ছেন শুধুমাত্র সস্তা রাজনীতির জন্য। আসন্ন নির্বাচনের আগে ধর্মভিত্তিক মেরুকরণের পরও যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, সেটা পূরণ করতে নতুন ‘ইস্যুর’ দরকার। আর সেটাই এখন হয়ে উঠছে হিন্দিভাষী বনাম মারাঠি, বাঙালি বনাম হিন্দিভাষী, দক্ষিণ বনাম উত্তর ভারতের লড়াই।
সম্প্রতি ভাইরাল হওয়া একাধিক ভিডিওতে দেখা গিয়েছে, মহারাষ্ট্রে মারাঠি ভাষা না জানায় হিন্দিভাষী শ্রমিক ও হকারদের হেনস্থা করছে এমএনএসের কর্মীরা। এর মধ্যেই রাজ্য সরকার তিন-ভাষা নীতি বাতিল করেছে, যা নিয়ে রাজ ও উদ্ধব ‘হিন্দি চাপিয়ে দেওয়া’ অভিযোগ তুলেছিলেন। এরই পাল্টা নিশিকান্ত দুবের মন্তব্য, “মহারাষ্ট্র কীসে চলে? বিহার, ঝাড়খণ্ড, ওড়িশার খনিজ সম্পদে, হিন্দি রাজ্যগুলির টাকাতেই টাটা-রিলায়্যান্সের মতো সংস্থা মহারাষ্ট্রে শিল্প গড়েছে। অথচ সেই মানুষগুলিই আজ মার খাচ্ছে”।
নিশিকান্ত দুবের এই হুঁশিয়ারি ও সরাসরি আক্রমনাত্মক ভাষা মেনে নিতে নারাজ বিজেপির শরিক শিবসেনার একনাথ শিন্ডে গোষ্ঠী। শিন্ডে গোষ্ঠীর নেতা যোগেশ কাদম স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, “একজন সাংসদের মুখে এমন অহংকারপূর্ণ ভাষা শোভা পায় না। মহারাষ্ট্রের মানুষ এসব মেনে নেবে না।” মহারাষ্ট্রে হিন্দি বনাম মারাঠি বিতর্ক নতুন করে ঘিরে ফেলছে রাজ্য-রাজনীতি।
যখন দেশের বেকারত্ব, মূল্যবৃদ্ধি, কৃষকস্বার্থ, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, নিরাপত্তা সবই বারবার রাজনৈতিক বিতর্ক থেকে হারিয়ে যাচ্ছে, তখন নির্বাচনের প্রাক্কালে মানুষের মনকে ব্যস্ত রাখতে ‘ভাষা’ আর ‘সংস্কৃতি’ এক কথায় সহজ হাতিয়ার। ধর্মের বিভাজন যেভাবে সমাজে বিষ ছড়িয়েছিল, ভাষাভিত্তিক বিদ্বেষ তার চেয়ে কম বিপজ্জনক নয় বরং আরও ভয়ঙ্কর।
