অর্ণব দত্ত
‘প্রহরে প্রহরে বাজছে ঘণ্টা/ ঘুম নেই মোর চোখে/ ২০ পয়সার ঘুম কিনে আনি/ ডিসপেনসারি থেকে।’ ছোট্ট এই ছড়ার কয়েকটি লাইন একজন অখ্যাত কবির লেখা। সাহিত্য জীবন দেখায়, এমনকি আগামীদিনে অনেক সময়ে কী ঘটতে চলেছে, সেও দেখার। আশির দশকে লিটল ম্যাগাজিনে প্রকাশিত এই লাইনগুলি ভারতবাসীর জীবনে আক্ষরিকভাবে সত্য এখন। ইন্ডিয়ান জার্নাল অব স্লিপ মেডিসিন সম্প্রতি যে পেপার প্রকাশ করেছে, তাতে দেখা যাচ্ছে, প্রতি তিনজন ভারতীয়র মধ্যে একজনের ঠিকঠাক ঘুমই হচ্ছে না। ঘুম হচ্ছে না যাঁদের, তাঁদের মধ্যে অধিকাংশই নামীদামী কর্পোরেট সংস্থার কর্মী। ইনসোমনিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার কারণ বাণিজ্যিক বিভিন্ন সংস্থা মাত্রাতিরিক্ত খাটাচ্ছে।
শুধু প্রাপ্তবয়স্ক নয়, রাতে ঘুম হচ্ছে না স্কুলকলেজে কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদেরও। কারণ পরীক্ষার চাপ। এর জেরে কাটছে বিনিদ্র রাত্রি। ডাক্তারবাবুরা জানাচ্ছেন, প্রাপ্তবয়স্কদের প্রতিদিন ৭ ঘন্টা থেকে ৮ ঘণ্টা ঘুমানো দরকার।
৭ ঘণ্টা থেকে ৮ ঘন্টা ঘুমোলে মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা, হজমশক্তি স্বাভাবিক থাকে। দিনের পর দিন ঘুম না হলে হৃদযন্ত্রঘটিত সমস্যা, পরিপাকজনিত সমস্যা, প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়, তাছাড়া মানসিক নানা সমস্যা বৃদ্ধি পাবে। যেমন, মানসিক হতাশা, উদ্বেগজনিত সমস্যা, স্মৃতিশক্তির দুর্বলতা, যে কোনও ক্রিয়ার পরিবর্তে প্রতিক্রিয়াজনিত সমস্যা-সহ নানা ধরনের শারীরিক এবং মানসিক সমস্যা দেখা দিতে পারে।
ডাক্তারবাবুদের মতে, এই সমস্যার মোকাবিলা করা যেতে পারে আচরণগত সমস্যা কাটাতে মানসিক অসুখের ওষুধ খাইয়ে, নিয়মিত খানিক পথ হাঁটাচলা করলে। এদিকে অনেকে অনিদ্রাজনিত সমস্যায় আক্রান্ত হয়ে দিনের অধিকাংশ সময় বিছানায় শুয়ে থাকেন। ডাক্তারবাবুদের মতে, দিনের বেশিরভাগ সময়ে বিছানায় শুয়ে না থেকে ঘুম এবং যৌনক্রিয়ার সময়টুকুই কেবল বিছানা ব্যবহার করুন।
শোওয়ার ঘর রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগে ঠাণ্ডা এবং অন্ধকার রাখুন। মোবাইল সুইচ অফ করে শুতে যান। আসলে অনিদ্রাজনিত রোগে মস্তিষ্কে অক্সিজেন সরবরাহ হ্রাস পায়। এভাবে ধীরে ধীরে অনিদ্রাজনিত রোগের শিকার রোগীরা কর্মক্ষমতা সম্পূর্ণভাবে হারান। সীতারাম ভারতিয়া ইন্সটিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড রিসার্চের অধ্যাপক জেসি সুরি বলেছেন, ‘জীবনযাপনের পদ্ধতির পরিবর্তন করলে ঘুমের সমস্যা দূর হবে। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে ভারতীয় নাগরিকরা মোবাইল ঘাঁটাঘাঁটি করছেন বিছানায় শুয়ে শুয়ে।
সাম্প্রতিক একটি সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে, বিছানায় যাওয়ার এক ঘণ্টা আগে ৯৭ শতাংশ ভারতীয় নাগরিক ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহার করেন। এর ফলে অধিকাংশ ভারতীয় নাগরিকের ঘুমের সমস্যা দেখা দিচ্ছে। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, ৬ ঘণ্টা থেকে ৮ ঘণ্টা ঘুম খুবই জরুরি ১৮ থেকে ৪৫ বছর বয়স্ক নারী-পুরুষের, ৫ ঘণ্টা থেকে ৭ ঘণ্টা ঘুম দরকার ৪৫ বছরের উপর থেকে ৭০ বছর বয়স্ক নারী-পুরুষের। আর ৭০ বছরের উপর নারী-পুরুষের ৫ ঘণ্টার উপর ঘুম প্রয়োজন।
অধিকাংশ ভারতীয় নাগরিক নারী-পুরুষ বয়সের অনুপাতে যে পরিমাণ ঘুমের দরকার সে পরিমাণ ঘুম না হওয়ায় শারীরবৃত্তীয় হরেক ধরনের সমস্যায় ভুগছেন। বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, হৃদরোগ, হাইপার টেনশন, স্ট্রোক, হতাশা-সহ নানা ধরনের অসুখ-বিসুখে ভুগছেন।
হিন্দুশাস্ত্র মতে, ভারতে অসংখ্য দেবীর মধ্যে অন্যতম এক দেবী নিদ্রাদেবী। নিদ্রাদেবী কেবল ঘুমের দেবীই নন, তিনি স্বপ্নেরও দেবী। দুঃস্বপ্ন নয়, সুস্বপ্নের দেবী। হিন্দুশাস্ত্র অনুসারে, নিদ্রাদেবী পার্বতীর অবতার। নিদ্রাদেবীর উল্লেখ রয়েছে বেদ এবং উপনিষদে।
বেদ, পুরান এবং উপনিষদে নিদ্রাদেবী পবিত্র অবস্থা হিসেবে বর্ণিত। বিশ্বের নানা দেশের পুরানে নিদ্রাদেবীর উল্লেখ রয়েছে। যেমন, গ্রিক, জাপানের পুরানেও নিদ্রাদেবীর দেবীর উল্লেখ রয়েছে। সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় দক্ষিণেশ্বরে পরমহংস শ্রী রামকৃষ্ণের সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন। ঠাকুর বঙ্কিমচন্দ্রকে প্রশ্ন করেছিলেন, জীবনের উদ্দেশ্য কী ? সাহিত্যসম্রাট হাসতে হাসতে বলেছিলেন, আহার, নিদ্রা এবং মৈথুন। সত্যিই, নিদ্রা জীবনে পর্যাপ্ত পরিমাণে দরকার। তবে এমনও অনেকে আছেন যাঁরা কেবল শুয়েই থাকেন এবং মোষের মতো ভোস ভোস করে ঘুমান। ঘুম আর তাঁদের ভাঙেই না। এঁরা কুম্ভকর্ণের শিষ্য নির্ঘাত ! ঢাকঢোলবাজিয়ে ঘুম ভাঙাতে হয়।
বর্তমানে ভারতের যা পরিস্থিতি, তাতে দিনের শেষে ঘুমের দেশে যেতে পারছেন না অসংখ্য ভারতীয় নাগরিক। শুধুই ঘুমিয়ে রাজপ্রাসাদে দিনের পর দিন কাটানো কুম্ভকর্ণও আজ আর নেই এদিকে। দিনকাল পাল্টে গেছে। ঘুম ভাঙলে উচিত হাতমুখ ধুয়ে প্রাতঃকৃত্যাদি সেরে কাজকর্ম সারা। কেননা কর্মই ধর্ম। তা সে ঘরের কাজই হোক অথবা বাহিরের জগতের।