মাহাবুব মোল্লা
দিল্লির রাজনীতির ইতিহাসে নতুন বাঁক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে রয়েছে ২০২৫ সালটি। কারণ দীর্ঘ ২৭ বছর পর রাজধানীতে ক্ষমতায় ফিরেছে পদ্ম শিবির। প্রথমবারের মতো ভোটে দাঁড়িয়েছিলেন রেখা গুপ্ত। সেই পদক্ষেপ তাঁকে নিরাশ করেনি। বরং জীবনের ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে তাঁকে। প্রথম বারের মতো জয়ী হয়ে তিনি দিল্লির মুখ্যমন্ত্রীর কুর্সিতে বসেছেন। ক্ষমতায় আসার প্রথম ১০ মাসে, রাজধানীর চতুর্থ মহিলা মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে আয়ুষ্মান স্বাস্থ্য বীমা যোজনা, আরোগ্য মন্দির, স্কুল ফি বৃদ্ধি রোধে আইন, নতুন ই-বাস, মহিলাদের জন্য বিনামূল্যে বাস ভ্রমণ এবং কম খরচে খাবারের জন্য অটল ক্যান্টিন-সহ একাধিক নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণের চেষ্টা করেছেন।
মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্ত যমুনা নদীতে ছট পুজো পালন করেছিলেন। যা পূর্বাঞ্চলীয় সম্প্রদায়কে মুগ্ধ করেছিল। কিন্তু যমুনার পুরনো সমস্যা, বায়ু দূষণ এবং জল জমার সমস্যা তাঁর প্রশাসনিক দক্ষতাকে পরীক্ষার মধ্যে ফেলেছিল। মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর রেখা গুপ্ত দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশেষ বাস চালু করেছেন। যা প্রায় পাঁচ বছর আগে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। এ ছাড়া মহিলাদের মাসিক ২,৫০০ টাকা আর্থিক অনুদানের যে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল তা ২০২৬ সালে ঠেলে দেওয়া হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। ২০২৬ সালে ৮ মার্চ আগামী আন্তর্জাতিক নারী দিবসের দিকে নজর থাকবে, কারণ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী নির্বাচনী প্রচারে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন রাজধানীর মহিলারা আইডব্লিউডিতে অনুদান পাবেন।
কিছু বিজেপি নেতার বিশ্বাস, যদি মার্চ মাসে দিল্লির মহিলাদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে মহিলা সমৃদ্ধি যোজনার (MSY) টাকা পৌঁছাতে শুরু করে, তাহলে এপ্রিল-মে মাসে পাঞ্জাব বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির নির্বাচনী জয়ের সম্ভাবনা আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে। উল্লেখ্য, পাঞ্জাবে ক্ষমতায় রয়েছে আম আদমি পার্টি। সেখানে মহিলাদের ১,০০০ টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে হিমশিম খাচ্ছে আপ সরকার। এমন পরিস্থিতিতে, বিজেপি মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্তের শাসনে দিল্লিতে মহিলাদের ভাতা দেওয়ার ক্ষেত্রে সফল হলে তা অন্য রাজ্যে দলকে ভরসাযোগ্য করে তুলবে। দিল্লি সরকার ২০২৫-২৬ বাজেটে মহিলা সমৃদ্ধি যোজনার জন্য ৫,১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে। এই প্রতিশ্রুতি ছাড়াও, মহিলাদের সুরক্ষার জন্য ৫০,০০০ সিসিটিভি ক্যামেরা বসানো এবং গর্ভবতী মহিলাদের জন্য ২১,০০০ টাকা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। রেখা গুপ্ত সরকার যমুনা সংস্কারের উদ্যোগ নিলেও, শীতকালে বেশ কয়েকদিন ধরে রাজধানী শহরের বাতাসের মান খুব খারাপ অবস্থায় পৌঁছেছে। বায়ু দূষণের মোকাবিলা করতে সরকার ব্যর্থ হয়েছে। আইআইটি-কানপুরের বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় কৃত্রিম বৃষ্টিপাত ঘটানোর চেষ্টা করলেও তা কাজে আসেনি
এক গুচ্ছ প্রশাসনিক সংস্কার করেছেন রেখা গুপ্ত। শপথ নেওয়ার পর দিল্লি সরকারের নদীর তীরবর্তী সচিবালয় – প্লেয়ার্স বিল্ডিং – এ সাপ্তাহিক মন্ত্রিসভার বৈঠক শুরু করেছেন। রাজধানী শহরের নতুন মুখ্য সচিব করা হয়েছে রাজীব ভার্মাকে এবং সতীশ গোলচা নামে একজনকে নতুন পুলিশ কমিশনার করা হয়েছে। প্রশাসনিক কাজ যাতে আরও মসৃণ ভাবে হয়, সেই লক্ষ্যে মুখ্যমন্ত্রী দিল্লির ১১টি জেলাকে ১৩টি নতুন প্রশাসনিক ইউনিটে ভাগ করেছেন তিনি। দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী আরও ঘোষণা করেছেন, দিল্লি সরকার ১৩টি জেলায় আধুনিক, বহু-বিভাগীয় ‘মিনি সচিবালয়’ প্রতিষ্ঠা করবে। যেখানে শহরবাসী একটি নির্দিষ্ট জায়গা থেকে রাজস্ব-সহ একাধিক বিষয়ে পরিষেবা পাবেন।
১৯৮৪ সালে শিখ-বিরোধী দাঙ্গায় বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিদের এবং তাঁদের পরিবারের সদস্যদের সরকারি চাকরির নিয়োগপত্র দিয়েছেন রেখা গুপ্ত। দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে ভুক্তভোগী এবং তাঁদের আত্মীয়স্বজনরা যে যন্ত্রণার মধ্যে রয়েছেন তার কিছুটা লাঘবের চেষ্টা এই পদক্ষেপ। ফেব্রুয়ারিতে বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি যে সাফল্য পেয়েছিল এমসিডি উপনির্বাচনে তার প্রতিফলন দেখা গিয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্তর জনপ্রিয়তার কারণে দলটি ১২টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৭টিতে জয়লাভ করেছে। শালিমার বাগ বিধানসভা আসন থেকে প্রার্থী হওয়ার আগে তিনি রেখা নিজেও এমসিডি কাউন্সিলর ছিলেন।
তবে গত এক দশকের মধ্যে দিল্লিতে সবচেয়ে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলাও হয়েছে রেখা গুপ্তের শাসনকালে। গত ১০ নভেম্বর লাল কেল্লার কাছে গাড়িতে বোমা বিস্ফোরণ হয়েছিল, যাতে ১১ জনের মৃত্যু হয়। ২০১১ সালে দিল্লি হাইকোর্টের কাছে বিস্ফোরণের পর রাজধানীতে এটি ছিল প্রথম উল্লেখযোগ্য সন্ত্রাসী হামলা।
