আইসোলেশন
অনিন্দিতা সেন
প্রিয়তম,
এতক্ষনে নিশ্চয় চলে গ্যাছো অনেক দূরে। এই মৃত্যু পুরী ছেড়ে, এই আকাশ, খামার, শহর, রাস্তা, সব স…ব কিছু ছেড়ে, তাই না ! আসলে ভয় পেয়েছ তুমি, ভীষণ এক ভয় ! নিজেকে হারিয়ে ফেলার বিভীষিকা…পৃথিবীর মাটি ছাড়া হ’বার ভয়। প্রাণের মায়া যে বড় মায়া, সেটা আরও একবার বুঝিয়ে দিয়ে গেল সময় ! সত্যিই আমার দেশ এখন মৃত্যুপুরী। শবের মিছিলে ঘেরা রাজপথ। নেই কবর খোঁড়ার মত উপযুক্ত স্থানের সংকুলান। তাই বেশিরভাগ দেহই তুলে নিয়ে যাচ্ছে সেনাবাহিনীর ট্রাক, গণকবরের দিকে। এই নিয়তি কি পাওনা ছিল অত্যাধুনিক প্রযুক্তিময় বিশাল এই ইউরোপীয় দেশটির ? যাকে আদর করে বলা হয় সিটি অফ সেভেন হিলস ! এই তো দিন দশেক আগেও আমার-তোমার পৃথিবী ছিল শান্ত। আমাদের ছোট্ট লিভ-ইন অ্যাপার্টমেন্টে বয়ে আসত ভরপুর অক্সিজেন। জানালার কাঁচ দিয়ে দেখতে পেতাম গেরুয়া-ধুসরে মেশা ঘন নীল আকাশ আর পালতোলা মেঘের দল। শীত শেষ হয়ে এসেছিল প্রায়। বসন্তের সমাগমে উত্তর ইটালির লম্বার্ডো লেকের পাশ ঘিরে চিরসবুজ কর্ক ওক, ডাসকান সাইপ্রাস আর চেরি লরেলের সবুজ ছোঁয়ায় প্রাণের সমাগম। একটু দূরে পাহাড় ঘিরে পর্নমোচী লার্চ আর স্প্রুসের সারি।
দূরে শহরতলীতে অলিভ, আঙুর আর ব্রকোলির ফলনের সময়। তোমাকে কথা দিয়েছিলাম প্রিয়, এই বসন্তে নিয়ে যাব আমাদের খামার বাড়িতে। আমার মা-বাবা, আমার ভাই, গম আর লেটুসের ক্ষেত আর দোতলা কুটির ঘিরে সবুজ দ্রাক্ষালতার বুনুনি। সন্ধেবেলায় বাবা-মার গাড়ি খামার থেকে ফিরলেই লম্বার্ডির বিখ্যাত কেম্পারি বিটার অথবা বারবেরি ওয়াইন এর গ্লাস আর পিয়োনোতে ঝড় তোলা আমার বয়:সন্ধিকাল এর কৌতুহলী উৎসুক ভাই…! প্রাকৃতিক প্রাচুর্য্যে সিক্ত আমার ছোট্ট গ্রাম, ‘কাস্টেলারো লেগুসেলো’। একটি সুন্দর, মধ্যযুগীয় প্রাচীরঘেরা গ্রাম। মানতুয়া প্রদেশে একটি হৃদয়-আকৃতির হ্রদের দিকে মুখ করে থাকা পাহাড়ের উপরে অবস্থিত এই গ্রামটি যেন দ্বাদশ শতাব্দীর প্রাচীর, নুড়ি পাথরের রাস্তা এবং পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত এক আকর্ষণীয় দুর্গসহ নিখুঁতভাবে সংরক্ষিত, যে সমস্ত কিছু ঘুরে ঘুরে দেখানোর কথা ছিল তোমায়। আমি হতাম তোমার ট্যুর গাইড, কি বলো মাই লাভ!
মনে পড়ে প্রিয়, প্রফেসর ডক্টর জিওভ্যানির বায়োকেমিস্ট্রির ল্যাবে বসে আমাদের দিনরাতের খুনসুটি ! ইউনিভারসিটি অফ মিলানো, পোস্ট ডক্টরাল ফেলোশিপে সেই সুদূর প্রাচ্য থেকে আগত সুপুরুষ শ্যামবর্ণ প্রফেসরকে দেখেই প্রেমে পড়ে যাই আমি। শান্ত, সমাহিত…রোমান্টিসিজম…ঘন কালো গভীর চোখের আকুলতা মুহুর্তে আপন করে নিল অ্যাড্রিয়াটিক সমুদ্রপারের শ্বেতাঙ্গিনী নীলাঞ্জনা কে। হ্যাঁ, আমি অ্যাড্রিয়ানা রোম্যানো, স্বীকার করছি অকপটে, প্রথম দেখাতেই প্রেমে পড়েছি তোমার। তুমি আমায় একটু একটু করে বাংলা শেখালে, পড়ে শোনালে রবীন্দ্রনাথ…শেষের কবিতায় অমিত ও লাবণ্যের প্রেমের রসায়ন। কতটা বুঝেছি জানিনা, তবে তোমার প্রতি শ্রদ্ধা গিয়েছিল অসম্ভব বেড়ে। দেশে তুমি জানিয়েছিলে আমার কথা, আমরা দুজনে স্বামী-স্ত্রীই ছিলাম বলো !
আজ, হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে শুয়ে, তোমার জন্য অপেক্ষা করতে করতে যখন ক্লান্ত হয়ে পড়লাম, দেখলাম আমার বেডের পাশে সযত্নে রাখা অলিয়েন্ডারের গোছা শুকিয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। ঠিক যেন, আমার জীবনের প্রদীপখানি! নিভে যাচ্ছে একটু একটু করে রোজ…আমার চেখের সামনের আলো…ডাকছে শহরতলীর খামার বাড়ি, আমার উৎস, মা-বাবা আর ছোট্ট ভাই ! জানিনা কারো সাথে কোনোদিনো আর দেখা হবে কিনা !
ফুটবল পাগল আমার শহর বার্গামো, আজ মৃত্যুপুরী। উজাড় হয়ে গেল মহল্লার পর মহল্লা, মাত্র একটি মাসের ব্যবধানে। অথচ কী প্রাণবন্ত ছিল এ শহর, মিলানের সান-সিরো স্টেডিয়ামে ভেসে আসছে শুধু এনকোর… এনকোর চিৎকার। প্রায় চল্লিশ হাজার দর্শকে ঠাসা স্টেডিয়াম। আটলান্টা -ভ্যালেন্সিয়ার বর্ষ সেরা লীগ ম্যাচ। ইটালি ভার্সেস স্পেন। ম্যাচের শেষে দেশের মাটিতে আটলান্টার জয়ে কী উল্লাস, উৎফুল্ল জনতা একে অপরকে জড়িয়ে ধরছিল, হাতে হাত মিলিয়ে… ঠিক যেন এক উৎসব। অনেকটা তোমার শহরের ইস্টবেঙ্গল আর মোহনবাগানের কিংবা মহমেডান স্পোর্টিং এর সেই বিখ্যাত ক্যালকাটা লীগ ম্যাচের কথা মনে পড়িয়ে দেয়…তাই না ! সবই প্রায় তোমার কাছেই শোনা, আমার আর দেখা হল কই ! কলকাতাকে জানা হল কই !
আমার সেই প্রাণোচ্ছল শহর বার্গামো উৎসবের মেজাজে অজান্তে ছড়িয়ে দিল এক মানবশত্রু…অচিরেই ছড়িয়ে গেল নীরবে…নিঃশব্দে…গোটা বিশ্বে। ভুলে গেলাম আমার উচ্চশিক্ষা, ভুলে গেলাম ছায়া ছায়া ঢাকা মোরাম বিছোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের পথটুকু, ভুলে গেলাম আমার ল্যাব, আমার নোটস…ল্যাপটপ… পিয়োনো আর… আর…লম্বার্ডি লেকের পাশধরে পাশাপাশি হাতে হাত…চোখে চোখ…নিমেষ হারানো চাহনি!
স্মৃতি থেকে যায় স্মৃতির পারে, নদীর ঢেউয়ে জল বয়ে যায়, শুধু বয়ে যায়… বুকে নিয়ে অলিভের পাতা…, অ্যাড্রিয়াটিক সাগর বয়ে চলে আগের মতই, অথচ সুনামি শুধুই মানব সমুদ্রে। কুর্নিশ তোমাকে জীবন।
না না না, আমি কিছু মনে করিনি, প্রতারণা তুমি আমায় করোনি প্রিয় ! প্রতারণা করেছে জীবন…আমার ভাগ্য।
মিলানো এয়ারপোর্ট থেকে তুমি নিলে ল…ম্বা উড়ান….নিজের দেশের পথে, আপনজনের কাছে। আমিও চলেছি সেই একই ল…ম্বা উড়ানে…শুধু আমাদের গন্তব্য আলাদা। আফসোস, কেন…কেন যে দেখা হয়েছিল প্রিয় ?
প্রিয়তম শব্দটি ছড়িয়ে যায় বুকের গভীরে, শিকড় ছড়িয়ে দেয়…খুব ঘুম পাচ্ছে এখন…অক্সিজেন… ঘুম… ঘুম… আ…হ্ !