অন্য ভুবন
কল্লোল চক্রবর্তী
ভুবন বাবু
ভুবন বাবুর সঙ্গে আমার দেখা শ্মশানে। জলুদা যেদিন মারা গেল। আমাদের ক্লাব সেক্রেটারি। দাপের মানুষ। বি.এ ফেল। পয়সাওলা ঘরের ছেলে। যাক, জলুদা বৃত্তান্ত’র কথা নয়। কথা হল ভুবন বাবু। কিন্তু, জলুদা ফেলনা নয়। আমাদের ঐ যে মহাবলী সঙ্ঘ, পঁচাত্তর বছরের পুরোনো। বন্যা, মহামারি, আকাল, দুর্ভিক্ষ, সবেতেই আমাদের অতীত ইতিহাস, উজ্জ্বল, ও, জলুদা, সমার্থক। টানা তিরিশ বছরের সেক্রেটারি। পাক্কা কংগ্রেসি, আর খাঁটি মোহনবাগান সাপোর্টার। জলুদার স্বাস্থ্যও বেশ তাগড়াই। অবশ্য, এই জাস্ট ষাট। ওর জন্ম আবার দোসরা অক্টোবর। জাতির জনকের জন্মদিন। জলুদা তাই, পনেরই আগস্ট, ছাব্বিশে জানুয়ারি নিজেই পতাকা তোলে। এ নিয়ে আমাদের ওয়ার্ডের কাউন্সিলর, আর এলাকার এম.এল.এ’র কম রাগ-টাগ হয়নি। জলুদা, জলুদাই। ওর কথা খানিক বলতে হবে বৈকি। এমন তো নয়। আজকাল যেমন আকছার হয়। ফ্ল্যাট বাড়ির নীচে কাচের গাড়ি। চার পাঁচটা লোক। মোবাইল ফোনে তারা কীসব বলছে। দুটো বড়ো গাড়ি, ন-দশ জন লোক ধরে। ও দুটোয় কিছু লোক উঠল। কাচের গাড়িটা, ধুপের ধোঁয়া আর রজনীগন্ধা’র স্টিকের গন্ধ বাতাসে বিলিয়ে উড়ে গেল। কে ভাই? ঐ যে ফ্ল্যাটে থাকতেন। কাঁচা পাকা চুল। কেডা? সবাই তো হয় কলপ, নয় কাঁচাপাকা। কাকেই বা চিনি। আমরা আমাদের নিয়ে। আর, এ ক্লাবে, জলুদা বলত, ‘পেডিগ্রি দেখে ক্লাব মেম্বার করবি। এটা এলি-তেলি-ভুজিয়াওলাদের ক্লাব নয়।’
একবার ঠিক হয়েছিল, মানে, উত্থাপিত হয়েছিল, দুর্গাপুজো করলে কেমন হয়।
জলুদা তখন কেরেলিয়ান লুঙ্গি, সিল্কের পাঞ্জাবিতে, আর তার কেঁদো আঙুলগুলোয় পাথর বসানো আংটির মহোৎসব, তাদের রঙের জেল্লায়, আমাদের ছোট্ট নার্সারির সামনে বেতের চেয়ারে। ব্যস। যায় কোথায়? বলে উঠেছিল, ‘কে বলছিস? অ্যাঁ! কে বলছিস? মোহনবাগান দুর্গাপুজো করে? খেলবে ধুলবে, শিল্ড আনবে, তা-না পুজো। পুজো মানে তো মদ গেলা।’
জলুদা শেষ কথা। কিন্তু, সেই জলুদা, মহাবলী সঙ্ঘের সাম্রাজ্যের মহান সম্রাট, তার জীবন অস্তমিত হল জাস্ট দু মিনিটে।
জলুদা বিয়ে থা করেনি। সকালে ক’টা ডন মেরে নিজের বাড়ির খোলা বারান্দায় চেয়ারে সবে বসেছে। দরদর করে ঘাম। মায়ের মতো বড়ো বউদি চা আনছিল। আঁতকে বলে উঠল, ‘ও জলু। ও কী। অমা, অত ঘামছ!’
জলুদা বলল, ‘যাচ্ছি।’
ব্যস। সব শেষ।
সে এক শোকযাত্রা বটে। ম্যাটাডরে জলুদার শায়িত শরীর। ফুলে ফুলে ঢাকা। আমাদের ক্লাব মেম্বাররা তো সবাই, আর আশপাশের ক্লাব, যারা রক্ষেকালী থেকে দুর্গাপুজো সবই করে। সরকারি অনুদান টান পায়, তারাও সবাই। আর, এই প্রথম কাউন্সিলর আর এম.এল.এ পর্যন্ত। আমরা ভেবেছিলাম ক্লাব ব্যান্ড বার করব কিনা। পনেরই আগস্ট, তেইশে জানুয়ারি, ছাব্বিশে জানুয়ারির প্রভাত ফে রি জলুদার। ঐ ক্যাপটেন। ঐ সব। অন্য ক্লাবগুলোতো এসব করেনা। আসলে, জলুদার মধ্যে একটা সাবেকি ঘরানা কাজ করত। তার বাইরে বের হবেনা। ক্লাবটাও তাই এখন ঐতিহ্যের আঁটি চুষে ছিবড়ে। পে-ডিগ্রিওলা নতুন মেম্বার পাওয়াই যায়না। তবু, জলুদা, জলুদাই, প্রায় শ পাঁচেক লোক নিয়ে তার মহাযাত্রা শুরু হয়েছিল। কিন্তু, শ্মশানে, জলুদা আট নম্বরে। আর, ভুবনবাবুর স্ত্রী সাত নম্বরে।
নেড়া, আমাদের ক্লাব মেম্বার, বেশ ম্যানেজ মাস্টার। কতবার আমাদের যোগাসন প্রতিযোগিতার স্যুভেনিরে কত বিজ্ঞাপন এনেছে। ও গেল, যদি জলুদা, হাই-প্রোফাইল, ভি.আই.পি, বলে, কিছু করা যায়। না কাউন্সিলর, না এম.এল.এ, দুজনের কেউই শ্মশান পর্যন্ত আসেনি। দলবল নিয়ে এসে মালা-টালা দিয়ে খালাস। তার পর টিকিটি দেখা যায়নি। শ্মশান পর্যন্ত আসতে আসতে শোকযাত্রার বহর আমাদের পাড়ার ফেনুদির বিনুনির মতো হয়ে গেল।
ফেনুদি আমাদের সবার দিদি। মায়েরা, মাসিরা পর্যন্ত ‘অ ফেনু,’ এভাবে বলতনা। বাচ্চা থেকে বুড়ো সবার ফেনুদি। তার কারণ, ফেনুদির চলাফেরায় পরম আভিজাত্য ছিল। আর ছিল ফেনুদির চুল। একমাথা। খোলা থাকলে যে কতদূর নামত! বিনুনি কী, অ, দারুণ! মেয়েরা বলত, ‘অ ফেনুদি, মাথায় কী মাখো গো? আমরা কত কী করছি। কেশুত্তে পাতা, পেঁয়াজবাটা, ডিম, তবু, মুঠো মুঠো চুল ওঠা বন্ধ হচ্ছেনা। এরপর তো টাক পড়ে যাবে।’ ফেনুদির কাছে কোনো জবাব থাকতনা। শোনা যায় চুলটা তার মাতৃদত্ত। যদিও ফেনুদির আড়াই বছর বয়সে তাঁর মা দেহ রাখেন। আমরা তখন কোথায়? অবশ্য জলুদার একটু একটু মনে আছে। জলুদা বলত, ‘ফেনুদি, না পেয়েছে মায়ের গায়ের রঙ, না মুখশ্রী। পেয়েছে শুধু চুল।’
কালের কু-প্রভাবে, আর লোকে বলে, পরিবেশ দূষণের কারণে, একদিন সেই ফেনুদির বিখ্যাত বিনুনি টিকটিকির লেজ হয়ে গেল।
পরিবেশ দূষণতো হয়েইছে। এক ইঞ্চি ফাঁকা জমি বোধহয় আর থাকবেনা। সব আবাসন। অথচ আমরা কত গাছ দেখেছি। আম। জাম। জারুল। বট। অশ্বথ। বকুল। অবশ্য, পাড়ায় একটাই বকুলগাছ ছিল। বড়ো রাস্তা থেকে ঢুকে দু তিনটে প্লটের পর। ফাঁকা মাঠ। তার ওপর। ওখানে এখন তিনতলা একটা বাড়ি। ঝকঝকে। চকমিলানো। যদিও, বাড়ির মালকিন, ব্যাদড়ামুখি। একটা মোটা-সোটা, চটকানো মুখ, বউ। লোকটাও কেমন গোবরগণেশ। গোবরগণেশ।
নেড়া অনেক চেষ্টা করেও কিছু হিল্লে করতে পারলনা। আমরা যে যার গঙ্গার ধারে বাঁধানো জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে পড়লাম। বেশ রাত। ওপারে কলকাতা শহরের বাড়িগুলো, বিদ্যাসাগর সেতুর আলো, আর তার ওপরে চলমান গাড়ি-ঘোড়া, এসবের দিকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে খানিকক্ষণ তাকিয়ে রইলাম। মনে হচ্ছিল, জলুদা আর এসব দেখবেনা। আমাদের নিয়ে সেই রামকেষ্টপুরের ফেরি সার্ভিস ধরে সবুজ-মেরুন ফেট্টি বেঁধে মোহনবাগান মাঠ। কিন্তু, ড্র হলেই জলুদার মুখ ভার হয়ে যেত। আর হারলে, জলুদার বাচ্চাদের মতো হাউহাউ করে কান্না। তখন তাকে সামলানো দায়।
এইসব নানান কথার ভিড়ে থাকতে লক্ষ পড়েনি, ভুবনবাবু একটা বেঞ্চে। মাথা ঝুঁকিয়ে বসা। চারপাশে তার বন্ধুবান্ধব, বা, আত্মীয়স্বজনের দল। দেখে মনে হয় অভিজাত পরিবার। খুঁটিয়ে দেখলে, ভুবনবাবু প্রায় পাঁচ দশ-ফশ মতন। সুন্দর স্বাস্থ্য। পেটের কাছে হালকা ভুঁড়ি। চোখা নাক। সিগারেট বিড়ি-টিড়ি খায়না। পুরু ঠোঁট। গোলাপি। গায়ের রঙ থিন-এরারুট বিস্কুটের মতন।
যেটা আশ্চর্যের, ভুবনবাবুর পেছনে দুটো খাঁকি। লাঠি হাতে বিদ্যমান। এরা কেন, ভদ্রলোক কি মন্ত্রী-টন্ত্রি, না অন্য কোনো অর্থে ভি.আই.পি?
ভুবনবাবুর থেকে প্রায় হাত দশেক দূরে বসেছিলাম। পোনা আর বাবলু, আমাদের ক্লাবের দুই সদস্য, কেতলি করে চা আর ঠোঙায় ভরা বিস্কুট আনল। আমাদের ভাঁড়ে চা ঢালতে ঢালতে, আড়চোখে, ভুবনবাবুর দিকে তাকিয়ে পোনা বলল, ‘মালটাকে দেখছিস?’
আমাদের গদার হেঁড়ে গলা। কথা বললেই মাইক মাইক মনে হয়, ‘কে বলত? মালটা? লিডার?’
পোনা ফিশফিশ করে বলল, ‘ধুস! বাইরে কালো পুলিস ভ্যান দাঁড়িয়ে রয়েছে। বউটাকে লোকটা মার্ডার করেছে।’
আমার শিরদাঁড়া বেয়ে ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল। ঐরকম একটা লোক, যদি গালে হালকা শাহজাহানি দাড়ি রাখত, আদ্দির পাঞ্জাবি পরে সেই এক আগেকার জমানার বিশাল বাড়ির দুম্বো এক ঘরে, তার আঙুলের ছোঁয়ায় বেজে উঠত পিয়ানো, তাইতো মানানসই। কিন্তু, এসব কী গল্প বলছে? লোকটার চোখেমুখে সেই খুনির নৃশংস ছায়াতো দেখতে পাচ্ছিনা। অবশ্য, সিনেমা-টিনেমা ছাড়া খুনি কীরকম হয় দেখিনি। এরকম শান্ত সমাহিত ভাব। অথচ, লোকটা নিজের বউকে মার্ডার করেছে।
মজা হল, ঐ খুন নিয়ে, লোকটাকে নিয়ে যত চর্চা চলতে লাগল, কোনো কিছু আমার কানে আসছিলনা। মনে মনে, আমি লোকটার বাড়ি, ওর আত্মীয়জন, লোকটা, এসব নিয়ে ভাবছিলাম। বলা হয়নি, মহাবলী সঙ্ঘের আজীবন সদস্য হলেও, আমি কখনও লোহা চাগাইনি। একটু-আধটু বরং লেখালেখি করি। তেমন কিছু না। খুব ভালো লাগে, যদি আমার আন্দাজের সঙ্গে বাস্তবের মিল থাকে। তবে, এটা ঠিক, ভুবনবাবু নিশ্চয়ই ঝুপড়ি-জাত নয়। এমন কি আমরা যারা বাপ-ঠাকুর্দার করা একচিলতে বাড়ি, ভাগে, ভাগে, ছয়লাপ, বলতে গেলে একপ্রকার বস্তিই। তাদের দলেও নয়। ভুবনবাবুরা কোনো এক শ্রেণির, যাদের আমরা সচরাচর দেখতে পাইনা। ওদের বাড়ি-ঘর-আসবাব-জীবনযাপন, যার সঙ্গে আমাদের হয়তো কোনোদিনই মিলবেনা। অবশ্য, এসব আমার এই তাৎক্ষণিক মুহূর্তের ভাবনা। বাস্তবের সঙ্গে তার মিল ভাঙতে কতক্ষণ, যদিও যা ভেবেছি, তার থেকে বেরোতে চাইছিনা।
রাত্তির একটা। দূরে কোথায় কোনো কারখানার একঘেয়ে শব্দ। ভুবনবাবু, তার আত্মীয়স্বজন, ও বন্ধুবান্ধব, সবাই ব্যস্ত হয়ে উঠল। নেড়া এসে খবর দিল, এর পরের পরেরটায় জলুদা।
একজন জিজ্ঞেস করল, ‘ওটা কি এখনও চলছে ?’
নেড়া বলল, ‘ক’মিনিট আছে। চল। সব রেডি হ।’
‘আরে, এখনই রেডি কেন?’
‘একটা পুরুত ম্যানেজ করেছি। সস্তায় কাজ করবে।’
‘অমল সব করবে, না? জলুদার দাদা’র…’
গঙ্গার দিকে তাকালাম। বোধহয় জোয়ারের জল ঢুকছে। মাথার ওপর কর্নার করে এক ফালি চাঁদ। তারাগুলো চুপচাপ। আমাদের ফিজিক্স এর স্যর বলতেন, ‘ওদের ভেতর কত বড়ো বড়ো বিস্ফোরণ হয়ে চলেছে।’ সে কথা মনে পড়তে, পুলিশ প্রহরায় চলা, মাথা নীচু, কাঁধ ঝোঁকানো ভুবনবাবুকে দেখলাম। নিস্পন্দ। নিশ্চুপ। ভেতরে মহাজাগতিক বিস্ফোরণ নিশ্চয়ই। নিজের বউকে এই বয়সে খুন ? কেন ? এখন কি অনুতাপদগ্ধ মন ? মনে হচ্ছিল, ছুটে কাছে যাই। জিজ্ঞেস করি, ‘বুকের ভেতর যেসব শব্দ , তার কিছু বলুন। বুকটা ফাঁকা করে দিন। হা হা মাঠ।’ তখন আবার মনে পড়ল, আমরা, আমাদের মহাবলী ক্লাব, একটা মামলায় হেরে গেছি। ঐ হাহা মাঠ, যেখানে ফুটবল, ক্রিকেট, দৌড় , সব হোতো। এবার ছাড়তে হবে। জলুদার চলে যাওয়ার ট্র্যাজেডির সঙ্গে সঙ্গে। যাঁরা ক্লাব করেননি, অফিস ব্যবসা ফেরত, বাড়ির ভেতর সেই যে সেঁধোলেন, পরদিন বাজার না যাওয়া পর্যন্ত, এরপর সূয্যিমামার সঙ্গে প্রথম চোখাচুখি। এর মধ্যে না আছে কারও সঙ্গে কথা। কারও সঙ্গে মেশা। বন্ধুবান্ধব তৈরিতে আগ্রহ। কিছুই নেই। শুধু বউটি, বাচ্চাটি, নিজের আবাসনের মাপা স্কোয়্যার-ফিটটি, ব্যস। আর টিভির সিরিয়াল, খবর, পারলে ঢিসুম-ঢিসুম ক্রিকেট। এই আপনারা, একটা মাঠ চলে যাবার দুঃখটা বুঝতে পারবেন না। অবশ্য, মামলাটা প্রায় চল্লিশ বছর চলার পর আমরা হারলাম। জলুদা তৈরি হচ্ছিল। বলেছিল, ‘দরকারে সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত যাব।’ কোথায় কী। জলুদা আগুনের বিছানায় শুতে চলেছে। আর কিছু বাদে ছাই। সারাজীবন না করল সংসার। না রেখেছে নিজের জন্যে কিছু। শুধু ক্লাব আর ক্লাব। মহাবলী সঙ্ঘ। কম্যুনিস্ট পার্টিতেও কখনও দুষ্টু লোক ঢুকে পড়তে পারে। কিন্তু, মহাবলী সঙ্ঘয়। বাবা! ওখানে অনেক ঝাড়াই বাছাই। তবে গত পঁচিশ বছরে একটাও বাড়তি মুখ আসেনি। ঝরতি অনেক। কতজন চলে গেল। মানে বাচ্চাদের ভাষায় স্টার হয়ে গেল। মাঠটাও যাবে। ওদিকে অন্য ক্লাবগুলো, কী না করছে। মাঝে মাঝে দীর্ঘশ্বাস পড়লে, জলুদা বলত, ‘অ্যাই ফটিক। কী ভাবছিস রে? মুখটা অমন ফাটা দইয়ের মতো কেন রে?’
‘ও কিছুনা।’
‘ভাবছিস?’
‘কবে থেকে ক্লাব করছি জানিস, হাফ-প্যান্ট পরা বয়েস থেকে। সেই যে চিনুদা মশালটি ধরিয়ে দিয়ে গেল, তার থেকে আর পরিত্রাণ পাচ্ছি কই।’
জলুদা বরাবরের মতো পরিত্রাণ পাবে। ভুবনবাবুর বউ সেই আগুনের ভেতর ঢুকে যাওয়ার পর। এখন জলুদাকে নিয়ে সৎকারের যেসব নিয়মবিধি আছে, চলতে থাকল। ওদিকে ভুবনবাবুকে পুলিশ কালো ভ্যানে তুলে নিয়ে গেল। জলুদাকে দেখছিলাম। সারাজীবন একটা লোক সর্বস্ব দান করে আজ কেমন রাজার মতো চলে গেল। বুকটা ফাঁকা লাগছে। চোখের কোনায় জল জড়ো হচ্ছে। আমার বউ জলুদাকে নিয়ে কত কী বলেছে, যেমন, ‘ওর আর কী! বিয়ে-থা করেনি। কোনো দায় নেই। তোমাদের তো দায়িত্ব আছে। ছেলেটাকে দেখো। তা না, সন্ধে হলেই অফিস থেকে এসে ছুটল, আইবুড়ো কার্তিকের লেকচার শুনতে।’
এটা ঠিক। সন্ধে হলেই এক নেশা। মহাবলী সঙ্ঘ। তার চারদিকে যেমন সেখানে বইয়ের লাইব্রেরি, তেমনি মেঝে জোড়া সব বারবেল, মুগুর, কোনায় কোনায় তেল চুকচুকে লাঠি। এক দেওয়ালে ব্যাগ পাইপ। ড্রামস। বিউগল। তবে, আমরা যারা আসি, সবাই বেশ পরিণত মানুষ। আজকের ছেলেপুলেরা জানিনা কতটা আকৃষ্ট হবে। আজ জলুদা চলে গেল। এরপর কে যে ক্লাবের দায়িত্ব নেবে, ভগবান জানে।
ভুবনবাবুর খুন হওয়া বউ ছাই হয়ে গেল। আমরা চোখের জলে ভেসে জলুদাকে শেষ বিদায় জানানোর সময় দেখলাম, গদা তিনবার বিউগল বাজাল। আর, জলুদা সেই প্রবল আগুনের মধ্যে মুখে হাসিটুকু স্থির ফ্রেমে রেখে চলে গেল। আমরা আবার যে যার গঙ্গার পাড়ে এসে বসলাম। রাতটাকে তখন আরও নির্জন। আরও রহস্যময় মনে হচ্ছিল। তখন, আমার বুকের মধ্যে, ঐ বউটার, মানে ভুবনবাবুর বউয়ের মুখটা ভেসে উঠল। তার মুখের কোথাও কোনো পাপের চিহ্ন নেই। তবে কেন, এ ঘটনা ঘটল, ভাবতে পারছিলাম না। তবে কি ভুবনবাবুর কোনো ইন্টুর দোষ আছে ?
মৃত্যু চিরায়ত শোকের নয়। রূঢ় বাস্তবের মুখোমুখি হতে হতে, কবে সে পেছনে চলে যায়। মাঝে মাঝে স্মৃতিতে উদয় হলেও, তা মনকে আর তেমন শোকাচ্ছন্ন করেনা। তেমন জলুদার শ্রাদ্ধ-শান্তি মিটে গেলে, মহাবলী সঙ্ঘে শোকসভা সেরে, যে যার আবার জীবন যুদ্ধে অবতীর্ণ হলাম। আর, অভ্যাসবশত সন্ধে হলে আড্ডা জমাতাম, আমাদের একমাত্র ঠিকানা, মহাবলী সঙ্ঘয়। এর মধ্যে পবিত্র কর, ওরফে গুন্ডাদা, আমাদের এক সদস্য, সেক্রেটারি হল। ক্লাব মাঠ হারাল। সেখানে প্রমোটারের ইট পড়ল। ভিত খোঁড়া হল। আমাদের ক্লাবের দৈন্যদশা, তার মাথা ঢাকা হলুদ আলোয়, পুরোনো সেকেলে কাঠের আলমারি, জৌলুষ হারানো কাপ-শিল্ড-এ ফুটে রইল। নতুন সেক্রেটারি বলল, ‘ক্লাবে টিভি দরকার। জলুটা থাকতে বারে বারেও পারিনি। আরে, আমরা না হয় শুধু স্পোর্টস চ্যানেল দেখব। বাড়ির মেয়েদের মতো সিরিয়াল তো দেখবনা।’
জলুদা সেকেলে পন্থী। বেঁচে থাকতে কখনও এসব আধুনিক নাগরিক জীবনের মোহ তেমনভাবে তাকে পরাস্ত করতে পারেনি। টিভির অভাবটা আমরা বুঝতাম। বিশেষ করে ক্রিকেট ম্যাচগুলোর সময়। একবার জলুদাকে বলেছিলাম। জলুদা বলেছিল, ‘দুর! মাইরি। তোরা ক্রিকেট নিয়ে কী করে মাতামাতি করছিস বলতো? ফুটবল। ফুটবল। মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গল। এ বাঙালির নিজস্ব জিনিস। বাঙালির তো সব গেছে। সে সব বড়ো বড়ো ব্যায়ামবীর নেই। ফুটবলার নেই। উত্তমকুমার নেই। একটা জাত শেষ হয়ে যাবে।’
টিভি এল। এক সন্ধেয় এম.এল.এ দলবল নিয়ে হাজির। ক্লাবটা ঘুরে ঘুরে দেখলেন। তার কন্ঠে হতাশা ঝরে পড়ল। বললেন, ‘কী অবস্থা? অ্যাঁ। কী অবস্থা। অন্য ক্লাবগুলো দেখেছেন আপনারা? তারা অনুদানের টাকায় ক্লাব বিল্ডিং ভেঙে বিয়েবাড়ি করে রোজগার করছে। এতো দেখছি, একেবারে ডেড। এই মরা পচাটা রেখে কী হবে? বলুন, একদিন স্পোর্টস মিনিস্টারকে নিয়ে আসি। এলাকার এরকম একটা ঐতিহ্যবাহী ক্লাব! না-না?’
পবিত্র কর গদগদ। এম.এল.এ চলে গেলে বলল, ‘দেখলেতো। বলেছিলাম না। পুরোনো ঘি-এ বাতের ব্যথা সারে। লুচি-পরটা হয়না। গরম ভাতে মেখে খাওয়াও যায়না। গীতায় পর্যন্ত বলেছে, বাসাংসি জীর্ণানি যথা বিহায়…’
সায় ছিলনা আমার। আমার, গদার, পোনার, রবি’র আরও কজনের, যারা জলুদার হাতে মানুষ। আমরা গোপন বৈঠক করলাম। কিছুতেই রাজনীতির লোককে ঘেঁষতে দেবনা। তার পর কোনদিন বলবে, আজ মিছিল আছে। দল বেঁধে চলো। না, ওতে নেই। আমাদের এই পানসে হলুদ আলোই ভালো। তবু তো সন্ধেটা আমরা অতীতের মধ্যে থাকি। কজন অতীতকে ধরে রাখতে পারে? আমরা পারি বলে গর্ব করতে পারি। এ নিয়ে আমাদের আপত্তি বেশ সাজিয়ে গুছিয়ে রেখে বাড়ি ফিরলাম। সেদিন বেশ রাত হয়েছিল। বউ ছ্যারছ্যার করে শোনাল, ‘তিনকাল গিয়ে এককালে ঠেকেছে। ঘাটের দিকে পা। ক্লাব করছেন ? ছেলেটার রেজাল্ট দেখেছ ? ক্লাস সেভেনের ওই রেজাল্ট ? পরে তো হাড় মূর্খ হয়ে থাকবে। শুধু বাপটার জন্যে। ক্লাব করছেন। ক্লাব !’
আমি জানতাম না ঐ রাতেই মহাবলী সংঘ সম্বন্ধে আমার মতামত দেওয়ার সুযোগ সারা জীবনের মতো চলে যাবে। পরদিন আমি ট্র্যান্সফার হয়ে গেলাম। হঠাৎই, অনেক দূরে। মুম্বাইতে। প্রথমে একা গেলাম। কদিন বাদে এসে আর কারও সঙ্গে দেখা করতে পারিনি। বউ বাচ্চা নিয়ে চলে গেলাম। শুধু যাওয়ার সময় আকুল কান্নায় আমার চোখ ভিজেছিল। আমাদের মাঠটায় একতলার লিনটেন পর্যন্ত তোলা হয়েছে। আধো জ্যোৎস্নায় ঐ ছবি দেখে চোখে জল এসেছিল। মনে পড়ল জলুদার কথা। আর কী আশ্চর্য, কেন যে ভুবনবাবুর সেই বউকে খুন করেও অদ্ভুত, শান্ত, সৌম্য থাকা চেহারাটাও হঠাৎ মনের কোণে উঁকি দিয়ে মিলিয়ে গেল। কারণ, তখন, আমার ছেলে মুম্বাই সম্বন্ধে তার তথ্য ভান্ডার পুষ্ট করার জন্যে আমাকে ক্রমাগত প্রশ্ন করে যেতে লাগল। ট্যাকসিটা তখন রিকশ, মিনিবাস, বাস, লোকজনের ভিড়ে ব্যস্ত হাওড়ার রাস্তায় হর্ন বাজিয়ে, গিয়ার পালটে, দুস, দুর , আ! এইসব করতে করতে চলছিল।
প্রবাস জীবন কী বেদনার, বিশেষ করে, আমার মতো মানুষদের, যাঁরা কাটাননি, বুঝবেন না। মনে হয় একটা বিচ্ছিন্ন দ্বীপে আছি। প্রথম প্রথম প্রায় সব চেনা মানুষকে ফোন করতাম। পরে বুঝলাম। তারা জীবনের রসে এত ভেসে আছে, এ নির্বাসিত দন্ডিতের কথা শোনার দায় তাদের নেই। তাই, আস্তে আস্তে যত দিন যায়, ফোন করা কমতে থাকে। চেষ্টা করি সহজ হবার। গড্ডলিকা স্রোতে গা ভাসাবার।
আমার ছেলে বেশ মানিয়ে নিয়েছে। বউও মোটামুটি। ভাঙা হিন্দি ভাঙা ইংরেজি মিশিয়ে সে যা হোক তা হোক। আমার পোষাচ্ছেনা। বুকের মধ্যে সেই রয়েই গেছে, সেইসব পুরোনো দিন। এখানকার অজস্র ফ্লাইওভার। মিনিটে মিনিটে শহরতলির ট্রেন। তার ভিড়। এখানকার রেল-স্টেশনগুলো। মানুষজন। সব। আর সবাই। আমার এত অপরিচিত। মুখ খোলার সাহস হয়না। এরকম করে এই মানসিক একাকীত্বের ভারী বোঝা টানা দুষ্কর। কলকাতার অফিসে কাতর অনুনয় জানিয়ে প্রথম প্রথম চিঠি লিখেছি। সে গুলো যে আবর্জনার ঝুড়িতে জড়ো হয়েছে, সে বিষয় আমি নির্দ্বিধায়। মাঝে মাঝে একান্ত একা, যখন মুম্বই শহরের কোনো মাঠ ভেঙে হাঁটি, আর প্রাচীন স্থাপত্যের বাড়িগুলোয় বিকেলের রোদ মেখে যায়, মনে হয়, এখানে কোথাও মৌচাক নিশ্চয়ই আছে। খুঁজে দেখতে হবে। খোঁজা আর হয়ে ওঠেনা। সেই, সকালে ঘুম থেকে ওঠা। সব্জি মার্কেট যাওয়া। মাছের বাজারে মারাঠি মহিলাদের সঙ্গে দরাদরি করতে করতে দেখা, কী সুনিপুণ ভাবে, ওরা কাতান দিয়ে মাছ কাটে। ওদের শাড়ি পরার ধরণ, ওদের নাকের নথ, টানা চোখে কাজল; শ্যামলা রঙ; খোঁপার ফুল; পায়ের নুপুব; আর মল, এইসব দেখি। আর ভাবি, এদের প্রাণে মহতী আনন্দের সন্ধান আছে। দায়ে পড়ে কিছু কিছু মারাঠি ভাষা শিখেছি। ওদের মানুষজনের মধ্যে কীরকম, নম্র, এক শান্ত, সুন্দর, ভীতু, ভীতু, ভাব। হয়তো আমাদের মতোই ওরা চাকুরিজীবী হয়ে ক্ষুণ্ণিবৃত্তি করে কাটাতে ভালোবাসে। অনেকে বলে, মুম্বাইতে নাকি প্রচুর বাঙালি অ্যাসোসিয়েশন আছে। তাদের লাইব্রেরি রয়েছে। সান্ধ্য আড্ডা বসে। দুর্গাপুজো মুম্বাইতে কম হয়না। বাঙালিরা সেখানে কাতারে কাতারে…কিন্তু, আমি মুখচোরা মানুষ। ভাবি, এসবের জন্যে বোধহয় জলুদা দায়ী। কোনোদিন আমাদের প্রাণের কথা, মনের চাহিদাকে প্রশ্রয় দেয়নি। দাপটে রাজপাট চালিয়েছে।
মহাবলী সংঘের অবস্থা কেমন কে জানে। যুগের সঙ্গে তাল না রাখতে পেরে হয়তো হারিয়ে গেছে। কিংবা, মাথা নিচু করে চলতি হাওয়াকে মেনে নিয়ে রক্ষেকালী পুজো দিয়ে শুরু করেছে। হয়ত সেই টিনের আটচালার নীচে শাল-খুঁটি দিয়ে তৈরি ক্লাবঘর ভেঙে বিয়ে-বাড়ি তৈরি হচ্ছে। মদের আসর বসছে। এসব ভাবি আর ভয় হয়। তাই ফোন করে কারও কাছে জানতে চাইনা। হয়তো, পাড়ায় পুরোনো বাড়িগুলোর জায়গায় বহুতল উঠছে। এইসব ভাবনা দুর্ভাবনার মধ্যে কাটাই। মাঝে মাঝে ছেলে বউ নিয়ে বেরিয়ে পড়ি মুম্বাই শহরের এদিক ওদিক। তারই মধ্যে ছ’বছর কেটে গেল।
একদিন দেখি, আরব সাগরের বিশাল নোনা ঢেউয়ের মধ্যে জলুদা। একটা মোচার খোলের মতো নৌকায়। দাঁড় বাইছে। ওর উল্টোদিকে গলুইয়ের ওপর ভুবনবাবু। সাদা ধবধবে সিন্ধু-সারস উড়ে উড়ে আসছে। আর, ভুবনবাবু থিন এরারুট বিস্কুট ভেঙে ভেঙে ছুঁড়ে ছুঁড়ে দিচ্ছে। তার বিস্কুট রঙের মুখে বাহারি বাদামি দাড়ি, কটা চোখ, স্বল্প, কলপ করা, চুল। পরনে সাদা শার্ট , গ্যালিস দেওয়া, কালো প্যান্টের ভেতর গোঁজা।
ভুবনবাবু দূরের দিকে তাকালে, একটা সবুজ দ্বীপ চোখে পড়ল।
জলুদা দাঁড় বাইতে বাইতে বলল, অবশ্য, তার আগে, ঢেউয়ের ঝাপটায় জলুদার গোটা গা ভিজে গেল। কতদিন বাদে জলুদার সেই ভারি গলার আওয়াজ পেলাম, ‘আর কতদূর?’
‘ঐতো।’
‘হুঁ। এর আগে কেউ এসেছে এখানে?’
‘যদ্দুর মনে হয়, না।’
‘ওখানে আমরা থাকব?’
‘হুঁ।’
‘কেন?’
ভুবনবাবু একটু হাসল। ওর ঝকঝকে দাঁতে পশ্চিমের রোদ এসে পড়ল। মুখটাও রাঙিয়ে গেল সেই আলোয়।
জলুদা বলল, ‘আমরা এই দ্বীপটা বাছলাম কেন ?’
‘সারা জীবন তো মানুষের মধ্যে একা হয়ে বেঁচেছি।’
‘না। না। আপনি তবু একা হয়ে যেতেন কখনও কখনও। সেই যে আপনার দোতলা হলুদ রঙের বাড়ি। জায়গায় জায়গায় অবশ্য রঙ চটা। তার সবুজ দরজা জানলা। ওর দোতলায় বাহারি রেলিং। লাল মেঝে। দোতলার ঘরটার সিলিং কত উঁচুতে। এছাড়া, আপনার বাড়ির বাগান। ঘন ঘাস। খয়েরি কান্ড নিয়ে ডালপালা মেলা কত গাছ, তাদের সবুজ পাতার রঙ। লাল গেটের মাথায় লোহার ধনুক ছাঁদ, আইভি লতার ঢল সেখানে। এককোনায় টিনের দেওয়াল, টিনের চাল, গ্যারাজ। ওর ভেতরে কালো রঙের ভিনটেজ কার। আর ঐ দোতলার সবচে’ বড়ো ঘরটা, মাঝখানের খানিকটায় কাশ্মিরি কার্পেট। এক দেওয়াল থেকে বেশ খানিকটা ছেড়ে সাবেকি সোফা। কিন্তু, সবচে’ সম্ভ্রম কাড়া, ঐ ঘরে, এক ঢাউস পিয়ানো।’
‘হুঁ। পিয়ানোয় আঙুল চললে…’
‘কিন্তু, আপনি বউকে খুন করলেন?’
‘আমি নির্দোষ। প্রমাণিত।’
‘বললে হবে, সাতবছর…’
‘প্রমাণ হয়েছে, আমি খুন করিনি।’
‘আপনি মিথ্যে বলছেন।’
‘না। আমি সত্যি বলছি।’
‘না। আপনি মিথ্যে বলছেন।’
‘না। আমি সত্যি বলছি।’
দুজনের কন্ঠস্বর যখন সপ্তগ্রামে, একটা বিশাল ঢেউ, বা, ওখানে কোনও ঘূর্ণি জলুদা আর ভুবনবাবুকে নিয়ে গভীর জলের ভেতর চলে গেল। রাশি রাশি লোনা জল আমারও পেটের ভেতর ঢুকেছে। চোখ কড়কড় করছে। আমি ভাববার চেষ্টা করছি। যাঃ চ্চলে! এতক্ষণ আমি কোথায় ছিলাম? এইতো আমার সামনে একটা বিশাল লাইটহাউস! ওদিকে আকাশ ভরা তারা। লাইটহাউসের আলোয় নিজেকে দেখলাম। এক নীল রঙের মানুষ। এইটুকু। তারপর, কী ঘটেছিল মনে নেই। কিন্তু, স্বপ্নটা আমাকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। এমন নয়, আমি রাতে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে বিছানায় ঐ স্বপ্নটা দেখেছিলাম। সেদিন রবিবার। বেশ জোলো হাওয়া বইছিল। আমাদের বাইশ তলার ফ্ল্যাটের পনেরতলায় আমি থাকি। এই সময়টা বারান্দায় একটা ইজিচেয়ারে আধশোয়া হয়ে কোনো বই, এক আধটা সিগারেট, ততক্ষণে বউ টুকিটাকি ঘর-গেরস্থালির কাজ সারে। ঝিমুনি আসে। ঘুম ঘুম পায়। চেষ্টা করি তাকিয়ে থাকার। নীচের জীবন-প্লাবনের মহোৎসবে চোখ রাখার। কিন্তু, ঐদিন ঐ স্বপ্নটা দেখার পর যখন ঘুম ভাঙল, সত্যিই মুম্বাইয়ের আলোকসজ্জা ও কালো, ভীষণ কালো, আকাশের গায়ে ফুটে ওঠা তারার দল দেখে চমকে গেলাম। বাড়ি সুনসান। হয়তো, আমি ঘুমোচ্ছি দেখে বউ আর ছেলে বাজারে গেছে। স্বপ্নটা নিয়ে ঘোর বিশ্লেষণে জড়িয়ে গেলাম।
ঘরে ঢুকে সব কটা আলো জ্বেলে দিলাম। এটা আমাদের বসবার ঘর। ওয়েল ফার্নিশ্ড। একটা আদর্শ বসবার ঘর যেমন হয়। মাঝে মাঝে এঘরে বহিরাগতরা যে আসেনা তা নয়। প্রথম প্রথম খুব দ্বিধায় পড়ে যেতাম। এখানে তো বললেই তেমন মিষ্টির দোকান পাবনা। পরে অতিথি আপ্যায়নে ধাতস্থ হলাম। প্লেটে প্লেটে ঝুরিভাজা। খানকয়েক বিস্কুট। আর, প্যাকেটের চা। আমাদের ওখানকার মতো লুজ চা’তো পাওয়া দুষ্কর। ঘরটার সোফা, কিছু ইন্টেরিয়র ডেকরেশনের স্ট্যাচু-ম্যাচু, বড়ো আয়না, কার্পেট, দেয়াল জোড়া টিভি – – এই এক প্রতিদিনকার একঘেয়ে ছবির মধ্যে থাকতে থাকতে জলুদা ও ভুবনবাবু কেন বুদ্বুদের মতো মিলিয়ে গেলনা কে জানে। ছবছর পর, ওরা দুজনে ওরকম এক ভয় পাওয়ানো স্বপ্নে দেখা দিল। এবার আমার মনে হল, স্বপ্ন হলেও তার মধ্যে তথ্যগত ভ্রান্তি বেশ রয়েছে। প্রথমত জলুদা মারা গেছে ছবছর। ভুবনবাবুর স্ত্রী মার্ডার হয়েছে তাহলে ছ বছরই হবে। তবে, ভুবনবাবু কী করে সাত বছর জেল খাটার পর ছাড়া পেল? তবে কি, ভুবনবাবু এখনও জেলে? একবছর পর ছাড়া পাবে? আমি কি আগামি দিনের স্বপ্ন দেখলাম? আগামি দিন! সেতো অস্তিত্বের মধ্যে পড়েনা। তবু আমরা বলি অমুক তারিখে আমাদের বিশেষ সভা। সমস্ত ক্লাব মেম্বার নিয়ে সাধারণ সভা। হ্যাঁ। আমি মহাবলী সঙ্ঘের কথা বলছি। দুস, কেন যে এই মহাবলী সঙ্ঘের ভূত আমার ঘাড় থেকে নামছেনা। আবার ভাবি, জলুদার সঙ্গে ভুবনবাবুর কি কষ্মিনকালে কোনও সম্পর্ক ছিল? জলুদাই বা ভুবনবাবুর জন্যে দাঁড় বাইবে কেন। ওরকম একটা বউকে খুন করা লোকের সঙ্গে জলুদার সম্পর্ক থাকবে? অসম্ভব। জলুদা আদর্শ পুরুষ। কোনও দিন কোনও মেয়ের দিকে চোখ তুলে তাকায়নি। আমাদের পুরোনো পাড়ায় যদি কোনো প্রেমের বিবাহ হত, ঢি ঢি পড়ে যেত। আলোচনা হত। সে প্রেমে পড়া মেয়েটা আর ছেলেটাকে আমরা বিশেষ জীবের মতো দেখতাম। আমাদের চোখ বড়ো বড়ো করে তাকিয়ে থাকার মধ্যে, সেই শৈশবে চিড়িয়াখানা দেখার দিনগুলো ফিরে ফিরে আসত। সেইসব শীতের দিনও। একগাদা কমলালেবু। বাবা সাহেব কম্পানিতে চাকরি করত। অফিস থেকে বড়োüদিনের কেক আসত। পুজোর সময়, বড়দা, মেজদা, সেজদা, আমাদের ন’দি তখনও ফ্রক পরে, বাবার সঙ্গে একসঙ্গে গিয়ে শহরের এক চেনা দোকানে ঢুকতাম। সবার জন্যে বাবা পছন্দ করত। সবার জন্যে একটা করে জামা। অষ্টমীর দিন পরা হবে। অথচ, আমার ছেলের যে কত জামা প্যান্ট, তার ইয়ত্তা নেই। আমার বউয়েরও যে কত শাড়ি, অনেক তো পরাই হয়নি। ভাঁজ থেকে কত শাড়ি যে কেটে গেছে। ফেলে দিতে হয়েছে। বা, কলকাতার বাড়িতে, ঐগুলো দিয়ে বাসন কেনা। এসব দেখে জলুদা বলত, ‘নিছক প্রয়োজনের তুলনায় বেশি চাওয়া মানে লোভি হওয়া। লোভ, দেখবি, একদিন তোকে কিছু সময়ের সুখ দেবে। বাকি সব সময়ের জন্যে যন্ত্রণা দেবে।’
বউকে বললে বলত, ‘ছাড়ো তো ঐ ভন্ড তপস্বীর কথা। নিজে বিয়ে করেনি তো। ন্যাংটা মানুষ। ওর আবার চাওয়া কি! ঐ লোকটা তোমার মাথা খাচ্ছে। আর, আমাদের অজুকে তুমি অবহেলা করছ। ছেলেটা মনমরা হয়ে শুকিয়ে যাচ্ছে।’
আমার বউ আর ছেলে বেশ রাত করেই ফিরল। তা প্রায় রাত দশটা। রাংতার প্যাকেটে মুড়ে বউ খাবার এনেছে। ও বাইরের পোশাক ছেড়ে, ঘরোয়া ম্যাকসি পরে নিল। মুখে চোখে জল দিয়ে এসে, মাইক্রো ওভেনে খাবার গরম করতে দিল। ছেলে কাছে এসে বলল, ‘সরি ড্যাড। যা ঘুমোচ্ছিলে।’
আমি একটু হাসলাম। মনে মনে ভাবলাম, আজ তোদের সঙ্গে বাইরে গেলে, ঐ স্বপ্নটা দেখা হতনা।
বউ ডাইনিং টেবিলে খাবার সাজাতে সাজাতে বলল, ‘আজ কিন্তু অজুর কানাডা যাবার ব্যাপারে ফাইনাল করবে। এ পোড়ার দেশে থেকে কিছু হবেনা।’
জলুদা আর ভুবনবাবু আমায় ছাড়লনা। ভাবলাম, ™ার্থিব সুখের জন্যে আমার বউ আর ছৈলে কত সময় দেয়! ও কখনও জলুদা আর ভুবন বাবুকে নিয়ে স্বপ্ন দেখেনা। ওরকম লাইটহাউসের আলোয় বিক্ষুব্ধ সমুদ্রের মধ্যে নীল হয়ে ওঠার কথা ভাবেনা।
খেতে বসে ছেলেকে বললাম, ‘লাইটহাউস সম্বন্ধে কিছু জানিস?’
‘নো ড্যাড।’
‘এই সমুদ্র শহরে থাকিস, লাইটহাউস তোকে একটু ভাবায়না?’
বউ বলল, ‘ঐ নাও। শুরু হল! কথা হবে কানাডার। তা’না লাইটহাউস। এই অজু, তোর ড্যাডকে জিজ্ঞেস কর, কানাডার ব্যাপারটায় ফাইনাল করবে কিনা।’
আমার মনে হল, রেগে যাওয়া উচিত। যা খুশি তাই বলবে কেন? আমার হাড়ভাঙা রোজগারে ওদের এত লপরচপর। কিন্তু, ঐ সময়ে আমার খাবারের প্লেটের পাশে রাখা মোবাইলটা বেজে উঠল। মেজদার নম্বর। হঠাৎ?
মেজদার ফোনে জানলাম, আমার কলকাতার বন্ধু, সংকর্ষণ রায়, বাড়িতে ফোন করেছিল, আমাকে কলকাতায় ফেরানোর কথা নাকি ভাবা হচ্ছে। তাছাড়া, আমাদের বাড়িটা ফ্ল্যাট হবে। প্রমোটরদের সঙ্গে কথা চলছে। আমার যাওয়া জরুরি। সই টই কী সব লাগবে। আমার ভাগটায় আমি ফ্ল্যাট নেব, না, টাকা নেব, এইসব নিয়ে আলোচনার দরকার। মহাবলী সংঘের কথাও জিজ্ঞেস করেছিলাম। দায়সারা উত্তর এসেছিল। ঐ চারতলা হয়েছে। একতলায় জিম। দোতলায় লাইব্রেরি। তিনতলা, চারতলা, সামাজিক অনুষ্ঠানে ভাড়া দেওয়া হয়। তাছাড়া, পাড়ার প্রায় নাইনটি পার্সেন্ট পুরোনো বাড়ি ভেঙে ফ্ল্যাট হয়ে যাচ্ছে। দিনরাত শুধু লরি, ইট, বালি, লোহার রড, আর একপাল পাড়ার উঠতি মস্তানরা। নতুন নতুন লোকে পাড়া ছেয়ে যাচ্ছে।
সব শুনে বউ বলল, ‘কলকাতায় তুমি ফিরে যাবেনা।’
‘কেন?’ আমি আঁতকে উঠে জিজ্ঞেস করলাম।
ছেলে বলল, ‘না ড্যাড। এটা রিয়েলি ফানি। তুমি একটা ডেড শহরে যেতে চাইছ। যেখানে শুধু বেকারদের আড্ডা আর গুলতানি।’
আমি বললাম, ‘নিজের জন্মের জায়গা সম্বন্ধে এত খারাপ ভাবাটা ঠিক নয়।‘
বউ বলল, ‘ছাড়ো দিকিনি। ভাত কাপড় দিতে পারেনা। তাকে নিয়ে আবার আদিখ্যেতা, হুঁ!’
আমার বুকের ভেতর রাগ গজগজ করছিল। কিন্তু, আজকাল আমি কেমন পোষা কুত্তা হয়ে গেছি। রাগলেও লেজ নাড়ি। বেশিক্ষণ কথা চালাবার সামর্থ ছিলনা। সত্যিই তো অজু কি আমার মতো বোকা বোকা জীবন কাটাবে? যাক, ও কানাডায় যাক। ওর বন্ধুরাও তো সব বাইরে যাচ্ছে। মোহিত প্যাটেল। সদানন্দ বেহেরা। রজনীশ পানিক্কর। কৃষ্ণমূর্তি। মেয়েদের মধ্যে অহনা দেশমুখ। শশীকলা সাওন্ত। আরও কত, সবার নাম জানিনা কি ছাই। ওখানে নাকি পার্ট টাইম কাজ করে পড়ার খরচ জোগানো যায়। আমার তো কলকাতায় কেটেছে অনেকদিন, আর এই ছবছর এই পশ্চিমের শহর মুম্বাই। মুরশিদাবাদের হাজারদুয়ারিটা পর্যন্ত আর দেখা হল কই।
সে রাতে স্থির হল, কলকাতা আমি যাব। বাড়িতেই আমার ফ্ল্যাটের সংস্থান রেখে আসব। অজুকে কানাডা পাঠাবার পর, আমি, আর অঞ্জু, আমার বউ, কলকাতায় পাকাপাকিভাবে ফেরার কথা ভাবতে পারি।
রাতে বিছানায় শুয়ে কৃতজ্ঞতাবশত অঞ্জু আমাকে জড়িয়ে ধরল। বহুদিন বাদে, আমার অঞ্জুকে সেই পুরোনো অঞ্জু মনে হল। ভাবলাম, সত্যিই তো, ওরাই তো আমার সব। আর তো কেউ আমার আপন নয়। তখন, আলাদা সময় ছিল। আলাদা ভাবনা ছিল। আজ এই পার্থিব জীবনভাবনার দিনে, এই ইঁদুর দৌড়ে আমি বাজি না ধরতে পারলেও, গ্যালারির দর্শক হতে আপত্তি কোথায়। তাই অঞ্জু ও আমি পরস্পর, এই কতদিন বাদে, সে এক আনন্দঘন রাত, সারারাত। ভোরের আলো ফোটার সময়, আমার দুচোখে ঘুম নেমে গিয়েছিল। তার আগে, আমি প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, আর কখনও বোকার মতো লাইটহাউসের আলোয় নীল হবনা।
গল্পটা এখানে শেষ হলে ভালো হত। মোটামুটি উপসংহারে পৌঁছনো গিয়েছিল। বিশেষ করে আমাদের সেই প্রাচীনত্বের প্রতি আদিখ্যেতার সংহার করতে পারব। এত সহজে মিশে যেতে পারব, চলমান জীবনের অনন্তকাল ধরে প্রবহমান গড্ডলিকা স্রোতে, ভেবে, নিজেকে বিজয়ী মনে হচ্ছিল। এতদিন বাদে আমি যেন জলুদাকে টেক্কা দিতে পারলাম। জলুদার সমস্ত ভাবনা, আদর্শ, যার মধ্যে দিয়ে আমাদের জীবনের মূল্যবান সময়ের কত অপচয় করেছি, ভেবে, জলুদাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছিলাম, বলেছিলাম, ‘এই তোমার ফটিক, জলুদা। আজ জয়ী। তার নিজেকে হারিয়ে সে এক অসম্ভব যুদ্ধ জিতে বসে আছে।’
সব হিসেব। সব যুদ্ধ জয়। সব কিছুকে টেক্কা দিয়ে বেরিয়ে আসার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াল একটা ঘটনা। এক জ্যোৎস্নারাতে, ফেনুদি আমার হাত ধরে নিয়ে গিয়েছিল। সেখানে।
সেই, ব্যাদড়ামুখি আর গোবরগণেশের বাড়ি উধাও। সে প্রশস্ত জমির চারদিকে বেড়া। মধ্যেখানে স্বমহিমায় একটা বকুল গাছ। পাশে একটা স্মৃতিফলক। সেখানে লেখা-
জলধিপ্রসন্ন বন্দোপাধ্যায় (জলুদা)’র স্মৃতিতে উৎসর্গ
ইতি
ভুবনমোহন মুখোপাধ্যায়