ওঙ্কার ডেস্ক: ভারতের জনসংখ্যার প্রায় ৮.৬ শতাংশ মানুষ আদিবাসী সম্প্রদায়ের অন্তর্গত। দেশের জাতীয় সংস্কৃতিতে এই সম্প্রদায়ের ভূমিকা অপরিসীম হলেও, দীর্ঘদিন ধরে তাঁরা ভুগে চলেছেন এক জিনগত অসুখে সিকল সেল ডিজিজে। রক্তের লোহিত কণিকার গঠনগত পরিবর্তনের ফলে এই ব্যাধি আক্রান্তের শরীরে নানা জটিল সমস্যা সৃষ্টি করে এবং সুস্থ জীবনের পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষত প্রত্যন্ত অঞ্চলে বসবাস করার কারণে স্বাস্থ্য পরিষেবা থেকে দীর্ঘদিন বিচ্ছিন্ন থেকেছেন এঁরা।এই পরিস্থিতি বদলাতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে ২০২৩ সালের জুলাই মাসে চালু হয় ন্যাশনাল সিকল সেল অ্যানিমিয়া এলিমিনেশন মিশন। কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রকের তত্ত্বাবধানে চালু হওয়া এই প্রকল্পের লক্ষ্য ২০৪৭ সালের মধ্যে সিকল সেল রোগকে সম্পূর্ণ নির্মূল করা।
স্বাস্থ্য মন্ত্রকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই মিশনের প্রথম দুই বছরে দেশের ১৭টি ঝুঁকিপূর্ণ রাজ্যের ৩০০-রও বেশি জেলায় ৬ কোটি ৭ লক্ষ নাগরিকের স্বাস্থ্য পরীক্ষা হয়েছে। এর মধ্যে ২ লক্ষ ১৬ হাজার জনের শরীরে সিকল সেল রোগ ধরা পড়েছে এবং ১৬ লক্ষ ৯২ হাজার জন বাহক বলে চিহ্নিত হয়েছেন। আক্রান্তদের মধ্যে ৯৫ শতাংশই ওড়িশা, মধ্যপ্রদেশ, গুজরাট, ছত্তিশগড় এবং মহারাষ্ট্রের বাসিন্দা। এই মিশনের ইতিবাচক দিকগুলির মধ্যে অন্যতম হলো রোগ নির্ণায়ক পরীক্ষার কিট সহজলভ্য করে তোলা। আগে যেখানে এই কিটের দাম ছিল ১০০ টাকা, বর্তমানে ৩০টি কিটের অনুমোদনের ফলে দাম নেমে এসেছে মাত্র ২৮ টাকায়। ফলে সুলভ মূল্যে বিপুল সংখ্যক মানুষের স্বাস্থ্য পরীক্ষা সম্ভব হচ্ছে।
চিকিৎসা ব্যবস্থাও পরিবর্তন হয়েছে অনেকাংশে। সিকল সেল রোগীদের বিনামূল্যে দেওয়া হচ্ছে হাইড্রোক্সিইউরিয়া। জাতীয় স্তরে অতি প্রয়োজনীয় ওষুধের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত এই ওষুধ এখন আয়ুষ্মান আরোগ্য মন্দিরেই পাওয়া যাচ্ছে। শুধু ওষুধ নয়, আক্রান্তদের জন্য সর্বাঙ্গীন চিকিৎসা পরিষেবার ব্যবস্থা করেছে সরকার।
ছত্তিশগড়ের নওয়াপাড়া অম্বিকাপুর গ্রামের মীনা এই উদ্যোগের উদাহরণ। স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নাম নথিভুক্ত করার পর তিনি নিয়মিত হাইড্রোক্সিইউরিয়া পেয়েছেন। বর্তমানে সুস্থ জীবনযাপন করছেন মীনা এবং নিজের সম্প্রদায়ের মানুষদেরও জিনগত পরীক্ষা করাতে উদ্বুদ্ধ করছেন।
এই প্রকল্পের আওতায় ইতিমধ্যেই ২ কোটি ৬২ লক্ষ জেনেটিক স্টেটাস কার্ড বিতরণ করা হয়েছে। কার্ডে স্বাস্থ্য সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য লেখা থাকায় চিকিৎসক ও পরিবারকে সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করছে। পাশাপাশি দেশের ১৫টি মেডিক্যাল কলেজে উৎকর্ষ কেন্দ্র গড়ে তোলা হয়েছে, যেখানে সন্তান জন্মের আগে সম্ভাব্য ঝুঁকি নির্ধারণ ও প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
শুধু স্বাস্থ্য মন্ত্রক নয়, আদিবাসী বিষয়ক মন্ত্রক, শিক্ষা মন্ত্রক, নারী ও শিশু কল্যাণ মন্ত্রক এবং সামাজিক ন্যায় ও ক্ষমতায়ন মন্ত্রকও এই মিশনের সঙ্গে যুক্ত। একাধিক মন্ত্রকের যৌথ উদ্যোগেই আদিবাসীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার পাশাপাশি আর্থ-সামাজিক বাস্তবতাকেও গুরুত্ব দিয়ে সাশ্রয়ী চিকিৎসা নিশ্চিত করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মিশনের সাফল্যের মূলে রয়েছে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবন এবং তৃণমূল স্তরে কার্যকরী পদক্ষেপ। জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণের ফলে ইতিমধ্যেই লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবনে এসেছে ইতিবাচক পরিবর্তন।
