নিজস্ব প্রতিনিধি, কাকদ্বীপ; বাঙালির প্রিয় ইলিশ এবার মিলবে পুকুরে। নদী বা সমুদ্রের ইলিশের পাশাপাশি পুকুরে চাষ নিয়ে গবেষণা। কাকদ্বীপের গবেষণায় মিলতে পারে যুগান্তকারী সাফল্য।
দক্ষিণ ২৪ পরগণার কাকদ্বীপে চলছে এক যুগান্তকারী গবেষণার শেষ ধাপ। যা সফল হলে ভবিষ্যতে ব্যক্তিগত পুকুরেও চাষ করা যাবে বাঙালির প্রিয় মাছ ইলিশ। শুধু তাই নয়, বাজারে নদী বা সমুদ্রের ইলিশের পাশাপাশি পুকুরে চাষ হওয়া ইলিশও বিক্রি হতে পারে। এমন সম্ভাবনাই তৈরি হয়েছে কাকদ্বীপের কেন্দ্রীয় নোনা জলজীব পালন অনুসন্ধান সংস্থার সাম্প্রতিক গবেষণাকে ঘিরে। বিজ্ঞানীদের দাবি, পুকুরে ইলিশ চাষের ক্ষেত্রে ইতিমধ্যেই পাঁচটি ধাপে সাফল্য মিলেছে। এবার শুরু হয়েছে ষষ্ঠ তথা শেষ ধাপের গবেষণা। এই ধাপে সাফল্য এলেই বিশ্বজুড়ে এক নতুন নজির গড়বে ভারত এবং পশ্চিমবঙ্গে।
সম্প্রতিকালে সুন্দরবন উন্নয়নমন্ত্রী দীপঙ্কর জানা এই নতুন ব্যবস্থার উদ্বোধন করেন। গবেষণা কেন্দ্র সূত্রে জানা গিয়েছে, গত প্রায় দশ বছর ধরে কাকদ্বীপের বিজ্ঞানীরা ইলিশ মাছকে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে লালন-পালন এবং চাষের উপযোগী করে তুলতে একাধিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে যাচ্ছেন। বিজ্ঞানীরা পুকুরে ইলিশ মাছ বাঁচিয়ে রাখা, তার বৃদ্ধি নিশ্চিত করা এবং ওজন বাড়ানোর ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছেন। এখনও পর্যন্ত পুকুরে চাষ করে সর্বোচ্চ ৯৮২ গ্রাম ওজনের ইলিশ উৎপাদন সম্ভব হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। তবে গবেষণার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে ইলিশের কৃত্রিম প্রজনন। অর্থাৎ ডিম থেকে সফলভাবে বাচ্চা ফোটানোর প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ করা। এই ধাপেই এতদিন পর্যন্ত সম্পূর্ণ সাফল্য আসেনি। কারণ ইলিশ একটি পরিযায়ী মাছ। জীবনের একটি বড় অংশ সমুদ্রে কাটালেও প্রজননের সময় এটি নদীর উজানে উঠে আসে। স্বাভাবিক পরিবেশে লবণাক্ত জল থেকে মিঠে জলে আসার যে জৈব পরিবর্তন ঘটে, সেটিকে কৃত্রিমভাবে তৈরি করাই বিজ্ঞানীদের কাছে সবচেয়ে কঠিন কাজ।এই সমস্যার সমাধানেই তৈরি হয়েছে অত্যাধুনিক স্যালিনিটি গ্রেডিয়েন্ট রিসার্কুলেটরি অ্যাকুয়াকালচার সিস্টেম। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে ধাপে ধাপে জলের লবণাক্ততার মাত্রা পরিবর্তন করা সম্ভব হবে, যা ইলিশের স্বাভাবিক পরিযায়ী পরিবেশের অনুকরণ করবে। বিজ্ঞানীদের মতে, এই কৃত্রিম পরিবেশ ইলিশের প্রজননে সহায়ক হতে পারে। ফলে ডিম ছাড়া এবং বাচ্চা ফোটানোর প্রক্রিয়ায় সাফল্যের সম্ভাবনা অনেকটাই বাড়বে বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা।
সুন্দরবন উন্নয়নমন্ত্রী দীপঙ্কর জানা বলেন, ইলিশ বাঙালির আবেগের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি মাছ। তাই পুকুরে ইলিশ চাষের এই গবেষণা সফল হলে তা শুধু বাংলার জন্য নয়, গোটা দেশের জন্য বড় সাফল্য হবে।
কাকদ্বীপ গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান বিজ্ঞানী ডক্টর দেবাশীষ দে জানান, গবেষণার প্রথম পাঁচটি ধাপে ইতিবাচক ফল মিলেছে। এখন শেষ ধাপ অর্থাৎ কৃত্রিম প্রজননে সফল হওয়াই মূল লক্ষ্য।
প্রায় ৬০ লক্ষ টাকা ব্যয়ে এই অত্যাধুনিক গবেষণা প্রকল্প নির্মাণ করা হয়েছে। গবেষকদের আশা, নতুন এই প্রযুক্তি শুধু ইলিশ চাষের ক্ষেত্রেই নয়, মাছ সংরক্ষণ এবং প্রজাতি রক্ষার ক্ষেত্রেও বড় ভূমিকা নেবে। ইলিশের প্রাকৃতিক প্রজনন ক্ষেত্র দিন দিন সংকুচিত হওয়ায় এই গবেষণা ভবিষ্যতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। সব মিলিয়ে কাকদ্বীপের এই গবেষণা এখন মৎস্য বিজ্ঞান জগতে বিশেষ আগ্রহের বিষয় হয়ে উঠেছে। ষষ্ঠ ধাপের গবেষণায় সাফল্য এলে বাঙালির পাতে ইলিশ আরও সহজলভ্য হওয়ার পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে মৎস্য চাষে নতুন ইতিহাস রচিত হবে।