ওঙ্কার ডেস্ক: রাজ্য বিধানসভায় বৃহস্পতিবার শুরু হল প্রথম বিজেপি সরকারের বাজেট অধিবেশন। রাজ্যপাল আর এন রবির ভাষণের মধ্য দিয়ে অধিবেশনের সূচনা হয়। অধিবেশনের প্রথম দিনেই সরকারের আগামী দিনের নীতি, অগ্রাধিকার এবং উন্নয়ন পরিকল্পনার এক বিস্তৃত রূপরেখা তুলে ধরেন রাজ্যপাল। তাঁর ভাষণে দুর্নীতি দমন, আইনশৃঙ্খলার উন্নতি, শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, কৃষি, নারী সুরক্ষা এবং অবৈধ অনুপ্রবেশ রোধের মতো একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে আসে।
রাজ্যপাল জানান, নতুন সরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হল রাজ্যে আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা। তিনি বলেন, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি রোধ, তোলাবাজি বন্ধ এবং প্রশাসনে স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনতে সরকার বদ্ধপরিকর। একই সঙ্গে অবৈধ অনুপ্রবেশ রোধে সরকার দায়বদ্ধ বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
নারী সুরক্ষার প্রসঙ্গেও বিশেষ গুরুত্ব দেন রাজ্যপাল। তিনি জানান, মহিলাদের বিরুদ্ধে অপরাধের ঘটনায় সরকার ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করবে। নারী নির্যাতন ও মানব পাচার রোধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি সরকারি জমির অবৈধ দখলদারি এবং বালি পাচারের মতো বেআইনি কার্যকলাপ বন্ধ করতেও প্রশাসন সক্রিয় ভূমিকা নেবে বলে আশ্বাস দেন তিনি।
রাজ্যের পরিকাঠামোগত উন্নয়ন নিয়েও বক্তব্য রাখেন রাজ্যপাল। তাঁর দাবি, বর্তমান সরকারের আমলে রেল ও মেট্রো প্রকল্পের কাজ দ্রুত গতিতে এগোচ্ছে। রাজ্যের বিভিন্ন রেল প্রকল্প বাস্তবায়নে সব ধরনের সহযোগিতা করবে সরকার। একই সঙ্গে তোলাবাজিমুক্ত পরিবেশ এবং সরকারি জমি দখলমুক্ত করার উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন তিনি।
কৃষি ও গ্রামীণ উন্নয়ন সম্পর্কেও একাধিক ঘোষণা করা হয়। রাজ্যপাল বলেন, কৃষকদের স্বার্থরক্ষায় সুবিধাজনক নীতি গ্রহণ করা হবে। জমি সংক্রান্ত বিষয়গুলির দ্রুত নিষ্পত্তি এবং উন্নয়নমূলক প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য উচ্চপর্যায়ের টাস্ক ফোর্স গঠন করা হয়েছে। মুখ্যসচিবের নেতৃত্বে প্রশাসনের শীর্ষ আধিকারিকরা সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজ করবেন বলেও জানান তিনি। ডিজিটাল ইন্ডিয়ার প্রসঙ্গ তুলে ধরে প্রশাসনিক কাজে প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধির ওপরও জোর দেন রাজ্যপাল। জনগণনার প্রয়োজনীয়তার কথাও তাঁর ভাষণে উঠে আসে।
শিল্প ও কর্মসংস্থানকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে রাজ্যপাল বলেন, সরকার পশ্চিমবঙ্গকে দেশের অন্যতম শিল্পোন্নত রাজ্যে পরিণত করতে চায়। দীর্ঘদিন ধরে অব্যবহৃত বা অকার্যকর অবস্থায় থাকা জমিগুলিকে পুনরুদ্ধার করে শিল্প প্রতিষ্ঠার কাজে ব্যবহার করা হবে। উপকূলীয় পরিবহণ, অন্তঃদেশীয় জলপথ পরিবহণ এবং মৎস্যচাষের উন্নয়নেও জোর দেওয়া হবে।
শিক্ষাক্ষেত্রে সংস্কারের আশ্বাস দিয়ে তিনি জানান, ছাত্র-শিক্ষক অনুপাতের উন্নতি, আধুনিক পরিকাঠামো সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার গড়ে তোলা এবং নিয়মিত টেট পরীক্ষার আয়োজনের মাধ্যমে নিয়োগ প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ ও গতিশীল করা হবে। পাশাপাশি উত্তরবঙ্গে একটি আইআইটি প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনার কথাও ঘোষণা করেন রাজ্যপাল। যুব সমাজের উদ্দেশে বার্তা দিয়ে তিনি বলেন, অতীতে বহু মেধাবী ছাত্রছাত্রীকে চাকরির সন্ধানে ভিনরাজ্যে যেতে হয়েছে। সেই পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটাতে রাজ্যে স্টার্টআপ হাব গড়ে তোলা হবে এবং বেকার যুবক-যুবতীদের বিভিন্নভাবে সহায়তা করা হবে। কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ তৈরির জন্য সরকার একাধিক উদ্যোগ গ্রহণ করবে বলেও জানান তিনি।
রাজ্যপাল তাঁর ভাষণে পরোক্ষে পূর্ববর্তী সরকারের সমালোচনাও করেন। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমবঙ্গের মানুষ কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন প্রকল্পের সুবিধা থেকে বঞ্চিত ছিলেন। নতুন সরকার সেই সমস্ত প্রকল্প কার্যকর করতে সর্বাত্মক চেষ্টা চালাবে। দার্জিলিংয়ের দীর্ঘদিনের গোর্খাল্যান্ড ইস্যু নিয়েও তিনি মন্তব্য করেন। সমস্ত পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে এই সমস্যার গ্রহণযোগ্য সমাধানের চেষ্টা করা হবে বলে আশ্বাস দেন।
এদিকে, বিধানসভার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্ব হিসেবে আগামী ২২ জুন ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের বাজেট পেশ করবেন রাজ্যের অর্থমন্ত্রী। ২৫ জুন পর্যন্ত চলবে বাজেট অধিবেশনের এই পর্ব। এরপর ৬ জুলাই সকাল ১১টায় ফের অধিবেশন বসবে। নতুন সরকারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেটকে ঘিরে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে ইতিমধ্যেই ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে।