ওঙ্কার ডেস্ক: তিস্তা নদীর জল নিয়ে ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে নতুন কোনও চুক্তি না হওয়ায় বিকল্প পথ হিসেবে চিনকে সেই দায়িত্বভার তুলে দিয়েছে ইউনূস সরকার। মূলত সেচ, বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং পানীয় জল সরবরাহের লক্ষ্যেই পরিকল্পনাটি তৈরি। বর্ষার অতিরিক্ত জল প্রস্তাবিত জলাধারে ধরে রেখে তা শুষ্ক মৌসুমে কাজে লাগানোই এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য। উত্তরবঙ্গ সীমান্ত সংলগ্ন রাজশাহী, রংপুর, চাপাইনবাবগঞ্জ সহ একাধিক জেলায় দীর্ঘমেয়াদি এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হবে। উল্লেখ্য এই পরিকল্পনা দিল্লি সামলাক এমনটাই চেয়েছিলেন হাসিনা সরকার। ইউনূস সরকারের এহেন সিদ্ধাতে চিন্তা বাড়াল নয়া দিল্লির।
বাংলাদেশের বহু আলোচিত তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে মহম্মদ ইউনুসের এই পদক্ষেপে বহুমুখী নদী পরিকল্পনার কাজ এগিয়ে নিতে চীনের অর্থ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। ইতিমধ্যেই প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ের জন্য বেজিংকে চিঠি পাঠিয়েছে ঢাকা। প্রথম ধাপে খরচ ধরা হয়েছে প্রায় ৯ হাজার ১৫০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৬ হাজার ৭০০ কোটি টাকার আর্থিক সহায়তা চেয়ে চিঠি পাঠিয়েছেন বাংলাদেশের পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ। তবে চীনের দীর্ঘস্থায়ী উপস্থিতি ভারতের নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে বলে মনে করছেন আঞ্চলিক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের অনেকে। কারণ, এই প্রকল্পায়ানের এলাকা ভারতের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ চিকেন নেক করিডর ও হাসিমারা সামরিক ঘাঁটির খুব বেশি দূরে নয়। ফলে নয়াদিল্লির উদ্বেগও বেড়েছে।
এই প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে বহু দিন ধরেই ভারত ও চীনের মধ্যে অদৃশ্য প্রতিযোগিতা চলছিল। এক পর্যায়ে ভারত ও জাপান যৌথভাবে এটি বাস্তবায়নের প্রস্তাব দিয়েছিল। এমনকি ক্ষমতা হারানোর কিছুদিন আগে বেজিং সফর শেষে শেখ হাসিনা প্রকাশ্যে বলেছিলেন, তিনি চান ভারত এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করুক। ভারতীয় সেচ ইঞ্জিনিয়ারদের একটি দল বাংলাদেশ সফরে আসার প্রস্তুতিও নিয়েছিল। কিন্তু ৫ অগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর চিত্রটাই আমূল বদলে যায়।
চলতি বছরের মার্চে চীন সফরে গিয়ে এই প্রকল্পকে অগ্রাধিকার দেন প্রধান উপদেষ্টা ইউনুস। বেজিংয়ে চীনের সেচমন্ত্রী সঙ্গে তাঁর বৈঠকও হয়। পাশাপাশি বিএনপি-র শীর্ষ নেতৃত্বও সক্রিয়ভাবে চীন-ঘনিষ্ঠ অবস্থান নেয়। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগির ও মঈন খানের নেতৃত্বে বিএনপি নেতাদের সাম্প্রতিক বেজিং সফরে তিস্তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। দলের পক্ষ থেকে চীনকে আশ্বাস দেওয়া হয়, তারা ক্ষমতায় ফিরলে দ্রুত এই প্রকল্প বেজিংয়ের হাতে তুলে দেওয়া হবে।
এদিকে ঢাকায় নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূতও তিস্তা প্রসঙ্গে ক্রমশ সক্রিয় হয়ে উঠেছেন। বিএনপি, জামাত ও এনসিপি নেতাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে তিনি সম্ভাব্য রাজনৈতিক পালাবদলের দিকে তাকিয়ে আছেন। ফলে তিস্তা মহাপরিকল্পনা এখন শুধু একটি জল ব্যবস্থাপনা প্রকল্প নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে চীন, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে এক নতুন কৌশলগত লড়াইয়ের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
