ওঙ্কার ডেস্ক: ২১ জুলাই তৃণমূল কংগ্রেসের কাছে শুধুমাত্র ‘শহিদ দিবস’ নয়, বাংলার রাজনীতিতে এক ধরনের রাজনৈতিক শক্তি সঞ্চয়ের দিনও বটে। ২৭ বছর আগে বামবিরোধিতা আর ‘লড়াইয়ের নেত্রী’ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে আন্দোলনের জন্ম দিয়েছিলেন, তার মূল চালিকাশলাই ছিল সিপিএমের বিরুদ্ধে ক্ষোভ, বঞ্চনা আর রক্তাক্ত অভিজ্ঞতা। কিন্তু ১৪ বছরেরও বেশি শাসনের পরে সেই আবেগ ক্রমশ ফিকে হয়েছে। সিপিএমের ‘লাল দুর্গ’ ভেঙে চুরমার, নতুন প্রজন্মের কাছে সিপিএমের শাসন অনেকটাই ইতিহাস। সেই শূন্যস্থান পূরণে তৃণমূল এখন নতুন ‘আবেগ-অস্ত্র’ খুঁজে নিচ্ছে আর সেটিই হলো কেন্দ্রের বিরুদ্ধে ‘বাংলা’ ও ‘বাঙালি’ পরিচয়ের রাজনীতি।
এবারের শহিদ মঞ্চে উত্তম কুমার ব্রজবাসীর উপস্থিতির কথা তারই স্পষ্ট ইঙ্গিত। কোচবিহারের রাজবংশী সম্প্রদায়ের এই মানুষটির পরিচিতি, ভোটার কার্ড, আধার সব কিছু থাকলেও এনআরসি নোটিশে ‘বিদেশি’ তকমা জুটেছে তাঁর কপালে। ঘটনা ঘটেছে অসমের ফরেনার্স ট্রাইবুনালে। এটি সামনে রেখে তৃণমূলের রাজনৈতিক বার্তা স্পষ্ট, বাংলা সীমান্তের মানুষও যদি বহিরাগত বলে চিহ্নিত হতে পারেন, বিজেপি ক্ষমতায় এলে বাংলায় এনআরসি চাপানোই হবে।এমনই ভয় দেখাতে চাইছে তৃণমূল এদিন মঞ্চে। মমতা আর অভিষেকের প্রতিক্রিয়া সেই আভাসই আরও জোরদার করেছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন এটা গণতন্ত্রের উপর ‘পরিকল্পিত আঘাত’। অভিষেকের অভিযোগ বিজেপি বাংলায় ক্ষমতায় না থাকলে জোর করে এনআরসি চাপাতে চাইছে। অর্থাৎ, বাংলার মানুষের মধ্যে আবারও সেই বহিরাগত বনাম বাঙালি চেতনা জাগানোর চেষ্টা শুরু। আর এটাই হতে পারে ছাব্বিশের ভোটের চূড়ান্ত রণকৌশল।
২০১৯ থেকে ২০২১ পর্যন্ত তৃণমূল একাধিকবার ‘বহিরাগত’ বনাম ‘আপনজন’ এই অস্ত্র ব্যবহার করেছে। ‘বাংলা নিজের মেয়েকেই চায়’ স্লোগান একুশের ভোটে কার্যত বিজেপিকে ‘বহিরাগত’ পার্টি হিসেবে দাগিয়ে দিয়েছিল। চব্বিশে লোকসভা ভোটে আবার স্লোগান উঠেছিল ‘বাংলা বিরোধীদের বিসর্জন’। এক কথায়, যখনই তৃণমূলের সরকার বিরোধিতা তুঙ্গে ওঠে, প্রশাসনিক ব্যর্থতা বা দুর্নীতির অভিযোগে মানুষ ক্ষুব্ধ হয়, তখনই দলের রাজনৈতিক ভাষ্য ঘুরে দাঁড়ায় ‘বাঙালিয়ানা’ রক্ষার লড়াইতে। একটানা ক্ষমতা থাকলে আর্থিক অস্বচ্ছতা, দুর্নীতি, স্বজনপোষণ এসব অভিযোগ অজান্তেই জমে ওঠে। ফলে সেই ক্ষোভের মুখ ঘোরাতে বা মানুষের মনোযোগ অন্য দিকে ফেরাতে একটা বৃহৎ আবেগের আশ্রয় প্রয়োজন হয়। ‘বাংলা’ আর ‘বাঙালি’ ঠিক সেই জায়গাটিই পূরণ করছে।
বিগত কয়েক মাস ধরে নির্বাচন কমিশন ভোটার তালিকা সংশোধনের বিশেষ অভিযান চালাচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটাই তৃণমূলের নতুন ভয়, বাংলার লাখ লাখ পরিযায়ী শ্রমিক, দারিদ্র সীমার নিচে থাকা মানুষ, সীমান্ত অঞ্চলের নাগরিকদের মধ্যে বহু মানুষের কাগজপত্র ঠিক নেই, ফলে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ যাওয়ার শঙ্কা প্রবল। তৃণমূল ঠিক সেখানেই ইস্যু খুঁজে নিয়েছে এই সংশোধন যেন বাংলার মানুষের নাগরিক অধিকার কেড়ে নেওয়ার চক্রান্ত। সেই ভয় দেখিয়ে তৃণমূল চাইছে নতুন করে মানুষের আবেগকে চাঙা রাখতে। হতে পারে, একুশের মঞ্চ থেকেই দিল্লি অভিযানের ডাকও শোনা যাবে যাতে কেন্দ্রকে চাপ দেওয়া যায়, আবারও বাংলা বনাম দিল্লি লড়াইয়ের বাতাবরণ তৈরি হয়।
২৭ বছর আগে যে তৃণমূল কংগ্রেসের জন্ম হয়েছিল একটিমাত্র শত্রুর বিরুদ্ধে। সেই বাম শিবির আজ অস্তিত্ব বাঁচাতে লড়াই করছে। নতুন শত্রু বিজেপি, আর নতুন অস্ত্র ‘বাংলা ও বাঙালি’। এনআরসি, ভোটার তালিকা সংশোধন, সীমান্ত অঞ্চলের অনুপ্রবেশ বিতর্ক সবই সেই আবেগকে সঙ্গত করছে। ২১ জুলাইয়ের মঞ্চ থেকে মমতা আর অভিষেক তাই শুধু শহিদ স্মরণে থামবেন না। ছাব্বিশের ভোটের জন্য বাংলা ও বাঙালির চেতনা ঘিরে নতুন এক আন্দোলনের রূপরেখা দিতেই পারেন যেটি হবে দিল্লির বিরুদ্ধে, তৃণমূলের কথায় বহিরাগত শক্তির বিরুদ্ধে। আর সেই লড়াইতে উঠে আসবেন উত্তম কুমার ব্রজবাসীর মতো নিরীহ মানুষ যিনি হয়ে যাবেন নতুন রাজনৈতিক কৌশলের জীবন্ত প্রতীক।
