ওঙ্কার ডেস্ক: ২১ জুলাই ১৯৯৩ সালের ধর্মতলা পুলিশ গুলিকাণ্ডের তদন্তে গঠিত বিচারপতি সুশান্ত চট্টোপাধ্যায় কমিশনের রিপোর্টকে কেন্দ্র করে রাজ্যের রাজনীতিতে নতুন করে বিতর্কের সূত্রপাত হয়েছে। শহিদ দিবসের ঠিক একদিন আগে বিধানসভায় বিষয়টি উত্থাপন করে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী দাবি করেছেন, এত গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘটনার তদন্ত হলেও তৎকালীন যুব কংগ্রেস নেত্রী তথা বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাক্ষ্যই কমিশন গ্রহণ করেনি। তাঁর অভিযোগ, যে আন্দোলনের নেতৃত্বে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন এবং যে ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রতি বছর ২১ জুলাই শহিদ দিবস পালন করা হয়, সেই ঘটনার অন্যতম প্রধান সাক্ষীর বক্তব্য ছাড়াই তদন্ত শেষ করা হয়েছে।
বিধানসভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে শুভেন্দু অধিকারী বলেন, তদন্ত কমিশনের রিপোর্টে একাধিক ব্যক্তির সাক্ষ্য লিপিবদ্ধ থাকলেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্য সেখানে নেই। তাঁর দাবি, একটি বিচারবিভাগীয় তদন্তের ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষভাবে ঘটনায় যুক্ত ব্যক্তিদের সাক্ষ্য গ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অথচ সেই প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে বলেই তাঁর অভিযোগ। মুখ্যমন্ত্রীর মতে, এতে কমিশনের তদন্তের পূর্ণতা এবং নিরপেক্ষতা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে। শুভেন্দু অধিকারী আরও দাবি করেন, দীর্ঘদিন ধরে এই কমিশনের রিপোর্ট জনসমক্ষে আনা হয়নি। অবশেষে রিপোর্টটি প্রকাশ্যে আসার পর তিনি এর বিভিন্ন দিক নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর বক্তব্য, শুধু রিপোর্ট প্রকাশ করাই যথেষ্ট নয়, তদন্তের সময় কীভাবে সাক্ষ্য সংগ্রহ করা হয়েছে, কারা সাক্ষ্য দিয়েছেন এবং কেন কিছু গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির বক্তব্য নেওয়া হয়নি, সেই বিষয়গুলিও স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। তিনি বলেন, একটি ঐতিহাসিক এবং বহুল আলোচিত ঘটনার প্রকৃত সত্য উদঘাটনের জন্য তদন্তে কোনও গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীকে বাদ দেওয়া উচিত ছিল না।
প্রসঙ্গত, ১৯৯৩ সালের ২১ জুলাই তৎকালীন যুব কংগ্রেসের ডাকা মহাকরণ অভিযানের সময় ধর্মতলায় পুলিশের গুলিতে ১৩ জন আন্দোলনকারীর মৃত্যু হয়। সেই ঘটনাকে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে ধরা হয়। পরবর্তীকালে রাজ্যে তৃণমূল কংগ্রেস সরকার ক্ষমতায় আসার পর ওই গুলিকাণ্ডের তদন্তের জন্য বিচারপতি সুশান্ত চট্টোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে এক সদস্যের তদন্ত কমিশন গঠন করা হয়। দীর্ঘ তদন্তের পর কমিশন সরকারকে রিপোর্ট জমা দেয়। এই ঘটনাকে ঘিরে প্রতিবছর ২১ জুলাই তৃণমূল কংগ্রেস শহিদ দিবস পালন করে। সেই আবহেই কমিশনের রিপোর্ট এবং তা নিয়ে শুভেন্দু অধিকারীর মন্তব্য রাজনৈতিক মহলে নতুন করে বিতর্ক উসকে দিয়েছে। বিশেষ করে শহিদ দিবসের ঠিক আগের দিন এই রিপোর্ট পেশ করা নিয়ে বিতর্ক তুঙ্গে।
রাজ্যে পালা বদলের পর ভরাডুবি হয় মমতার তৃণমূল। বিজয়ী ৮০ জন বিধায়কদের মধ্যে ৬০ জন ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে মমতা থেকে নিজেদের আলাদা করে ‘আসল তৃণমূল’ বলে পরিচয় দেয়। পরে মমতা ঘনিষ্ট আরও অনেক বিধায়ক, সাংসদ প্রাক্তন মন্ত্রী হাত ছেড়েছে কালীঘাটের। কেউ যোগ দিয়েছে বিজেপিতে, কেউ ভিড়েছে ঋতব্রতদের দলে, কেউ আবার এইসব থেকে দূরে বেনামী দলে নিজেদের নাম লিখিয়েছেন। কিন্তু এই ভাঙনের মধ্যে মিল একটাই, প্রত্যেকে নিজেদের মত ‘শহিদ দিবস’ পালন করার কথা জানিয়েছে। অনুমতিও মিলেছে আলাদা আলাদা ভাবে। বর্তমান রাজ্য রাজনীতির প্রেক্ষাপটে শহিদ দিবসের আগে বিজেপি সরকারের এই রিপোর্ট পেশ সম্ভবতই এক বড়সড় আঘাত তৃণমূল সুপ্রিমোর কাছে।