নিজস্ব প্রতিনিধি : গণতন্ত্রের উৎসব নির্বাচন। কিন্তু এই উৎসব ঘিরেই বারবার উঠে আসে অশান্তি, রক্তক্ষয়ের ছবি। ভোট মানেই যেন হিংসা, সংঘর্ষ, অশান্তি—এই ধারণা ক্রমশ গভীর হচ্ছে মানুষের মনে। এই প্রেক্ষাপটে লেখক অরিন্দম দাসের কথায় উঠে আসে সেই তীব্র যন্ত্রণা— “চাই না এমন নির্বাচন, চাই না এমন ভোট, যেখানে মানুষেরা নয় এক জোট…”
এই লাইন যেন আজকের বাস্তবতাকেই প্রতিফলিত করে। প্রতিটি নির্বাচন এলেই কোথাও না কোথাও ঝরে রক্ত। রাজনৈতিক সংঘর্ষে প্রাণ হারান বহু মানুষ। অসংখ্য পরিবার হারায় তাদের প্রিয়জনকে—কেউ স্বামীহারা, কেউ সন্তানহারা, আবার কত শিশু হয়ে পড়ে অনাথ। গণতন্ত্রের এই উৎসব যেন অনেক সময় পরিণত হয় শোকের মিছিলে। এই পরিস্থিতির পরিবর্তন চাইছেন পূর্ব বর্ধমানের এক বাউল শিল্পী—স্বপন দত্ত। তিনি নিজেকে তুলে ধরেছেন ‘শান্তির দূত’ হিসেবে। হাতে একতারা, কণ্ঠে বাউল গান—এই নিয়েই তিনি গ্রামে-গঞ্জে, মেঠোপথে, এমনকি নদীপথেও ঘুরে বেড়িয়ে ছড়িয়ে দিচ্ছেন শান্তির বার্তা। তাঁর লক্ষ্য একটাই—অবাধ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন।
সম্প্রতি দক্ষিণ ২৪ পরগনার বন্দর শহর ডায়মন্ডহারবারে তাঁর এই অভিনব প্রচার নজর কেড়েছে সকলের। শহরের নদীর ধারে, রেলস্টেশনে, ব্যস্ত বাজারে—সব জায়গাতেই পৌঁছে যাচ্ছেন তিনি। মানুষের ভিড়ের মধ্যেই শুরু করছেন তাঁর গান। আর সেই গানের মধ্য দিয়েই তুলে ধরছেন ভোটের গুরুত্ব এবং শান্তিপূর্ণ অংশগ্রহণের প্রয়োজনীয়তা।
স্বপন দত্তের কথায়, “একটি ভোটের মূল্য অনেক। তাই শান্তিপূর্ণভাবে ভোট দিন। হিংসা, হানাহানি, বোমাবাজি থেকে দূরে থাকুন। সকাল সকাল লাইনে দাঁড়িয়ে নিজের ভোট নিজে দিন।” তাঁর এই সরল অথচ শক্তিশালী বার্তা সাধারণ মানুষের মনে দাগ কাটছে।
২০২৩ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনের সময় রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় হিংসার ঘটনা গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল তাঁকে। সেই সময় থেকেই তিনি সিদ্ধান্ত নেন, গানের মাধ্যমে মানুষকে সচেতন করবেন। শুধু একটি এলাকা নয়—পাহাড় থেকে সাগর, রাজ্যের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটে বেড়াচ্ছেন তিনি। ইতিমধ্যেই ২৩টি জেলায় তাঁর এই প্রচার পৌঁছে গিয়েছে।
স্বপন দত্ত শুধুই একজন শিল্পী নন, তিনি একজন সমাজ সচেতন মানুষ। ২০১৬ সালে সমাজসেবামূলক কাজের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি রাষ্ট্রপতির পুরস্কার পান। সেই সম্মান তাঁকে আরও বেশি দায়িত্বশীল করে তুলেছে। তিনি বিশ্বাস করেন, একজন শিল্পীর দায়িত্ব শুধু বিনোদন দেওয়া নয়, সমাজকে সঠিক পথে চালিত করাও।
তাঁর গানের মধ্যে উঠে আসে গণতন্ত্রের মূল মূল্যবোধ—সমতা, স্বাধীনতা এবং ভ্রাতৃত্ব। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “ধর্ম, জাতি, বর্ণের ভেদাভেদ করে ভোট দেওয়া চলবে না। গণতন্ত্রের উপর আস্থা রাখতে হবে। প্রত্যেক ভোটারকে নিজের দায়িত্ব বুঝতে হবে।” ডায়মন্ডহারবারের মানুষও তাঁর এই উদ্যোগকে সাদরে গ্রহণ করেছেন। অনেকেই তাঁর সঙ্গে গলা মিলিয়েছেন, কেউ বা দাঁড়িয়ে শুনেছেন তাঁর গান। এইভাবেই এক অনন্য পরিবেশ তৈরি হয়েছে—যেখানে রাজনীতি নয়, মানবিকতা জায়গা করে নিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের উদ্যোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, শুধুমাত্র প্রশাসনের কঠোরতা দিয়ে নয়, সমাজের মানসিক পরিবর্তনের মাধ্যমেই হিংসামুক্ত নির্বাচন সম্ভব। স্বপন দত্ত সেই পরিবর্তনেরই একজন পথিকৃত। তিনি আরও বলেন, “নির্বাচন কমিশনকে আরও কঠোর হতে হবে, প্রশাসনকে দায়িত্ব পালন করতে হবে। কিন্তু তার পাশাপাশি সাধারণ মানুষকেও সচেতন হতে হবে। কেউ যদি হিংসা ছড়াতে চায়, তাহলে তাকে প্রতিহত করতে হবে।”
আজকের দিনে যখন রাজনৈতিক মেরুকরণ চরমে, তখন স্বপন দত্তের এই উদ্যোগ এক নতুন দিশা দেখাচ্ছে। তাঁর গানের সুরে যেমন আছে মাটির গন্ধ, তেমনই আছে পরিবর্তনের আহ্বান। গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তি লুকিয়ে আছে সাধারণ মানুষের হাতে। সেই শক্তিকে সঠিকভাবে ব্যবহার করাই হল একজন সচেতন নাগরিকের দায়িত্ব। আর সেই দায়িত্বের কথাই বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছেন স্বপন দত্ত। ভোট শুধুমাত্র একটি রাজনৈতিক প্রক্রিয়া নয়, এটি একটি সামাজিক দায়িত্ব। সেই দায়িত্ব পালন করতে গেলে প্রয়োজন শান্তি, সহমর্মিতা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ।
স্বপন দত্তের বাউল সুর যেন সেই বার্তাই ছড়িয়ে দিচ্ছে— রক্ত নয়, চাই শান্তি। হিংসা নয়, চাই গণতন্ত্রের জয়।
আর হয়তো এই সুরেই একদিন বদলে যাবে ভোটের ছবি। উৎসব হবে সত্যিকারের উৎসব, যেখানে থাকবে না ভয়, থাকবে না রক্তপাত—থাকবে শুধু মানুষের অংশগ্রহণ আর গণতন্ত্রের জয়গান।