ওঙ্কার ডেস্ক: প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা সিবিআইয়ের পেশ করা চূড়ান্ত চার্জশিটে উঠে এসেছে ঘুষের টাকা সংগ্রহ ও কলকাতায় পৌঁছে দেওয়ার এক সুসংগঠিত চক্রের অভিযোগ। তদন্তকারীদের দাবি, রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে চাকরিপ্রার্থীদের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা ঘুষ হিসেবে সংগ্রহ করা হত। পরে সেই বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ বীরভূম থেকে কলকাতায় নিয়ে এসে প্রাক্তন প্রাথমিক শিক্ষা পর্ষদের সভাপতি মানিক ভট্টাচার্যের কাছে পৌঁছে দেওয়া হত। এই গোটা প্রক্রিয়ায় একাধিক ব্যক্তি ও একটি বিস্তৃত এজেন্ট নেটওয়ার্ক সক্রিয় ছিল বলে চার্জশিটে উল্লেখ করা হয়েছে।
সিবিআইয়ের দাবি, বীরভূম জেলার নলহাটি-২ ব্লকের তৎকালীন তৃণমূল ব্লক সভাপতি বিভাস অধিকারী এই চক্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন। একই সঙ্গে তিনি ‘অল বেঙ্গল টিচার্স ট্রেনিং অ্যাচিভার্স অ্যাসোসিয়েশন’-এর সহকারী সচিব হিসেবেও যুক্ত ছিলেন। তদন্তে উঠে এসেছে, তাঁর নেতৃত্বে রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় একাধিক সাব-এজেন্ট নিয়োগ করা হয়েছিল। এই এজেন্টদের মাধ্যমে উত্তর দিনাজপুর, মালদহ, মুর্শিদাবাদ, পূর্ব মেদিনীপুর, হাওড়া-সহ বিভিন্ন জেলা থেকে শিক্ষকতার চাকরির আশায় থাকা প্রার্থীদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা সংগ্রহ করা হত। চাকরি পাইয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে এই অর্থ নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ।
চার্জশিট অনুযায়ী, ঘুষের টাকা সংগ্রহের পাশাপাশি চাকরিপ্রার্থীদের বিভিন্ন নথিপত্রও একটি নির্দিষ্ট জায়গায় জমা করা হত। তদন্তে জানা গিয়েছে, বীরভূমের কৃষ্ণপুর এলাকার একটি আশ্রমকে এই কাজে ব্যবহার করা হত। সেখানে নগদ অর্থ ও নথি একত্রিত করে বড় বড় বস্তায় ভরা হত। পরে সেই বস্তাগুলি বিভাস অধিকারীর ব্যবহৃত একটি কালো রঙের স্করপিও গাড়িতে তোলা হতো। সেখান থেকে প্রায় ২০০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে কলকাতার যাদবপুরে পৌঁছত গাড়িটি। সিবিআইয়ের অভিযোগ, সেখানে মানিক ভট্টাচার্যের বাড়ি বা তাঁর ব্যবহৃত ঠিকানায় ওই বস্তাগুলি পৌঁছে দেওয়া হত। তদন্তকারীরা দাবি করেছেন, এই ধরনের যাতায়াত একবার বা দু’বার নয়, অন্তত ১৪ থেকে ১৫ বার হয়েছে। প্রতিবার একটি বা একাধিক বস্তায় ২০ থেকে ৩০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত নগদ অর্থ থাকত বলে চার্জশিটে উল্লেখ রয়েছে। অর্থাৎ, দীর্ঘ সময় ধরে একই পদ্ধতিতে বিপুল পরিমাণ ঘুষের টাকা কলকাতায় পৌঁছে দেওয়া হয়েছে বলে সিবিআইয়ের অভিযোগ।
তদন্তে বিভাস অধিকারীর বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে গুরুত্বপূর্ণ নথিও উদ্ধার হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। তার মধ্যে একটি সবুজ রঙের রেজিস্টারে বিভিন্ন সাব-এজেন্টের মাধ্যমে কার কাছ থেকে কত টাকা নেওয়া হয়েছে, তার বিস্তারিত হিসাব লেখা ছিল বলে সিবিআই জানিয়েছে। সেই নথি বিশ্লেষণ করে তদন্তকারীদের দাবি, প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে ২৪৬ জন চাকরিপ্রার্থীর কাছ থেকে এবং উচ্চ প্রাথমিক স্তরের নিয়োগের জন্য ৩৩০ জনের কাছ থেকে মোট ৩৫ কোটি ১৯ লক্ষ টাকারও বেশি সংগ্রহ করা হয়েছিল। এছাড়াও একটি লাল রঙের খাতা উদ্ধার হয়েছে বলে তদন্তকারীরা জানিয়েছেন। সেই খাতায় আরও ৮৮ জন চাকরিপ্রার্থীর কাছ থেকে প্রায় ১ কোটি ৯ লক্ষ টাকা নেওয়ার হিসাব পাওয়া গিয়েছে বলে চার্জশিটে উল্লেখ রয়েছে। এই সমস্ত হিসাবপত্রকে তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরেছে সিবিআই। তদন্তকারীদের দাবি, নথিগুলিতে বিভিন্ন ব্যক্তির নাম, প্রদেয় অর্থের পরিমাণ এবং লেনদেন সংক্রান্ত তথ্য লিপিবদ্ধ ছিল।
চার্জশিটে শুধু শিক্ষক নিয়োগ নয়, ডিএলএড ও বিএড কলেজগুলির রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়াতেও অনিয়মের অভিযোগ তোলা হয়েছে। সিবিআইয়ের দাবি, ডিএলএড কোর্সের অফলাইন রেজিস্ট্রেশনের জন্য কলেজগুলিকে ছাত্রপিছু ৫ হাজার টাকা করে আদায় করতে বলা হতো। পাশাপাশি অতিরিক্ত ১ হাজার টাকা একটি নির্দিষ্ট সংগঠনের তহবিলে জমা দেওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ। তদন্তকারীদের মতে, এই অর্থ সংগ্রহের ক্ষেত্রেও একটি পরিকল্পিত ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছিল। এছাড়া বেসরকারি বিএড ও ডিএলএড কলেজগুলির মালিকদের সঙ্গে বৈঠক করে এমন চাকরিপ্রার্থীদের তালিকা তৈরি করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, যাঁরা ঘুষ দিতে ইচ্ছুক। সেই তালিকা অনুযায়ী প্রার্থীদের কাছ থেকে টাকা সংগ্রহ করা হত এবং তাঁদের প্রাথমিক বা উচ্চ প্রাথমিক স্তরে চাকরি পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হত বলে চার্জশিটে দাবি করা হয়েছে। তদন্তে একাধিক সাক্ষীর বয়ান, উদ্ধার হওয়া নথি এবং অন্যান্য তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতেই এই অভিযোগগুলি করা হয়েছে বলে জানিয়েছে সিবিআই।
প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় মানিক ভট্টাচার্যকে আগেই গ্রেফতার করেছিল সিবিআই। দুর্নীতির অভিযোগ সামনে আসার পর তাঁকে প্রাথমিক শিক্ষা পর্ষদের সভাপতির পদ থেকেও অপসারণ করা হয়। বর্তমানে তিনি জামিনে মুক্ত রয়েছেন। সিবিআইয়ের এই চূড়ান্ত চার্জশিটে তাঁর বিরুদ্ধে এবং অভিযুক্ত অন্যদের বিরুদ্ধে একাধিক গুরুতর অভিযোগের উল্লেখ করা হয়েছে।