নিজস্ব সংবাদদাতা, নদিয়া :
শ্মশান থেকে ফিরেই মৃত্যু—এমন ঘটনাকে ঘিরে গ্রামবাংলায় আজও অনেকেই একে ‘ভূতের কীর্তি’ বলে ব্যাখ্যা করতে চান। বুধবার নবদ্বীপ শ্মশান থেকে ফেরার পথে এক ব্যক্তির অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনাও প্রথমে তেমনই আতঙ্ক ও কৌতূহলের জন্ম দেয় এলাকায়। তবে প্রশাসন ও চিকিৎসকদের মতে, এর পেছনে কোনও অতিপ্রাকৃত ঘটনা নয়, বরং শারীরিক অসুস্থতা, মদ্যপান ও দুর্ঘটনাজনিত কারণই মূল সূত্র হতে পারে।
নদিয়া জেলার কৃষ্ণনগর কোতোয়ালি থানার দোগাছিয়া গ্রাম পঞ্চায়েতের খাল বোয়ালিয়া দাসপাড়ার বাসিন্দা সুফল দাস (৫২) বুধবার নবদ্বীপ শ্মশানে এক প্রতিবেশীর মৃতদেহ দাহ করতে যান এলাকার আরও কয়েকজনের সঙ্গে। শ্মশান থেকে ফেরার পথে তিনি সবার অলক্ষ্যে সুশান্ত দাস নামে এক ব্যক্তির টোটোতে ওঠেন বলে জানা যায়। অন্যরা বাড়ি ফিরে এলেও সুফল দাস বাড়ি না ফেরায় পরিবার ও প্রতিবেশীরা তাঁর খোঁজখবর শুরু করেন।
কিছু সময় পর রাস্তায় টহলরত পুলিশ কৃষ্ণনগর কোতোয়ালি থানার অন্তর্গত জালালখালি রোডের পাশে অচৈতন্য অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে সুফল দাসকে উদ্ধার করে শক্তিনগর জেলা হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে তাঁর অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাঁকে কলকাতায় স্থানান্তরিত করা হয়। তবে শেষরক্ষা হয়নি—চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।
এই মৃত্যুকে ঘিরে নতুন করে রহস্য দানা বাঁধে। মৃতের পরিবারের অভিযোগ, টোটো চালক সুশান্ত দাস কোনও না কোনওভাবে সুফল দাসকে মারধর করে খুন করেছে। তাঁদের দাবি, সুস্থ মানুষ হঠাৎ এমনভাবে রাস্তায় পড়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে পারে না। এ ঘটনায় কৃষ্ণনগর কোতোয়ালি থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন মৃতের পরিবার।

অন্যদিকে পুলিশের প্রাথমিক বক্তব্য, মৃত্যুর সঠিক কারণ এখনও স্পষ্ট নয়। তদন্তে জানা গিয়েছে, সুফল দাস ও টোটো চালক দু’জনেই মদ্যপ অবস্থায় ছিলেন। পুলিশের অনুমান, চলন্ত টোটো থেকে অসাবধানতাবশত পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। আবার মারধরের অভিযোগও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট পাওয়ার পরই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানা যাবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
চিকিৎসকদের মতে, শ্মশান থেকে ফেরার পথে মানসিক চাপ, শারীরিক দুর্বলতা ও অতিরিক্ত মদ্যপানের ফলে স্ট্রোক বা হার্ট অ্যাটাকের মতো ঘটনা ঘটতেও পারে। ফলে ‘ভূতের কীর্তি’ বলে যে গুজব ছড়াচ্ছে, তার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই বলেই মত বিশেষজ্ঞদের।
তবে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকায় চরম উত্তেজনা ও শোকের আবহ তৈরি হয়েছে। একদিকে রহস্যমৃত্যু, অন্যদিকে পরিবারের খুনের অভিযোগ—সব মিলিয়ে পুরো বিষয়টি এখন পুলিশি তদন্তের আওতায়।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—সুফল দাসের মৃত্যু কি নিছক দুর্ঘটনা, না কি এর পেছনে রয়েছে কোনও অপরাধমূলক ঘটনা? সেই উত্তর মিলবে তদন্ত ও ময়নাতদন্ত রিপোর্টের পরই। আপাতত ‘ভূতের কীর্তি’ নয়, বাস্তব ও বৈজ্ঞানিক কারণের খোঁজেই এগোচ্ছে প্রশাসন।