প্রিয়জনের অঙ্গদানে সম্মতি দিয়েছিল পরিবার। কিন্তু তীরে এসে তরী ডুবল। বাঘের হামলায় ‘ব্রেনডেড’ হওয়া আজিজের অঙ্গদানের আগেই থামল হৃদযন্ত্র। ফলে এখন তাঁর কর্নিয়া ছাড়া আর কিছুই এখন নেওয়া যাবে না।
গত ২ সেপ্টেম্বর সুন্দরবনে মাছ ধরতে গিয়ে বাঘের হামলায় গুরুতর জখম হয়েছিলেন দক্ষিণ ২৪ পরগনার কুলতলির মৎস্যজীবী আজিজ মোল্লা। কলকাতার এসএসকেএম হাসপাতালের ট্রমা কেয়ারে চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি। কিন্তু বাঁচানো যায়নি তাঁকে। আজিজের ‘ব্রেন ডেথ’ হয়েছে বলে জানান চিকিৎসকরা। মুহূর্তে কান্নায় ভেঙে পড়ে পরিবার। কিন্তু শোক সামলেই নজিরবিহীন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তাঁরা। প্রিয়জনের অঙ্গদানে সম্মতি দিয়েছিলেন আজিজের পরিবার।
সেইমত প্রস্তুতিও শুরু করেছিল চিকিৎসকরা। মঙ্গলবার স্বামীর অঙ্গদানের সম্মতিপত্রে সই করেছিলেন তাঁর স্ত্রী তসলিমা। পরিবারের সম্মতি পাওয়ার পরেই মঙ্গলবার রাত থেকে আজিতের দেহ থেকে অঙ্গ সংগ্রহের প্রক্রিয়া শুরুও হয়। আজিতের যকৃৎ, কিডনি, কর্নিয়া সংগ্রহ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। আশা ছিল, কোনও গ্রহীতার জীবন বাঁচানোর কাজে ব্যবহৃত হতে পারে আজিতের অঙ্গ। তবে শেষপর্যন্ত তা সম্ভব হল না। অস্ত্রোপচারের টেবিলে হৃদ্যন্ত্র স্তব্ধ হয়ে যায় ৩৬ বছরের যুবকের।
জানা যায়, বাঘের মুখ থেকে তাঁকে কোনরকমে বাঁচিয়েছিলেন আজিজের সঙ্গে থাকা ৩-৪ জন মৎস্যজীবীরা। এরপর তাঁকে স্থানীয় একটি চিকিৎসাকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। পরে শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় দ্রুত কলকাতার এসএসকেএম হাসপাতালের ট্রমা কেয়ারে স্থানান্তরিত করা হয়। সেখানে মেডিক্যাল বোর্ড গঠন করে জরুরি ভিত্তিতে চিকিৎসা শুরু করেন চিকিৎসকরা। উন্নত চিকিৎসার জন্য বাইরের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরাও চিকিৎসা প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয়েছিলেন বলে জানা যায়। কিন্তু দু’দিন ধরে একাধিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও অস্ত্রোপচারের পরও শেষরক্ষা হয়নি। গত শুক্রবার চিকিৎসকরা পরিবারকে জানান, আজিজের ব্রেন ডেথ হয়েছে। এরপরই পরিবারের সদস্যদের কাছে অঙ্গদানের প্রস্তাব দেন চিকিৎসকরা।
এসএসকেএমের নেফ্রোলজি বিভাগের প্রধান চিকিৎসক অর্পিতা রায়চৌধুরীর কথায়, ‘অঙ্গদান নিয়ে এখনও অনেকের মধ্যে কুসংস্কার রয়েছে। ভ্রান্ত ধারণার বশবর্তী হয়ে মরণোত্তর অঙ্গদান থেকে অনেকে পিছিয়ে আসেন। সেখানে সুন্দরবনের প্রত্যন্ত এলাকা বলে শুধু নয়, একটি মুসলিম পরিবার যে এ কাজে এগিয়ে এসেছে, তা অঙ্গদান আন্দোলনের বড় প্রাপ্তি। আজিতের পরিবার যা করে দেখাল, নিশ্চিত ভাবেই তা দৃষ্টান্ত। কিন্ত সবটা তো আমাদের হাতে নেই।’