নয়ন বিশ্বাস রকি
ধর্ম, বর্ণ, মত যাই হোক না কেন, একজন সন্তানের কাছে মা হল পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আশ্রয়। আর একজন সন্ন্যাসীর কাছে সেবা, সত্য ও করুণাই তার জীবনের মূলমন্ত্র। কিন্তু আজ বাংলাদেশে আমরা এমন এক দৃশ্য দেখছি যা মানুষ হিসেবে আমাদের লজ্জিত করে।
তিনি চিন্ময় কৃষ্ণ প্রভু দাস। একজন নিবেদিতপ্রাণ সন্ন্যাসী। ইসকন বাংলাদেশের অন্যতম পুরোহিত। যিনি সারাজীবন মানুষকে ধর্ম, শান্তি ও সম্প্রীতির কথা শিখিয়েছেন। আজ সেই মানুষটিকে দিনের পর দিন, বছরের পর বছর একটি মিথ্যা মামলায় কারাগারের অন্ধকারে বন্দী করে রাখা হয়েছে। শুধু বন্দী নয়, অভিযোগ উঠেছে তার উপর অমানবিক নির্যাতনও চলছে।
মিথ্যা মামলা : রাষ্ট্রীয় প্রতিহিংসার হাতিয়ার
কি তার অপরাধ ? তিনি হিন্দু। তিনি সনাতন ধর্মের কথা বলেন। তিনি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তার কথা বলেন। এই “অপরাধের” জন্যই একটি বানোয়াট মামলা সাজিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আদালতে প্রমাণ নেই, সাক্ষী নেই, তবুও জামিন নেই। বছরের পর বছর বিচার ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। আইনের ভাষায় একে বলে “Punishment by Process” – মানে বিচার না করেই শাস্তি দিয়ে দেওয়া। একজন সন্ন্যাসী, যার হাতে অস্ত্র নেই, যার ভাষায় ঘৃণা নেই, তাকে জেলে রেখে রাষ্ট্র আসলে কি বার্তা দিতে চায় ? মায়ের মৃত্যু, আর ৫ ঘণ্টার “প্যারোল”। সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটেছে। চিন্ময় প্রভুর মা পরলোকগমন করেছেন। হিন্দু ধর্ম অনুযায়ী, মা মারা গেলে সন্তানের উপর অনেক ধর্মীয় দায়িত্ব বর্তায়। শ্রাদ্ধ, পিণ্ডদান, মুখাগ্নি – এগুলো শুধু আচার না, এগুলো সন্তানের শেষ কর্তব্য। কিন্তু তথাকথিত বিএনপি-ইউনুস সরকার তাকে মাত্র ৫ ঘণ্টার জন্য প্যারোলে মুক্তি দিয়েছে। ৫ ঘণ্টা ! একটি মানুষ কী ৫ ঘণ্টায় তার মায়ের শেষ কাজ সম্পন্ন করতে পারে ? পারে কি মায়ের মুখাগ্নি করতে ? পারে কি আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশীকে নিয়ে শেষ বিদায় জানাতে ? এটা মুক্তি না, একটা প্রহসন। এটা মানবতার উপর আরেকটি আঘাত। একজন সন্তানকে তার মায়ের শেষকৃত্য থেকে বঞ্চিত করা – এর চেয়ে বড় নিষ্ঠুরতা আর কি হতে পারে? রাষ্ট্র যদি এতটুকু মানবিকতা দেখাতে না পারে, তাহলে আমরা কার কাছে বিচার চাইবো ?
বিচার বিভাগ নীরবে কাঁদে, মিডিয়া জিম্মি
একটা স্বাধীন দেশে বিচার বিভাগ হবে নাগরিকের শেষ ভরসা। কিন্তু আজ বিচারকরাও নীরব। জামিনের আবেদন পড়ে থাকে মাসের পর মাস। আইনজীবীরা আদালতে দাঁড়াতে ভয় পান। আর মিডিয়া ? বেশিরভাগ মিডিয়াকে জিম্মি করে রাখা হয়েছে। চিন্ময় প্রভুর উপর নির্যাতন, তার মায়ের মৃত্যু, ৫ ঘণ্টার প্যারোল – এই খবরগুলো মূলধারার মিডিয়ায় আসছে না। কারণ সত্য বললে “রাষ্ট্রদ্রোহ” মামলা হয়। ফলে দেশের মানুষ জানতেই পারছে না তাদের পাশের বাড়ির একজন সন্ন্যাসীর সাথে কি অমানবিকতা হচ্ছে।
সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদ বলে – “আইনের আশ্রয় লাভ প্রত্যেক নাগরিকের অবিচ্ছেদ্য অধিকার।” ২৭ অনুচ্ছেদ বলে – “সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান।” কিন্তু চিন্ময় প্রভুর ক্ষেত্রে আমরা কি দেখছি ? ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে আলাদা আচরণ। মিথ্যা মামলায় বছরের পর বছর আটক। জামিন নিষিদ্ধ। মায়ের শেষকৃত্যে যেতে না দেওয়া। এটাকে আইনের শাসন বলে না। এর নাম রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন। এর নাম ধর্মীয় বিদ্বেষ।
বিশ্ব হিন্দু সম্প্রদায় ও আন্তর্জাতিক সমাজের প্রতি আহ্বান
আজ শুধু বাংলাদেশের হিন্দুরা না, গোটা বিশ্বের হিন্দু সম্প্রদায়ের বিবেক জাগ্রত হওয়ার সময় এসেছে। আমি বিশ্বের সকল হিন্দু সংগঠন, মন্দির, আশ্রম ও ভক্তদের প্রতি আহ্বান জানাই – *চিন্ময় কৃষ্ণ প্রভুর মুক্তির জন্য আওয়াজ তুলুন। প্রতিবাদ গড়ে তুলুন। টুইট করুন, বিবৃতি দিন, মোমবাতি জ্বালান।
একই সাথে বিশ্বের সকল রাষ্ট্রদূত, জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র, ভারত সহ সকল মানবাধিকার সংস্থার প্রতি বিনীত অনুরোধ জানাই। আপনারা বাংলাদেশের এই মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টি গুরুত্বের সাথে দেখুন। একজন সন্ন্যাসীর উপর এই অমানবিক নির্যাতন বন্ধ করুন। তাকে নিঃশর্ত মুক্তি দিন। তাকে তার মায়ের শেষ কাজ করার সুযোগ দিন।
একটি মিথ্যা মামলা দিয়ে একজন মহান সন্ন্যাসীকে জেলে রাখা মানে শুধু একজন মানুষকে শাস্তি দেওয়া নয়, এর মাধ্যমে গোটা সনাতন সম্প্রদায়কে বার্তা দেওয়া হচ্ছে – “তোমরা এদেশে নিরাপদ না।” কিন্তু বাংলাদেশ ১৯৭১ সালে সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে স্বাধীন হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন – “ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার।” আজ যদি আমরা চিন্ময় প্রভুর পাশে না দাঁড়াই, তাহলে কাল আমাদের পাশেও কেউ দাঁড়াবে না। আমরা বিচার চাই। আমরা মানবতা চাই। আমরা চিন্ময় কৃষ্ণ প্রভু দাসের অবিলম্বে মুক্তি চাই। ধর্মের নামে জেল নয়, সত্যের নামে মুক্তি চাই।