
প্রাইমা হোসেন
আজ বাংলাদেশের দিকে তাকালে একটি প্রশ্নই সবার মুখে— কেমন চলছে দেশ ? উত্তরটা ভয়াবহ। আইনের শাসন আজ দলীয়করণের শিকলে বন্দি। বিচার বিভাগ স্বাধীনতা হারিয়ে নির্বাক দর্শক। বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে গায়েবি মামলা, মিথ্যা মামলা দিয়ে জেলখানা ভর্তি করা হচ্ছে। জামিন অযোগ্য ধারায় মামলা সাজিয়ে মাসের পর মাস, বছরের পর বছর আটকে রাখা হচ্ছে। এই হলো বাংলাদেশের বিচারাঙ্গনের বাস্তবতা, যেখানে বিচারপতিরাও আজ অসহায়, নীরবে কাঁদেন।
- গণতন্ত্র ও নির্বাচনের নামে প্রহসন
আগে বিএনপি মুখে বলত— আইনের শাসন, মানবাধিকার, গণতন্ত্র, সুশাসন। অথচ তারাই একদলীয় নির্বাচনের নজির স্থাপন করেছে। ৬৫% জনগণকে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করে ‘কিশের গণতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠা করেছে। আজ জনগণের প্রশ্ন— এটাই কি গণতন্ত্র?
- গণমাধ্যম ও সাংবাদিকতা আজ জিম্মি
বাংলাদেশের প্রতিটি গণমাধ্যম অফিস আজ জামায়াত-বিএনপির দখলে। স্বনামধন্য সাংবাদিকদের নামে মিথ্যা মামলা দিয়ে দিনের পর দিন কারাগারে বন্দি রাখা হচ্ছে। যে রাষ্ট্রে সাংবাদিক জিম্মি, সে রাষ্ট্রে গণতন্ত্রের চরিত্রই ভিন্ন। সাংবাদিক শ্যামল দত্ত, মুজ্জামেল বাবু , রুপা থেকে শুরু করে — তালিকাটা দীর্ঘ। মিথ্যা হত্যা মামলা আইনের নামে কালো আইন দিয়ে কলমের কণ্ঠরোধ করা হয়েছে।
- ইতিহাসের কলঙ্ক ও রাষ্ট্রীয় দ্বিচারিতা
১৯৭১ সালে জামায়াত-শিবির মহান মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল। আলবদর-আলশামস বাহিনী গঠন করে পাকিস্তানি হানাদারদের সহযোগী হয়ে ৩০ লাখ শহীদের রক্তে হোলি খেলেছে, ২ লাখ মা-বোনের সম্ভ্রম লুণ্ঠন করেছে। অথচ সেই জামায়াত আজ স্বাধীন বাংলাদেশে রাজনীতি করার বৈধতা পায়। আর যে আওয়ামী লীগ মহান মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়েছে, সেই দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম ‘কালো আইন’ দিয়ে নিষিদ্ধ করা হয়।
তথাকথিত সংসদে রাজাকার নিজামীর জন্য শোক প্রস্তাব আনা হয়— যা জাতির জন্য লজ্জাজনক। অথচ ১৯৬৯ এর মহানায়ক, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, ৯ বারের নির্বাচিত সংসদ সদস্য, সাবেক শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদের জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে শোক প্রস্তাব আনা হয়নি। এটাই আজকের রাষ্ট্রের চরিত্র ও বিএনপির আদর্শ। ইতিহাস সাক্ষী, শহীদ জিয়াউর রহমানের চাকরি রক্ষা করেছিলেন তৎকালীন বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক সচিব তোফায়েল আহমেদ। অথচ তার ছেলে তারেক রহমান সেই কিংবদন্তিকে রাষ্ট্রযন্ত্র দিয়ে অপমান করেছে।
- বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও প্রতিহিংসার রাজনীতি
২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা করে তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছিল। ২৪ জন নেতাকর্মী শহীদ হন, ৫০০ জনের বেশি পঙ্গুত্ব বরণ করেন। সেই মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিও আজ রাজনীতির পটপরিবর্তনে মুক্ত। এই হলো বাংলাদেশের আইনের চরিত্র।
আওয়ামী লীগের লক্ষ লক্ষ নেতাকর্মীর নামে মিথ্যা মামলা দিয়ে বিএনপি চাঁদাবাজি ও লুটপাটের মহোৎসব চালাচ্ছে। জামায়াত-বিএনপি-ড. ইউনূসের শাসনামলে কারাগারের ভেতরেই আওয়ামী লীগের ২৯৭ জন নেতাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা, মন্দির ভাঙচুর, ২০৬ জন হিন্দুকে নির্মমভাবে হত্যার ঘটনা বিশ্ববাসী দেখেছে। সন্ন্যাসী চিন্ময় প্রভুকে মিথ্যা মামলায় ২ বছর ধরে কারাগারে অমানবিক নির্যাতন করা হচ্ছে।
- নারীর নিরাপত্তা ও উন্নয়নের বিপরীত চিত্র
আজ নারী-শিশু ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যা বাংলাদেশের নিত্যদিনের ঘটনা। চারিদিকে অস্থিতিশীলতা। অথচ শেখ হাসিনার শাসনামলে নারীরা নিরাপদে ঘর থেকে বের হতে পারত, কর্মস্থলে যেতে পারত। নারীর ক্ষমতায়নে যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তিনি। জাতিসংঘে ‘প্ল্যানেট ৫০-৫০’ চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল বাংলাদেশ। আজ সেই নিরাপত্তা বিলীন।
- জুলাই আন্দোলন ও রাষ্ট্রীয় প্রতারণা
বৈষম্যবিরোধী ছাত্রদের জুলাই আন্দোলনকে ব্যবহার করে জাতির সঙ্গে প্রতারণা করা হয়েছে। স্নাইপারের বুলেটে নিরীহ ছাত্রদের হত্যা করে দায় চাপানো হয়েছে সরকারের ওপর। বিগত ২ বছরে আওয়ামী লীগের শত শত নেতাকর্মীকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। নদী-খাল-বিলে এখন শুধু লাশের মিছিল।
ইতিহাস বলে, কোনো জাতি আত্মাহুতি ছাড়া মুক্তি ও ন্যায়বিচার পায়নি। দেশকে এই অন্ধকার থেকে ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজন গণবিপ্লব, গণআন্দোলন। সর্বস্তরের জনগণকে নিয়ে রাজপথে গণপ্রতিরোধ গড়ে তুলে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। আজ বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করে— শেখ হাসিনার হাতেই বাংলাদেশ নিরাপদ। জনগণের দাবি আজ একটাই— শেখ হাসিনার দ্বিতীয়বার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন। কারণ একমাত্র তিনিই পারেন ভেঙে পড়া রাষ্ট্রকে আবার ঘুরে দাঁড় করাতে। ইতিহাস সাক্ষী, ইতিহাস বারবার ফিরে আসে। এই জানাজা শেষ নয়, আরও জানাজা সামনে আসবে।