শনিবার সনিয়া গান্ধী তাঁর আসন্ন স্মৃতিকথা Belonging : A Journey of Love নিয়ে একটি ভিডিও প্রকাশ করেন। সেখানে তিনি রাজীবের সঙ্গে প্রথম দেখা, তাঁদের বন্ধুত্ব এবং প্রেমে পড়ার স্মৃতি ভাগ করে নেন। বইটি প্রকাশিত হচ্ছে আগামী ১০ নভেম্বর।
তাপস মহাপাত্র
ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে রাজীব গান্ধী ও সনিয়া গান্ধীর প্রেমকাহিনি এক অনন্য অধ্যায়। একদিকে নেহরু-গান্ধী পরিবারের উত্তরাধিকারী রাজীব, অন্যদিকে ইতালির এক সাধারণ পরিবারের মেয়ে সনিয়া। ভিন্ন দেশ, ভিন্ন ভাষা, ভিন্ন সংস্কৃতি—সব ব্যবধান পেরিয়ে তাঁদের পরিচয় ধীরে ধীরে রূপ নেয় গভীর প্রেমে, যার পরিণতি ১৯৬৮ সালের বিবাহ।
সময়টা ১৯৬৫ সাল। ইংল্যান্ডের কেমব্রিজ শহরে পড়াশোনা করছেন দুই তরুণ-তরুণী। রাজীব গান্ধী পড়তেন ট্রিনিটি কলেজে। ইতালির তরুণী সনিয়া মাইনো ইংরেজি শিখতে এসেছিলেন ইংল্যান্ডে। সনিয়ার স্মৃতিচারণ অনুযায়ী, ইংল্যান্ডে নিজের পছন্দের খাবার খুঁজতে গিয়ে তিনি কেমব্রিজের ‘ভার্সিটি’ নামে একটি গ্রিক রেস্তোরাঁয় যাতায়াত শুরু করেন। ভারতীয় ও ইউরোপীয় ছাত্রছাত্রীদের আনাগোনা ছিল সেখানে। আর সেখানেই এক পরিচিত বন্ধুর মাধ্যমে তাঁর সঙ্গে আলাপ হয় রাজীব গান্ধীর। প্রথম দেখাতেই রাজীবের ব্যক্তিত্ব সনিয়াকে আকৃষ্ট করেছিল। পরবর্তী সময়ে নিজের স্মৃতি রোমন্থন করতে গিয়ে সনিয়া জানিয়েছিলেন, রাজীবের সুদর্শন চেহারার পাশাপাশি তাঁর কোমল ও শান্ত স্বভাবও সনিয়ার মনে গভীর ছাপ ফেলেছিল। সনিয়ার কথায়, প্রথম পরিচয়ের পরই তাঁর মনে হয়েছিল, এই মানুষটির সঙ্গে তিনি জীবন কাটাতে চাইবেন। পরে তিনি জানতে পারেন, রাজীবের অনুভূতিও ছিল একই রকম।

প্রথম আলাপের পর তাঁদের মধ্যে ধীরে ধীরে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। বন্ধুদের সঙ্গে পার্টিতে যাওয়া, একসঙ্গে ঘুরে বেড়ানো, ছাত্রছাত্রীদের সামাজিক অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়া—এই সব সাধারণ মুহূর্তের মধ্য দিয়েই তাঁদের সম্পর্ক গভীর হতে থাকে। রাজীব ছিলেন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর নাতি এবং তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর পুত্র। অন্যদিকে সনিয়া ছিলেন ইতালির এক সাধারণ পরিবারের মেয়ে। তাঁদের পারিবারিক পরিবেশ ও সাংস্কৃতিক পরিচয় ছিল আলাদা। কিন্তু ব্যক্তিগত সম্পর্কের ক্ষেত্রে এই ব্যবধান তাঁদের কাছে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। সনিয়ার স্মৃতিতে রাজীবের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক ছিল তাঁর ভদ্রতা, নম্রতা এবং কোমল ব্যবহার। তাঁদের প্রেমের কাহিনিতে তাই রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার চেয়ে ব্যক্তিগত ভালো লাগা ও পারস্পরিক বোঝাপড়াই বেশি গুরুত্ব পেয়েছিল। কেমব্রিজে শুরু হওয়া সেই প্রেম শেষ পর্যন্ত তাঁদের নিয়ে আসে বিবাহবন্ধনে। ১৯৬৮ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি রাজীব গান্ধী ও সনিয়া মাইনোর বিয়ে হয়। বিয়ের পর সনিয়া ভারতের গান্ধী পরিবারের সদস্য হয়ে নতুন জীবনে প্রবেশ করেন।

রাজীব তখনও সক্রিয় রাজনীতির মানুষ ছিলেন না। তিনি বিমান চালানোর পেশার সঙ্গে যুক্ত হন। পরবর্তীকালে ১৯৮০ সালে ছোট ভাই সঞ্জয় গান্ধীর মৃত্যুর পর তাঁর জীবনের লক্ষ্য বদলে যায়। পরিস্থিতির জেরে তাঁকে রাজনীতিতে প্রবেশ করতে হয়। ১৯৮৪ সালে ইন্দিরা গান্ধীর হত্যাকাণ্ডের পর রাজীব ভারতের প্রধানমন্ত্রী হন।

রাজীব ও সনিয়ার দাম্পত্যজীবন শুধু রাজনৈতিক ইতিহাসের অংশ ছিল না; তাঁদের নিজস্ব পারিবারিক জীবনও ছিল। রাজীব গান্ধী রাজনৈতিক ব্যস্ততার বাইরে পরিবারকে সময় দিতে পছন্দ করতেন। সনিয়াও দীর্ঘদিন জনসমক্ষে রাজনৈতিক ভূমিকার পরিবর্তে পরিবার ও ব্যক্তিগত জীবনকে প্রাধান্য দিয়েছিলেন। কিন্তু ১৯৯১ সালের ২১ মে তামিলনাড়ুর শ্রীপেরুম্বুদুরে এক আত্মঘাতী বোমা হামলায় রাজীব গান্ধীর মৃত্যু তাঁদের দীর্ঘদিনের সম্পর্কের আকস্মিক অবসান ঘটায়। সনিয়ার জীবনে নেমে আসে গভীর শোক। যাঁর সঙ্গে কেমব্রিজের একটি ছোট্ট রেস্তোরাঁয় পরিচয় হয়েছিল, যাঁর সঙ্গে যৌবনের স্বপ্ন ও সংসার ভাগ করে নিয়েছিলেন, তাঁকেই হারাতে হয় নির্মম রাজনৈতিক সহিংসতায়।

শনিবার সনিয়া গান্ধী তাঁর আসন্ন স্মৃতিকথা Belonging: A Journey of Love নিয়ে একটি ভিডিও প্রকাশ করেন। সেখানে তিনি রাজীবের সঙ্গে প্রথম দেখা, তাঁদের বন্ধুত্ব এবং প্রেমে পড়ার স্মৃতি ভাগ করে নেন। বইটি প্রকাশিত হচ্ছে আগামী ১০ নভেম্বর।

সনিয়ার স্মৃতিচারণে কেমব্রিজের সেই ছোট্ট গ্রিক রেস্তোরাঁ কেবল একটি জায়গা নয়—সেটি তাঁর জীবনের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা। রাজীবের সৌন্দর্যের কথা তিনি স্মরণ করেছেন, কিন্তু তার চেয়েও বেশি মনে রেখেছেন তাঁর কোমল স্বভাবকে। তাঁদের পরিচয় হয়েছিল রাজনীতি ও ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে বহু দূরে, দুই তরুণ-তরুণীর সাধারণ জীবনের পরিসরে। পরে ইতিহাস তাঁদের অসাধারণ পরিচিতি দিয়েছে, কিন্তু তাঁদের প্রেমের শুরুটা ছিল একেবারেই ব্যক্তিগত—একটি পরিচয়, একটি ভালো লাগা, একটি বন্ধুত্ব এবং একসঙ্গে জীবন কাটানোর ইচ্ছা।