নিজস্ব সংবাদদাতা: যুদ্ধক্ষেত্রে প্রায় ১৬ মাস আটকে থাকার পর অবশেষে উদ্ধার হলেন ইউক্রেনের সেনা কস্তিয়ান্তিন ভ্লাসেঙ্কো। ৪৯ বছরের এই জওয়ানের টিকে থাকার লড়াই এখন আলোচনার কেন্দ্রে। সংবাদমাধ্যম সেন্সর নেটকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি শুনিয়েছেন কীভাবে প্রতিদিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়েছেন।
সেনায় আসার আগে খাদানে ট্রাক চালাতেন ভ্লাসেঙ্কো। স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে ৩০ মেকানাইজড ব্রিগেডে যোগ দেন। গত বছর তাঁকে ফ্রন্টলাইনের ভার্টুন এলাকায় মোতায়েন করা হয়। সঙ্গী ছিলেন প্রায় ৫০ বছর বয়সি সহযোদ্ধা বাস্কি। একটি বাঙ্কার থেকে দুজনে প্রতিরোধ চালাচ্ছিলেন। সেই সময় ড্রোনের মাধ্যমেই তাঁদের কাছে খাবার ও অন্যান্য সরঞ্জাম পৌঁছাত।
পরিস্থিতি বদলায় গত ফেব্রুয়ারিতে। টানা বৃষ্টিতে বাঙ্কার ডুবে গেলে তাঁরা আশ্রয় নেন কাছের একটি পরিত্যক্ত স্কুলবাড়িতে। ভ্লাসেঙ্কো জানান, একদিন হঠাৎ রুশ ড্রোনের ঝাঁক এসে স্কুল লক্ষ্য করে হামলা শুরু করে। বাঁচতে তিনি পাশের একটি শিয়ালের গর্তে ঢুকে পড়েন। তাঁদের উদ্ধারে পাঠানো দুই জওয়ান ড্রোন হামলায় নিহত হন, পরে তাঁদের মরদেহ আনতে গিয়েও আরও দুজনের মৃত্যু হয়।
এরপর তাঁরা ফের স্কুলে ফিরে আসেন। ড্রোনে শুকনো খাবার, জামাকাপড় আসতে থাকে। কিন্তু রুশ নজরদারি ড্রোন তাঁদের খুঁজে পায়। নতুন করে হামলা শুরু হয়। এই হামলাতেই বাস্কি মারা যান। ভ্লাসেঙ্কোর বাঁ পা গুরুতর জখম হয়, পালানোর সময় ডান পায়েও চোট পান। একদিন রুশ বাহিনী ড্রোন থেকে স্কুলের সামনে একটি লাউডস্পিকার ফেলে দেয়, সেখানে হিন্দি অনুবাদে বলা হয় – ‘আমরা জানি তুমি এখানে লুকিয়ে আছো, তোমাকে কেউ বাঁচাতে পারবে না।’
এভাবেই মাসের পর মাস কাটে। চার-পাঁচ দিন পর পর ড্রোনে খাবার ও ওষুধ আসত, সেটাই ছিল বেঁচে থাকার একমাত্র ভরসা। কিন্তু আঘাত থেকে দুই পায়ে পচন শুরু হয়। অসহ্য যন্ত্রণা ও সংক্রমণ ঠেকাতে শেষ পর্যন্ত নিজের হাতে ছুরি দিয়ে ডান পায়ের কিছুটা অংশ কেটে ফেলতে বাধ্য হন তিনি।
ইউক্রেন সেনা তাঁকে বের করে আনতে মরিয়া ছিল, কিন্তু রুশ ড্রোনের ক্রমাগত নজরদারির জন্য ট্যাঙ্ক বা পদাতিক পাঠানো সম্ভব হচ্ছিল না। রোবোটিক গাড়ি পাঠানোর চেষ্টাও ব্যর্থ হয়, রুশ হামলায় তা ধ্বংস হয়ে যায়।
শেষ পর্যন্ত ড্রোন দিয়েই উদ্ধারের ছক কষা হয়। ৯০ কেজি ওজন বহনে সক্ষম একটি হেভি ড্রোন পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তার আগে ছোট ড্রোনে করে ভ্লাসেঙ্কোর কাছে পাঠানো হয় হারনেস ও অন্যান্য সরঞ্জাম, সঙ্গে কীভাবে নিজেকে বাঁধতে হবে তার ভিডিয়ো নির্দেশিকা।
৪ অক্টোবর সেই পরিকল্পনা সফল হয়। কয়েকটি অ্যাটাক ড্রোনের সুরক্ষা-বলয়ের মধ্যে বড় ড্রোনটি তাঁর কাছে পৌঁছায়। সংকেত পেতেই ভ্লাসেঙ্কো নিজেকে হারনেসে আটকে নেন এবং ড্রোনটি তাঁকে উড়িয়ে নিরাপদ এলাকায় নিয়ে আসে। ৪৯১ দিনের দীর্ঘ ও যন্ত্রণাদায়ক অপেক্ষার পর এভাবেই প্রাণ ফিরে পান তিনি।