অর্ঘ পাত্র
চে, তোমার মৃত্যু আমাকে অপরাধী করে দেয়
আমার ঠোঁট শুকনো হয়ে আসে, বুকের ভেতরটা ফাঁকা
আত্মায় অভিশ্রান্ত বৃষ্টিপতনের শব্দ
শৈশব থেকে বিষণ্ন দীর্ঘশ্বাস
চে, তোমার মৃত্যু আমাকে অপরধী করে দেয়-
বোলিভিয়ার জঙ্গলে নীল প্যান্টালুন পরা
তোমার ছিন্নভিন্ন শরীর…
- চে গুয়েভারার প্রতি (সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়)
আজ রবিবার মহান কিউবিয়ান বিপ্লবী চে গুয়েভারার জন্মদিন। আজ তিনি আমাদের মাঝে থাকলে বয়স হত ৯৮। আজ তাঁর জন্মদিন যিনি পার্লামেন্টে উঠে বলেছিলেন ‘পারতিয়া অর ময়েরতে’ অর্থাৎ মাতৃভূমি নচেৎ মৃত্যু। চে গুয়েভারার জন্ম ১৯২৮ সালের ১৪ জুন আর্জেন্টিনার রোসারিও শহরে। চিকিৎসা পেশা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করলেও তাঁর জীবনের বড় অংশ কেটেছে দরিদ্র ও শোষিত মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে। তরুণ বয়সে লাতিন আমেরিকা ভ্রমণের সময় তিনি দারিদ্র্য, বৈষম্য ও বঞ্চনার বাস্তব চিত্র গভীরভাবে প্রত্যক্ষ করেন, যা তাঁর ভেতরে সমাজ পরিবর্তনের দৃঢ় সংকল্প তৈরি করে। পড়াশোনার সময় তিনি মার্ক্স, লেনিন, নেহরু, ক্যামাসসহ বহু দার্শনিক ও চিন্তাবিদের রচনা অধ্যয়ন করেন এবং সমাজতান্ত্রিক আদর্শে নিজেকে গড়ে তোলেন। পরবর্তীতে গুয়েতেমালার সমাজ সংস্কার আন্দোলনে যুক্ত হয়ে তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে প্রবেশ করেন, যা তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয় এবং তাঁকে এক অনুকরণীয় বিপ্লবীতে পরিণত করে। চে গুয়েভারা ইতিহাসে এক বহুল আলোচিত ও নন্দিত চরিত্র। তাঁর জীবন ও সংগ্রাম নিয়ে অসংখ্য জীবনী, প্রবন্ধ, তথ্যচিত্র, গান ও চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে, যা আজও বিশ্বজুড়ে মানুষকে অনুপ্রেরণা জোগায়। ছেলেবেলায় তিনি শ্বাস কষ্ট জনিত কষ্টে ভুগেছিলেন। বড় হয়ে বেছে নিয়েছিলেন চিকিৎসাকে। তারপর কিনলেন বাইক ভ্রমণ করলেন সমগ্র দক্ষিণ আমেরিকা। যা তাকে অসহায় মানুষের দুঃখ-কষ্ট অনুধাবন করার সুযোগ এনে দেয়। চে বুঝতে পারেন ধনী-গরিবের এই ব্যবধান ধ্বংস করে দেওয়ার জন্য বিপ্লব ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। তখন থেকেই তিনি মার্ক্সবাদ নিয়ে পড়ালেখা শুরু করেন এবং সচক্ষে এর বাস্তব প্রয়োগ দেখার জন্য গুয়েতেমালা ভ্রমণ করেন।
এই বিশ্বাসের বশবর্তী হয়ে রাষ্ট্রপতি জাকোবো আরবেনজ গুজমানের নেতৃত্বাধীন গুয়েতেমালার সামাজিক সংস্কার আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন। ১৯৫৪ সালে সিআইএ-এর ষড়যন্ত্রে গুজমানকে ক্ষমতাচ্যুত করা হলে চে’র বৈপ্লবিক আদর্শ চেতনা বদ্ধমূল হয়। পরবর্তীকালে মেক্সিকো সিটিতে বসবাসের সময় তাঁর সঙ্গে রাউল ও ফিদেল কাস্ত্রোর আলাপ হয়। চে তাঁদের ‘ছাব্বিশে জুলাই’ আন্দোলনে যোগ দেন। মার্কিন মদদপুষ্ট কিউবান একনায়ক ফুলজেনসিও বাতিস্তাকে উৎখাত করার জন্য সমুদ্রপথে কিউবায় প্রবেশ করেন। খুব অল্পদিনেই চে বিপ্লবী সংঘের এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বে পরিণত হন।
সেকেন্ড-ইন-কম্যান্ড হিসেবে পদোন্নতির পর তিনি বাতিস্তা সরকারের পতনের লক্ষ্যে দুই বছরব্যাপী গেরিলা যুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্বমূলক ভূমিকা পালন করেন। এই সংগ্রামের সাফল্যে তার অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কিউবার বিপ্লবের পর চে গুয়েভারা নতুন সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে নিযুক্ত হন। এর মধ্যে ছিল বিপ্লবী আদালতে যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্তদের আপিল পর্যালোচনা ও ফায়ারিং স্কোয়াডের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা, শিল্পোদ্যোগমন্ত্রী হিসেবে ভূমি ও কৃষি সংস্কার আইন প্রণয়ন, কিউবার জাতীয় ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট এবং সামরিক বাহিনীর প্রশিক্ষণ ও নির্দেশনা সংক্রান্ত দায়িত্ব পালন। পাশাপাশি তিনি বিশ্বব্যাপী সফরের মাধ্যমে কিউবার সমাজতান্ত্রিক আদর্শ প্রচারে যুক্ত ছিলেন।
এই দায়িত্বগুলোর মাধ্যমে তিনি মিলিশিয়া বাহিনীকে প্রশিক্ষণের সুযোগ পান, যা পরবর্তীতে পিগস বে আক্রমণ প্রতিহত ও পুনর্দখলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিউবায় সোভিয়েত পারমাণবিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনের সময়ও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এ সময় তিনি বিভিন্ন প্রবন্ধ ও বই লেখেন এবং গেরিলা যুদ্ধ নিয়ে একটি ম্যানুয়াল রচনা করেন। পরে ১৯৬৫ সালে তিনি কিউবা ত্যাগ করেন এবং কঙ্গো-কিনশাসা ও বলিভিয়ায় সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ করার সিদ্ধান্ত নেন। বলিভিয়ায় অবস্থানকালে তিনি সিআইএ-সমর্থিত বলিভিয়ান বাহিনীর বিরুদ্ধে গেরিলা যুদ্ধ চালান। এই সংঘাতে তিনি আহত হয়ে বন্দি হন। পরে ১৯৬৭ সালের ৯ অক্টোবর লা হিগুয়েরায় বলিভিয়ার সেনাবাহিনী তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে। এর মধ্য দিয়ে এক যুগের সমাপ্তি ঘটে, আবার ইতিহাসে জন্ম নেয় এক নতুন অধ্যায়।
তার মৃত্যুর ৫০ বছর পরও টাইম পত্রিকার বিংশ শতাব্দীর সর্বাপেক্ষা প্রভাবশালী ১০০ জন ব্যক্তির তালিকায় তাঁর নাম প্রকাশিত হয়। আবার গেরিলা যোদ্ধার পোশাকে ১৯৬০ সালের ৫ মার্চ ‘গেরিলেরো হেরোইকো’ নামে আলবের্তো কোর্দার তোলা চে’র বিখ্যাত ফটোগ্রাফটিকে ‘বিশ্বের সর্বাপেক্ষা প্রসিদ্ধ ফটোগ্রাফ’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।