অর্ণব দত্ত
স্বর্ণযুগের সেই গান যে বিষম অসুখ হয়ে উঠবে, কে তা জানত ? মহানায়ক তাঁর প্রেয়সীকে খুঁজেছেন মনের চোরাগলিতে। লেংচেও মরেছেন। হোঁচটও খেয়েছেন। পরিশেষে ভয়ের খাঁড়াতে পাঁঠাবলি হয়েছেন। চাচা আপন প্রাণ বাঁচাতে লেংচে মরার আগে পালিয়ে যাওয়ার রাস্তা খুঁজেছেন। নাক কান মুললেও তা কোনও কাজেই লাগেনি।
‘আমি কোন কথা যে বলি কোন পথে যে চলি’, বাংলা স্বর্ণযুগের সিনেমায় মহানায়কের উত্তম কুমারের লিপে গাওয়া এই মজার গান ভারত এবং বাংলাদেশের বাঙালির জীবনে এক ভয়াবহ অসুখের চেহারা নিয়েছে। প্রেমের গান যে রোগে পর্যবসিত হবে, তা কী কেউ কখনও ভেবেছিল সেদিন ? যেমন, কাল কী হবে তা কি আজ কেউ জানে ?
সূর্যোদয় হবে, সূর্য পাটে যাবে। সন্ধ্যা ঘনাবে, তারপর রাত নিঃঝুম হবে। কাল, পরশু, তরশু অন্তহীন। সূর্য, চন্দ্রে্ প্রাণ নেই। ভিনগ্রহে প্রাণের অস্তিত্ব নিয়ে গবেষণা চলছে তো চলছেই। আছে কিনা তার সংকেতটুকু কখনও মিলছে, এই দাবি বিজ্ঞানীদের একাংশের। কিন্তু আকাশভরা সূর্যতারার নিচে এই যে ইহজগত, সেখানে মানবপ্রাণ অমূল্য সম্পদ। গাছেরও প্রাণ আছে তা প্রমাণ করেছেন বাঙালি বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসু। উপনিযদের ঋষিরা আবার উপলব্ধি করেছিলেন, ‘চৈতন্য সর্বব্যাপী। এমনকি চৈতন্য নাকি পাথরেও আছে।
প্রাচ্যের কবি যে ভারতবর্ষকে মহামানবের সাগরতীর হিসেবে কল্পনা করেছিলেন, পাশ্চাত্যের বিজ্ঞানী আবার মনে করছিলেন, জ্ঞানসাগরের বালুকাবেলায় তিনি স্রেফ নুড়ি কুড়িয়েছেন। এ যেন অতি সাধারণ কাজ। না হলে জ্ঞানসমুদ্র শুষে নিতে পারতেন বলেই হয়তো দাবি করতেন। এইসব হিংটিংছট প্রশ্ন মাথার মধ্যে বরাবর কামড়াচ্ছে জ্ঞানী ব্যক্তিদের হৃদয়ে। পৃথিবী কখনও জ্ঞানশূন্য হয় না। গীতায় শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন, যখনই অনাচার মাত্রাতিরিক্ত হবে, তখনই ধর্মের উত্থান হবে। পৃথিবীর সব ধর্মে এই একই কথা আছে।
পৃথিবী সূর্যের চারদিকে বরাবরের ঘুরছে। চিকিৎসা বিজ্ঞান নিয়ে যে আধুনিক গবেষণা চলছে তাতে বিজ্ঞানীরা দাবি করেছেন, সুসময় আসছে। বিপুল অগ্রগতি হবে চিকিৎসা বিজ্ঞানের। কারণ অসুখ-বিসুখ যতই নবরূপে দেখা দেবে, ওষুধপত্রও কিংবা সারিয়ে তোলার পদ্ধতিগুলিও বিজ্ঞান আবিষ্কার করে ফেলবে। সোজা বাংলায় বললে, ধর্ম ও বিজ্ঞান একই প্রবাহ।
এদিকে দুভার্গ্যজনক খবর হল, ল্যানসেট মেডিক্যাল জার্নালের খবর অনুসারে, ৫০ শতাংশের বেশি ভারতীয় শারীরিকভাবে আনফিট। শরীর খারাপ হলে মনের উপর তার প্রভাবে মানসিক নানাবিধ সমস্যা রোগের আকার নিচ্ছে এবং আরও নেবে। এই রিপোর্ট প্রকাশের পর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা স্বাস্থ্যজনিত এই সমস্যা কাটিয়ে উঠতে প্রাপ্তবয়স্ক ভারতীয় নাগরিকদের কিছু জরুরি পরামর্শ দিয়েছেন। যেমন, শারীরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে নিয়মিত শরীরচর্চা করতে হবে।
সূত্রের খবর, বিশ্বের ১৯৭টি দেশে অসুস্থতার প্রকৃতি একই ধরনের। করোনা পরিস্থিতির পর থেকে দেখা যাচ্ছে, ৫২.৬ শতাংশের বেশি প্রাপ্তবয়স্ক মহিলা এবং ৩৮ শতাংশের বেশি পুরুষ একই ধরনের সমস্যার শিকার। বলাবাহুল্য, এই সমস্যা সামাজিক সমস্যা। যেহেতু মানুষ সমাজবদ্ধ জীব।
এদিকে ভারতে ফিটনেসজনিত অক্ষমতা আগামী চার বছরের মধ্যে আরও বৃদ্ধি পাবে। ৫০ থেকে তা ৫৫ শতাংশে ঠেকবে বলে দাবি গবেষকদের। এর জেরে হৃদযন্ত্র ঘটিত সমস্যা, পেশী এবং অস্থির জটিল রোগে আক্রান্ত হবেন বহু নবীন এবং প্রবীণ নাগরিক। কেন এই সমস্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে তাও জানা গিয়েছে। মূল কারণগুলির মধ্যে রয়েছে ডেস্কে বসে টানা কাজ ঘণ্টার পর ঘণ্টা, সারাক্ষণ মোবাইল নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করা, সবুজের নির্বিচার ধ্বংসসাধনের ফলে বহু মানুষ অদূরভবিষ্যতে সুস্থভাবে হাঁটাচলা পর্যন্ত করতে পারবেন না। ভারতে ২০২৭ সালের জনগণনার রিপোর্ট প্রকাশিত হলেই জানা যাবে, বর্তমানে ভারতে মোট নাগরিকের সংখ্যা।
এই ক্ষতি অবশ্যই দেশের ক্ষতি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ, সমস্যা কাটাতে দৈনিক ২ ঘণ্টা ৩০ মিনিট শরীরচর্চা জরুরি। নাহলে মহিলাদের স্তনের ক্যান্সার ক্রমবর্ধমান হবে, এর পাশাপাশি নারী-পুরুষ দুপক্ষের ডায়াবেটিসের সমস্যা এবং বহু নাগরিক স্মৃতিভ্রংশের শিকার হবেন। ডাক্তারদের মতে, লাইফ স্টাইল পরিবর্তন করলেই স্বখাত সলিলে ডুবে মরার সম্ভাবনা থেকে নিস্তার পাবেন। দিল্লি স্টেট ক্যান্সার ইন্সটিটিউটের বিশিষ্ট চিকিৎসক প্রজ্ঞা শুক্লা বলেছেন, ‘জেন জি তথা দেশের নবীন নাগরিকদের মধ্যে নানা ধরনের ক্যান্সারের সম্ভাবনা বৃদ্ধি পাবে। এখনই যুবতীদের স্তন ক্যান্সার ক্রমবর্ধমান হচ্ছে এবং হবে।
সূত্রের খবর, ভারতের প্রতিবেশী বাংলাদেশেও হিন্দু এবং মুসলমান নাগরিকদের অনেকের রাস্তাঘাটে হাঁটাচলা করতে মাথা বনবন করে ঘুরছে। এপার এবং ওপার বাংলাতে এই রোগের কারণ উদ্বেগ। এই সমস্যা অটো সাজেশনের মাধ্যমে, শ্বাসপ্রশ্বাসের ব্যায়াম করে ধীরে ধীরে কাটানো যেতে পারে। না হলে প্যানিক অ্যাটাক উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাবে। একা হাঁটাচলা করলেই ভীষণ ভয় লাগবে।
দক্ষিণ এশিয়া পৃথিবীর সবচেয়ে ঘিঞ্জি এলাকা। ভারত এবং বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার অন্তর্গত অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ দুটি দেশ। দুই দেশের শহরাঞ্চলের রাস্তাঘাটেই জনসমুদ্র। বাংলাদেশের বিশিষ্ট সাইক্রিয়াটিস্ট ডা. মেখলা সরকার বলেছেন, ‘এই রোগের নাম অ্যাগোরাফোবিয়া। ভয় ভয়াবহ হলে ডাক্তারের কাছে গিয়ে ওষুধপত্র না খেলে রোগ সারবে না।’