গোপাল শীল, দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা: দক্ষিণ ২৪ পরগনার বকখালি মানেই সমুদ্র, পর্যটন আর প্রকৃতির হাতছানি। আর বকখালির একেবারে কাছেই রয়েছে এমন এক জায়গা, যেখানে সমুদ্রের ঢেউয়ের সঙ্গে মিশে রয়েছে ইতিহাস, ঐতিহ্য আর রহস্যের গল্প। তার নাম হল ফ্রেজারগঞ্জ। যার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ব্রিটিশ আমলের বাংলার লেফটেন্যান্ট গভর্নর স্যার অ্যান্ড্রু হেন্ডারসন লেইথ ফ্রেজারের স্মৃতি।
একসময় এই ফ্রেজারগঞ্জ এলাকার নাম ছিল নারায়ণতলা। ব্রিটিশ আমলে অ্যান্ড্রু ফ্রেজার এই উপকূলবর্তী এলাকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং রূপালি বালুকাবেলায় মুগ্ধ হন। ১৯০৩ থেকে ১৯০৮ সাল পর্যন্ত বাংলার লেফটেন্যান্ট গভর্নর থাকা ফ্রেজার এই এলাকাকে একটি স্বাস্থ্যকর বিচ রিসোর্ট হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেছিলেন। নিজের থাকার জন্য তৈরি করেছিলেন বিলাসবহুল বাংলো। সেই বাংলোতে ছিল বলরুম, বারসহ নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধা। এমনকি এলাকাটিকে আকর্ষণীয় করে তুলতে গলফ কোর্স তৈরির পরিকল্পনাও ছিল। কিন্তু প্রকৃতির কাছে শেষ পর্যন্ত হার মানতে হয় সেই স্বপ্নকে।
কিন্তু বছরের পর বছর বঙ্গোপসাগরের প্রবল ঢেউ, নদী ও সমুদ্রভাঙন এবং একের পর এক ঘূর্ণিঝড়ের দাপটে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ফ্রেজার সাহেবের সেই ঐতিহাসিক বাংলো। বিশেষ করে সাম্প্রতিক বছরগুলিতে ভাঙনের তীব্রতা আরও বেড়েছে। ঘূর্ণিঝড় ইয়াসের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগও এই এলাকার ক্ষয়ক্ষতিকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
এমতাবস্থায় প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের আঘাতে আজ সেই রাজকীয় বাংলোর আর আগের চেহারা নেই। কোথাও ভগ্ন দেওয়ালের চিহ্ন, কোথাও ধ্বংসাবশেষ—আর তার পাশেই আছড়ে পড়ছে সমুদ্রের ঢেউ। জোয়ারের সময় বাংলোর ধ্বংসাবশেষের কিছু অংশ চলে যায় জলের তলায়। ফলে ইতিহাসের এই নিদর্শনটি আদৌ আর কতদিন টিকে থাকবে, তা নিয়েই তৈরি হয়েছে আশঙ্কা। তবে শুধু ইতিহাস নয়, ফ্রেজার সাহেবের এই বাংলোকে ঘিরে রয়েছে নানা রহস্যের গল্পও। স্থানীয়দের মধ্যে প্রচলিত রয়েছে নানা জনশ্রুতি।
কেউ বলেন, একসময় এই বাংলোয় ব্রিটিশ সাহেবদের বিলাসবহুল জলসা বসত। আবার এই পরিত্যক্ত বাংলোকে ঘিরে রয়েছে গোপন ঘটনা, হত্যাকাণ্ড এবং অলৌকিক অভিজ্ঞতার নানা গল্পও। যদিও এই সমস্ত গল্পের ঐতিহাসিক সত্যতা নিয়ে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই, তবুও রহস্যে মোড়া এই জনশ্রুতিই পর্যটকদের কাছে জায়গাটিকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে।
আজ বকখালি-ফ্রেজারগঞ্জে বেড়াতে আসা পর্যটকদের অনেকেই ছুটে আসেন এই ইতিহাসের শেষ চিহ্নটুকু দেখতে।
একদিকে নীল জলরাশি, অন্যদিকে রূপালি বালুচর—আর তার মাঝেই সমুদ্রের গ্রাসে হারিয়ে যেতে বসা একটি ব্রিটিশ আমলের স্মৃতি। সমুদ্র এগিয়ে আসছে, ভাঙন বাড়ছে। আর তার সঙ্গে ধীরে ধীরে মুছে যাচ্ছে এক শতাব্দীরও বেশি পুরনো ইতিহাস। কিন্তু প্রশ্ন একটাই—সংরক্ষণের উদ্যোগ না নেওয়া হলে, আগামী দিনে কি শুধুই গল্প আর ছবির পাতায় থেকে যাবে ফ্রেজার সাহেবের সেই ঐতিহাসিক বাংলো ?
ফ্রেজারগঞ্জের সমুদ্রের গর্জন আজ যেন সেই ইতিহাসকেই মনে করিয়ে দিচ্ছে— সময় থাকতে ইতিহাসকে বাঁচানো না গেলে, একদিন ইতিহাসের অস্তিত্বই হয়তো মিশে যাবে বঙ্গোপসাগরের জলে।