ওঙ্কার ডেস্ক: হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও বাণিজ্যিক মহলে নতুন করে আশার সঞ্চার হলেও পরিস্থিতি এখনও পুরোপুরি স্বাভাবিক হওয়ার থেকে অনেক দূরে। ইরান ও আমেরিকার মধ্যে সম্ভাব্য সমঝোতা চুক্তির ফলে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ ফের খুলে যেতে পারে বলে আলোচনা শুরু হয়েছে। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, জলপথ খুলে দেওয়া গেলেও সমুদ্রের তলায় ছড়িয়ে থাকা সামুদ্রিক মাইন বা বিস্ফোরক অপসারণ না হওয়া পর্যন্ত প্রকৃত অর্থে নিরাপদ নৌচলাচল নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না।
মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে হরমুজ প্রণালীর গুরুত্ব অপরিসীম। বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অংশের অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস এই পথ দিয়েই আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছায়। ফলে এই জলপথে যেকোনও অস্থিরতা বিশ্ব অর্থনীতি, জ্বালানি বাজার এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের উপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। সাম্প্রতিক সংঘাতের আবহে প্রণালীকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা চরমে পৌঁছেছিল। নিরাপত্তা সংক্রান্ত উদ্বেগের কারণে বহু বাণিজ্যিক জাহাজ বিকল্প পথ খুঁজতে বাধ্য হয়, যার ফলে পরিবহণ ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়।
কূটনৈতিক সূত্রে জানা যাচ্ছে, সম্ভাব্য চুক্তির আওতায় প্রথমে জাহাজ চলাচলের উপর থাকা নিষেধাজ্ঞা ও বাধা দূর করার বিষয়টি গুরুত্ব পেতে পারে। তবে সমুদ্রের তলায় পাতা মাইন নিষ্ক্রিয় করার প্রক্রিয়া অনেক বেশি সময়সাপেক্ষ ও জটিল। সামুদ্রিক মাইন অপসারণের কাজ শুধুমাত্র প্রযুক্তিনির্ভর নয়, বরং অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণও। বিশেষ ধরনের যুদ্ধজাহাজ, উন্নত সেন্সর প্রযুক্তি এবং প্রশিক্ষিত বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় এই কাজ সম্পন্ন করতে হয়।
সমুদ্রের স্রোত এবং পরিবেশগত পরিবর্তনের কারণে মাইনগুলি প্রায়ই তাদের মূল অবস্থান থেকে সরে যায়। ফলে কোন এলাকায় কতগুলি বিস্ফোরক রয়েছে, তা নির্ভুলভাবে চিহ্নিত করা কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে কয়েক কিলোমিটার জুড়ে বিস্তৃত এলাকা স্ক্যান করতে হয়। একটি মাইনও যদি অচিহ্নিত থেকে যায়, তবে তা বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য ভয়াবহ বিপদের কারণ হতে পারে।
এ কারণে জলপথ আনুষ্ঠানিকভাবে খুলে গেলেও আন্তর্জাতিক শিপিং সংস্থা, বীমা কোম্পানি এবং বন্দর কর্তৃপক্ষের মধ্যে সতর্কতা বজায় থাকবে বলেই মনে করা হচ্ছে। যুদ্ধ পরিস্থিতি প্রশমিত হওয়ার পরেও জাহাজ মালিকরা ঝুঁকি নিতে চাইবেন না, যদি না নিরাপত্তা সংক্রান্ত পূর্ণ নিশ্চয়তা পাওয়া যায়। ফলে চুক্তি স্বাক্ষরের পরও হরমুজ প্রণালীতে স্বাভাবিক বাণিজ্যিক কার্যক্রম ফিরতে কিছুটা সময় লাগতে পারে।
অন্যদিকে, তেল বাজারও পরিস্থিতির দিকে গভীর নজর রাখছে। হরমুজ প্রণালী দিয়ে জ্বালানি সরবরাহ পুরোপুরি স্বাভাবিক না হলে আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য ওঠানামা অব্যাহত থাকতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কূটনৈতিক সমঝোতা নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হলেও সমুদ্রপথকে সম্পূর্ণ নিরাপদ করে তোলা আরও বড় চ্যালেঞ্জ। তাই জলপথ পুনরায় চালু হওয়ার সম্ভাবনা যতই উজ্জ্বল হোক না কেন, সমুদ্রের তলায় লুকিয়ে থাকা বিস্ফোরক বিপদ দূর না হওয়া পর্যন্ত উদ্বেগ পুরোপুরি কাটবে না।