ওঙ্কার ডেস্কঃ পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধের প্রায় পাঁচ সপ্তাহ পর অবশেষে শান্তির পথে রাজি হয়েছে ইরান এবং আমেরিকা। ইরানকে একাধিকবার কড়া ভাষায় হুমকি দিয়ে আসছিল মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। ট্রাম্প দাবি করেছিল সময় থাকতে আলোচনায় না বসলে পুরো ইরানকে ধ্বংস করে দেবে ওয়াশিংটন। এমনকি নিজের মেজাজ সামলে উঠতে না পেরে সমাজ মাধ্যমে ইরানকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজও করেছেন। কিন্তু পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় এই অস্থায়ী যুদ্ধবিরতির ঘোষণার পর এবার ইরানের পক্ষ থেকে একটি বিস্তৃত ১০ দফা প্রস্তাব পেশ করেছে। আর এই শর্তে ইতিবাচক ইঙ্গিত দিয়েছে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।
যুদ্ধবিরতির জন্য ইরানের শর্ত গুলি হল, প্রথমত, ইরানের প্রধান দাবি হল তাদের উপর আরোপিত সমস্ত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে হবে। দীর্ঘদিন ধরে এই নিষেধাজ্ঞার ফলে ইরানের অর্থনীতি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে অভিযোগ তেহরানের। তারা মনে করছে, নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া না হলে কোনও দীর্ঘমেয়াদি সমাধান সম্ভব নয়।
দ্বিতীয়ত, অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত জলপথ হরমুজ প্রাণালীর উপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার কথা স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে তেহরানের তরফ থেকে। এই প্রণালী দিয়ে বিশ্বের বিপুল পরিমাণ তেল পরিবাহিত হয়, ফলে এর নিয়ন্ত্রণ আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইরান জানিয়েছে, এই পথে জাহাজ চলাচল তাদের তত্ত্বাবধানে এবং নির্দিষ্ট নিয়ম মেনেই চলবে।
তৃতীয়ত, ইরান যুক্তরাষ্ট্রের কাছে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তাদের সামরিক উপস্থিতি কমানো বা সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে। তেহরানের মতে, এই অঞ্চলে মার্কিন সেনা উপস্থিতিই উত্তেজনা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ।
চতুর্থত, ভবিষ্যতে ইরানের বিরুদ্ধে কোনও ধরনের সামরিক আগ্রাসন না করার নিশ্চয়তা চেয়েছে তারা। ইরান জানিয়েছে মার্কিন মুলুককে এটি স্পষ্ট করতে হবে ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র বা তাঁর কোন মিত্র দেশ তাদের উপর অগ্রাসনী পদক্ষেপ নেবে না তা নিশ্চিত করতে হবে। একটি আনুষ্ঠানিক ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে এই নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চায় ইরান।
পঞ্চমত, যুদ্ধ এবং সংঘাতের ফলে ইরানের যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তার জন্য ক্ষতিপূরণের দাবিও এই প্রস্তাবে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এটি কূটনৈতিকভাবে একটি কঠিন শর্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ষষ্ঠত, সবচেয়ে বিতর্কিত বিষয়গুলির মধ্যে অন্যতম ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি। তারা তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অধিকার আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত করার দাবি জানিয়েছে। এই বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলির সঙ্গে বিরোধের কেন্দ্রে রয়েছে।
সপ্তমত, আঞ্চলিক সংঘর্ষ বন্ধ করার উপর জোর দিয়েছে তেহরান। বিশেষ করে, গাজা এবং লেবাননের মত দেশ, তাছাড়াও তাদের মিত্র গোষ্ঠীগুলির উপর হামলা বন্ধ করার কথাও প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়েছে, যা মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তর স্থিতিশীলতার সঙ্গে জড়িত।
অষ্টমত, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে একটি বাধ্যতামূলক শান্তি চুক্তির প্রস্তাব দিয়েছে ইরান, যাতে ভবিষ্যতে এই ধরনের সংঘাত এড়ানো যায়। তারা চায়, এই চুক্তি বহুপাক্ষিকভাবে স্বীকৃত হোক।
নবমত, যুদ্ধবিরতির সময়সীমার মধ্যে কূটনৈতিক আলোচনাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে। এই সময়কে “সুযোগের জানালা” হিসেবে দেখছে তেহরান, যেখানে সামরিক উত্তেজনা কমিয়ে আলোচনার পথ খোলা রাখা হবে।
দশমত, সামগ্রিকভাবে এই প্রস্তাবের মাধ্যমে ইরান তাদের কৌশলগত অবস্থান স্পষ্ট করেছে। ইরান সরাসরি সংঘর্ষ এড়াতে চাইলেও নিজেদের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক প্রভাবের প্রশ্নে কোনও আপস করতে রাজি নয়।
এই ১০ দফা প্রস্তাবের প্রতিটি দিকই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এবং জটিল। বিশ্লেষকদের মতে, এই শর্তগুলির অনেকটাই যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে তৎক্ষণাৎ মেনে নেওয়া কঠিন। তবুও এটিকে আলোচনার ভিত্তি হিসেবে ধরে এগোলে ভবিষ্যতে একটি বৃহত্তর কূটনৈতিক সমঝোতার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। অস্থায়ী যুদ্ধবিরতির আড়ালে যে তীব্র কূটনৈতিক লড়াই চলছে, এই প্রস্তাব তারই প্রতিফলন। এখন নজর থাকবে, দুই দেশের মধ্যে আলোচনা কতটা এগোয় এবং এই শর্তগুলি আদৌ কোনও স্থায়ী শান্তির পথ তৈরি করতে পারে কি না।