ওঙ্কার ডেস্ক: ইরান ও আমেরিকার মধ্যে সম্ভাব্য শান্তি আলোচনা ঘিরে উত্তেজনা ক্রমশ তীব্র হচ্ছে, আর সেই আবহেই দুই পক্ষের শীর্ষ নেতৃত্বের স্পষ্ট মধ্যে গভীর মতপার্থক্য ও অবিশ্বাস লক্ষ্য করা যাচ্ছে। শান্তি আলোচনা এবং মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়া এবং সরকারি বিবৃতিতে ইরানের নেতৃত্বের অবস্থান সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিচ্ছে আমেরিকার দাবির সামনে। অন্যদিকে ট্রাম্প শিবিরও জানিয়ে দিয়েছে তেহরানের কোন চাল সহ্য করবে না আমেরিকা। দুই পক্ষের এই বাক অভিঘাত স্থায়ী শান্তিচুক্তিকে আরও জটিল করে তুলছে বলে অভিমত অনেকের।
ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ প্রকাশ্যে জানিয়েছেন, লেবাননে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিরতি এবং ইরানের অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষার বিষয়গুলি নিশ্চিত না হলে কোনও আলোচনাই শুরু হবে না। তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন, যুদ্ধবিরতির প্রশ্নে আপস করার কোনও সুযোগ নেই এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করাই ইরানের প্রথম শর্ত। একই সুর শোনা গিয়েছে ইরানের বিদেশমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি-র বক্তব্যেও। তাঁর মতে, লেবাননে চলতে থাকা সংঘাত উপেক্ষা করে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা চালানো বাস্তবসম্মত নয় এবং তা হলে আলোচনার ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়বে।
অন্যদিকে, আমেরিকার তরফে সুর অনেকটাই কঠোর এবং সতর্কতামূলক। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স স্পষ্ট ভাষায় সতর্ক করে দিয়েছেন যে, আলোচনায় কোনও ধরনের কৌশলী চাল বা খেল বরদাস্ত করা হবে না। তিনি জানিয়েছেন লেবাননের বিষয়টি এই আলোচনার অংশ নয় এবং সেটিকে সামনে এনে আলোচনাকে জটিল করে তোলা হলে তা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। ভ্যান্স আরও ইঙ্গিত দিয়েছেন, ইরান যদি আলোচনায় আন্তরিকতা না দেখায়, তাহলে পরিস্থিতি আরও কঠোর হয়ে উঠতে পারে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর বক্তব্যে সেই কঠোরতার সুর আরও স্পষ্ট। তিনি জানিয়েছেন, ইরানের সঙ্গে কোনও সমঝোতা না হলে আমেরিকা বিকল্প পথেও যেতে প্রস্তুত। তাঁর মন্তব্যে সামরিক প্রস্তুতির ইঙ্গিতও মিলেছে, যা পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেছেন, লেবাননের সংঘাতকে এই আলোচনার সঙ্গে যুক্ত করার কোনও যৌক্তিকতা নেই এবং ইরানকে মূল ইস্যুতে ফিরে আসতে হবে।
উল্লেখ্য, দীর্ঘ পাঁচ সপ্তাহের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর পাকিস্তান এবং চিনের মধ্যস্থতায় গত বুধবার যুদ্ধ বিরতিতে রাজি হয়েছিল আমেরিকা এবং ইরান। যুদ্ধবিরতির শর্ত হিসাবে আমেরিকার সামনে ১০টি প্রস্তাব রাখে তেহরান। সেই ১০টি শর্তের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল পশ্চিম এশিয়ার স্থায়ী শান্তি। ইরান স্পষ্ট জানিয়েছিল যে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ গুলিতে মার্কিন বা তার কন মিত্র দেশের অগ্রাসন সহ্য করবে না তেহরান। আমেরিকাকে নিশ্চিত করতে হবে গাজা বা লেবাননে আমেরিকা অথবা তার মিত্র দেশ ভবিষ্যতে কোন হামলা চালাবে না। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানের এই শর্তের প্রেক্ষিতে কোন বিরুপ মন্তব্য করেনি।
অন্যদিকে ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতিনয়াহু ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতিকে সমর্থন জানালেও স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছিলেন লেবানন এই চুক্তির অংশ নয়, লেবাননের উপর হামলা ইজরায়েলের স্বার্থের সঙ্গে জরিত। যুদ্ধবিরতির ২৪ ঘন্টার মধ্যে লেবাননে হামলা করে ইজরায়েলি বাহিনী। লেবাননের দাবী অনুযায়ী ইজরায়েলি হামলায় ২৫০ জনেরও বেশি মৃত্যু হয়েছে তাদের দেশে। আবার, মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তানও ইজরায়েলের উপর ক্ষোভ উগরে দিয়েছে। পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খোয়াজা আসিফ লেবাননে ইজরায়েল হামলার প্রসঙ্গ তুলে নিজের এক্স হ্যান্ডেলে লেখেন, “ইউরোপিয়ান ইহুদিদের নরকে জ্বালিয়ে মেরে ফেলা উচিত”।
বর্তমানে সমস্ত পক্ষের অবস্থান একেবারেই বিপরীত মেরুতে দাঁড়িয়ে রয়েছে। একদিকে ইরান আঞ্চলিক সংঘাতকে আলোচনার পূর্বশর্ত হিসেবে তুলে ধরছে, অন্যদিকে আমেরিকা সেই শর্তকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে সরাসরি দ্বিপাক্ষিক আলোচনার উপর জোর দিচ্ছে। আবার ইজরায়েলও নিজের কঠোর অবস্থা থেকে সড়তে নারাজ। এবং অন্যদিকে মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তানও শান্তি সমঝোতার মাঝেই আক্রমণআত্মক মন্তব্য পুরো বিষয়টিকে আরও জটিল করে তুলছে। এই টানাপোড়েনের মধ্যে ইসলামাবাদের সম্ভাব্য বৈঠক এখন অনিশ্চয়তার মুখে, এবং আন্তর্জাতিক মহল গভীর উদ্বেগের সঙ্গে পরিস্থিতির দিকে নজর রাখছে।