অসীম সেন
বিশ্বকর্মা পুজোর দিন সকাল। মনোজ দা-দের বাড়ির মাথায় তখন মোমবাতি আর চাপরাস লড়াই করছে, সাদা কালো মোমবাতিটা বোধহয় দেড়তেল। বেশ কিছুটা টানাটানি হল। মোমবাতি হাওয়া থেকে বে হাওয়ায় যাচ্ছে বারবার। তুলনায় চাপরাসটা বেশ চৌখশ। যতবার মোমবাতি টানতে যায় ততবার মাথা নাবিয়ে নিচ্ছে টুক করে। একবার মোমবাতি বেশ খানিকটা বাগে পেয়ে গেল চাপরাসকে। বেকায়দায় পড়ে ভোকাট্টা। চাপরাস হাওয়ায় ভেসে যাচ্ছে। দূর থেকে আওয়াজ এল বিজয় উল্লাস।
ইস, একতেল কিন্তু বেশ ভালো খেলছিল। চাপরাসের অকাল প্রয়াণে বেশ দুঃখই পেলাম। বিজয় গর্বে মোমবাতি তরতর করে উপরের দিকে উঠছে। হঠাৎ হাওয়ায় ভেসে গেল মোমবাতি। চাপরাস ততক্ষণে নিজেকে সামলে নিয়েছে।
রাণাদা চেঁচিয়ে উঠল, শাবাস ! শালা ভলকা ছেড়েছিল। মোমবাতি ভেসে আসছে। দিদিমণির ছাদ পেরিয়ে তারকদের টালির চাল পেরিয়ে… আমরা লাঠিসোটা নিয়ে তৈরি। বড় ঘুড়ি, ভারি ঘুড়ি বোধহয় শিবুদাদের পুকুরেই পড়বে। বোধহয় কেন পড়বেই। ইস অস্ট্রেলিয়ান পেপার। অনেকটা সুতোও ছিল। তোতার আক্ষেপ। শীতলাতলা থেকে ছুটে আসা আমাদের প্রতিপক্ষরাও তখন হাল ছেড়ে দিয়েছে। নীলু একটি সুতোর দুপাশে ঢিল বেঁধে ছুঁড়ল মোমবাতির সুতো লক্ষ্য করে। নাগাল পেল না। হঠাৎ দমকা হাওয়া। না পুকুরে পড়বে না। আমি কালামানিকদাদের বাড়ির ওপর দিয়ে পশ্চিম মাঠ পেরিয়ে দারোগা দাদুদের বাগানে। ওপাড়ার প্রভাস, রাজা, নিরমা দৌড়ে আসছে।
সুবল কাকুদের বাড়ির ওপার থেকে রাণাদা চেচিয়ে বলল, সন্তু তুই ওদিকটা দেখ আমি এদের আটকাচ্ছি। বলেই ড্রেণের ওপর পার করার জন্য আমাদের ফেলে রাখা সুপুরি গাছটা রাণাদা এক ঝটকায় ফেলে দিল। তাতেও কি ওদের আটকানো যায় !
চেত্তা খেল মোমবাতি। সুতোটা আমার মাথার ওপর দিয়ে যাচ্ছে। ইস্ রানাদা বাপি হলে ঠিক হাত পেয়ে যেত। হাতের কাছে একটা সুপুরি গাছের পাতা পেয়ে গেলাম। হঠাৎ দেখি বড় কিছু একটা ঝাঁপিয়ে পড়ল। হাবুল কাকা। এই জন্যই পিছে পিছে সবাই ভগবানের লগা বলে। হাবুল কাকার হাতে মোমবাতি। যাক নিশ্চিত ওটা তাহলে আমাদের জিম্মাতেই থাকবে। নিরমা, নীলুর খালি গায়ে দরদর করে ঘাম ঝরছে। নিরমার কাদা মাখা পা দিয়ে রক্ত ঝরছে। খেজুর গাছে কাঁটা খেয়েছে নিশ্চই। যুদ্ধে হেরে যাওয়া সৈনিকদের মতন ফিরে যাচ্ছে নিরমা।
হাবুল দা ডাকল, শোন। নিরমা ফিরে তাকাল।
-নিয়ে যা। মানে কি ! আমাদের এত কষ্টে লোটা মোমবাতি! তাও আবার দেড়তেল, অস্ট্রেলিয়ান পেপার।
হাবুল দা হেসে চুল টা একটু ঘেটে দিল, তোদের তো আছে।
হেব্বি রাগ ধরেছিল সেদিন। মনে পড়ে রাগ ভাঙাতে হাবুল কাকা আমাদের সবাইকে জিলিপি খাইয়েছিল দুটো করে। আজ আর রাগ নেই। নিরমাটা সেদিন খুব খুশি হয়েছিল।