নিজস্ব সংবাদদাতা : তৃণমূলের শহীদ দিবসের মঞ্চে আসেন পহেলগাঁওর জঙ্গি হামলায় নিহত বিতান অধিকারীর বিতানের বাবা-মা। মুখ্যমন্ত্রী তাঁদের হাত ধরে মঞ্চে নিয়ে গিয়ে বসান। জঙ্গি হামলারপর উধমপুরে তল্লাশি চালাতে গিয়ে গুলির লড়াইয়ে মৃত্যু হয় নদিয়ার তেহট্টের পাথরঘাটার বাসিন্দা ৩৬ বছরের জওয়ান ঝন্টু আলি শেখ। তাঁর বাবাও এসেছেন ধর্মতলায় তৃণমূলের মঞ্চে। মমতা বলেন, ‘‘আমি সম্মান জানাই সমস্ত শহিদের পরিবারকে। ঝন্টু আলি শেখের বাবা সবুজ আলি শেখ এসেছেন। বিতান অধিকারীর বাবা বীরেশ্বর অধিকারী ও মা মায়া অধিকারী এসেছেন। তাঁদের সম্মান জানাই।’’
এদিন মমতার মমতার নিশানায় সিপিএম, চড়া সুর বিজেপির বিরুদ্ধে। মমতা বলেন, ‘‘এই সংগ্রাম চলবে, সেদিন শেষ হবে যেদিন দিল্লিতে পরিবর্তন হবে। আর বামেদের কথা ছেড়ে দিন। সোশ্যাল নেটওয়ার্কিংয়ে টাকা খেয়ে বসে আছে।’’ তাঁর সংযোজন, ‘‘আমরা এখানে ৪০ শতাংশ বেকারত্ব কমিয়েছি। এটা বাংলার মানুষের গর্ব। আপনারা ১০০ দিনের কাজ বন্ধ করে দিয়ে কী ভেবেছিলেন ? বাংলা করতে পারে না ? আমরা পেরেছি।’’

কয়েক মাস পরেই রাজ্যে ভোট। এরই মধ্যে একের পর এক দুর্নীতিতে বিধ্বস্ত রাজ্য সরকার। নিয়োগ দুর্নীতি হোক বা মহিলা নিরাপত্তা সবেতে নাম জড়িয়েছে তৃণমূলের। তবে শাসক শিবিরের ভরসা একটাই উন্নয়নের আশ্বাস আর বাংলার ‘মাটি-মানুষ’-এর ভাবাবেগ। আর সেই সুরেই একুশের শহিদ সমাবেশ থেকে ছাব্বিশের লড়াইয়ের বার্তা দিলেন তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
তৃণমূলের এই লড়াই যে সহজ হবে না, তা একাধিক ঘটনায় স্পষ্ট। ২০২২ সালে নিয়োগ দুর্নীতিতে প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায় গ্রেপ্তার হওয়ার পর একে একে জেলে গিয়েছেন অনুব্রত মণ্ডল, জ্যোতিপ্রিয় মল্লিকের মতো হেভিওয়েট নেতারা। যদিও শাসক শিবিরের দাবি, এই সমস্ত গ্রেপ্তারি নিছকই কেন্দ্রের রাজনৈতিক ‘খেলা’। অনুব্রত-জ্যোতিপ্রিয় এখন জামিনে মুক্ত। তৃণমূল নেতৃত্ব বলছে, কেন্দ্রীয় এজেন্সির ‘অতিসক্রিয়তা’ ছাড়া আর কিছুই নয়।
অন্যদিকে রাজ্যের শাসক দলের সামনে এই মুহূর্তে সবথেকে বড় চ্যালেঞ্জ চাকরিহারা শিক্ষকরা। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে চাকরি হারিয়েছেন প্রায় ২৬ হাজার শিক্ষক-শিক্ষাকর্মী। সেই ক্ষত মেরামতের চেষ্টা করছে রাজ্য সরকার। ডিসেম্বর পর্যন্ত বেতন-সহ চাকরিতে থাকার আদেশ, শিক্ষাকর্মীদের ভাতার ব্যবস্থা এবং নতুন নিয়োগ প্রক্রিয়া একে একে ঘোষণা করে রাজনৈতিক ক্ষতি পুষিয়ে দেওয়ার চেষ্টায় তৃণমূল। তবুও এই ক্ষতিপূরণ কতটা করতে পারবে সে নিয়ে বিস্ময় থেকেই যাচ্ছে।
সম্প্রতি রাজ্যে একের পর এক চাঞ্চল্যকর অপরাধের ঘটনাও শাসক শিবিরের মাথাব্যথার কারণ। আর জি কর হাসপাতালে চিকিৎসক তরুণীর ধর্ষণ ও খুন এই ঘটনায় কলকাতা পুলিশের তদন্তকেই সিবিআই অনুমোদন দিয়েছে। দোষী প্রমাণিত সিভিক ভলান্টিয়ারকে আদালত ইতিমধ্যেই যাবজ্জীবন সাজা শুনিয়েছে। চিকিৎসকদের নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। কসবার আইন কলেজে গণধর্ষণ কাণ্ডেও কড়া পদক্ষেপ, অভিযুক্তদের জেলে পুরে বার্তা দিতে চেয়েছে সরকার। একইসঙ্গে কলেজে ইউনিয়ন রুম বন্ধের হাই কোর্টের নির্দেশ মেনে নতুন করে শৃঙ্খলা আনার উদ্যোগও স্পষ্ট। কিন্তু বারবার তৃণমূল সংগঠনের নাম জড়িয়েছে এবং তাদেরই দায়ী করেছেন মানুষ।
এদিকে একশো দিনের প্রকল্পের টাকা এবং বাংলার বাড়ি প্রকল্প নিয়ে কেন্দ্র-রাজ্য দ্বন্দ্ব নতুন কিছু নয়। কেন্দ্র টাকা আটকে রাখার অভিযোগ এনে কেন্দ্র কে কটাক্ষ করতে পিছপা হননি মমতা। তিনি বলেছেন, “রাজ্য সরকার বিকল্প রাস্তা বের করে শ্রমিকদের কর্মদিবস বাড়িয়েছে, ঘর তৈরির টাকা দিচ্ছে নিজস্ব কোষাগার থেকে”।
তৃণমূলের বিরুদ্ধে ভোটব্যাঙ্ক পলিটিক্সের অভিযোগে সরব বিরোধীরা। বারবার বলা হচ্ছে, অবাধ অনুপ্রবেশে রাজ্যে গণতান্ত্রিক ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। কিন্তু সীমান্তের দায়িত্ব যে বিএসএফ-এর, সেই যুক্তি তুলে কেন্দ্রকেই নিশানা করছেন মমতা। উল্টোদিকে বাংলাভাষা-অপমান ইস্যুতে সরব হয়েছে তৃণমূল। অন্য রাজ্যে বাংলায় কথা বলায় হেনস্তার ঘটনায় কলকাতা হাই কোর্টও কেন্দ্রকে জবাবদিহি করতে বলেছে। সেই আবেগকে হাতিয়ার করেই ফের বাঙালিয়ানার ঝাণ্ডা তুলেছেন ‘দিদি’। ভোটের আগে শহিদ মঞ্চ থেকেই তাই ছাব্বিশের যুদ্ধের রূপরেখা স্পষ্ট করে দিলেন তৃণমূল সুপ্রিমো।
