ওঙ্কার ডেস্ক: তারাতলা কান্ডে বৃহস্পতিবার বিধানসভায় বক্তব্য রাখেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। নিজের বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি পুর্ববর্তী তৃণমূল সরকারকে তুলোধনা করেন। তিনি বিধানসভায় উপস্থিত তৃণমূল বিধায়কদের উদ্দেশ্যে বলেন, “আপনারা কলকাতাকে মৃত্যুপুরি বানিয়েছেন”। তিনি তৃণমূল সরকারের কাটমানি এবং অবৈধ এলাকায় নির্মানের অনুমতি নিয়ে চরম কটাক্ষ করেন। তিনি জানান, এই অপরাধের মাশুল সাধারণ মানুষদের দিতে হচ্ছে। পাশাপাশি মুখ্যমন্ত্রী দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের অর্থসাহায্যের ঘোষণা করেছেন। তিনি জানিয়েছেন মৃতদের পরিবারকে ১০ লক্ষ টাকা এবং আহতদের ১ লক্ষ টাকা দেওয়া হবে সরকারের তরফ থেকে। এবং চিকিৎসার যাবতীয় খরচ রাজ্য সরকার বহন করবে।
তারাতলায় নির্মীয়মাণ গুদাম ধসের ঘটনায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৯-এ পৌঁছেছে। এখনও পর্যন্ত ধ্বংসস্তূপের নীচ থেকে মোট ২৯ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ১৫ জনের অবস্থা স্থিতিশীল বলে হাসপাতাল সূত্রে জানা গিয়েছে। চারজন আহতের চিকিৎসা চলছে এবং একজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। মৃতদের মধ্যে পাঁচজনের দেহ ইতিমধ্যেই পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে, বাকি চারজনের ময়নাতদন্তের প্রক্রিয়া চলছে বলে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।
দুর্ঘটনার পর থেকেই যুদ্ধকালীন তৎপরতায় উদ্ধারকাজ শুরু হয়। সেনাবাহিনীর ২১৫ জন জওয়ান, জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী (এনডিআরএফ), সিভিল ডিফেন্স, দমকল ও জরুরি পরিষেবা, স্বাস্থ্য দপ্তর, কলকাতা পুরসভা এবং পুলিশ যৌথভাবে উদ্ধার অভিযানে অংশ নেয়। বিশাল কংক্রিটের স্ল্যাব, লোহার বিম এবং ধসে পড়া কাঠামোর নীচে আটকে পড়াদের খোঁজে দিনরাত এক করে কাজ করেন উদ্ধারকর্মীরা। প্রশাসনের দাবি, এই সমন্বিত তৎপরতার ফলেই বহু শ্রমিককে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।
ঘটনার তদন্তে নেমে পুলিশ ইতিমধ্যেই পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেছে। ধৃতদের মধ্যে রয়েছেন গুদামের মালিক শম্ভুনাথ বেহেরা, কমল সামন্ত, সুপারভাইজার সৈয়দ মহম্মদ গুলজার, শ্রমিক সরবরাহকারী মহম্মদ আতাউল এবং সুভাষ সরকার। এছাড়াও মোট ন’জনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তদন্তকারীরা নির্মাণ সংক্রান্ত নথি, অনুমোদন প্রক্রিয়া, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং নির্মাণসামগ্রীর মান খতিয়ে দেখছেন। দিবাকর ভাণ্ডারী-সহ আরও কয়েকজনের ভূমিকা নিয়েও তদন্ত চলছে।
ঘটনার পর মুখ্যমন্ত্রী ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন এবং হাসপাতালে গিয়ে আহতদের সঙ্গে দেখা করেন। নিহতদের পরিবারকে ১০ লক্ষ টাকা এবং আহতদের ১ লক্ষ টাকা করে আর্থিক সাহায্যের ঘোষণা করা হয়েছে। একই সঙ্গে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্তের জন্য একটি উচ্চপর্যায়ের বিশেষ তদন্তকারী দল (সিট) গঠন করেছে রাজ্য সরকার। এই কমিটির নেতৃত্বে রয়েছেন রাজেশ পাণ্ডে। সদস্য হিসেবে রয়েছেন খলিল আহমেদ, রাজেশ কুমার সিনহা, স্মিতা পাণ্ডে এবং রচনা ভগত। চার সপ্তাহের মধ্যে তদন্ত রিপোর্ট জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বিধানসভায় এই ঘটনা নিয়ে তীব্র রাজনৈতিক চাপানউতোর শুরু হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী দাবি করেছেন, নির্মাণ প্রকল্পের অনুমোদন সংক্রান্ত নথি এবং জমির পারমিট তাঁর কাছে রয়েছে, যেখানে তৎকালীন পুর কর্তৃপক্ষের স্বাক্ষর রয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী জানান এই দুর্ঘটনা প্রশাসনিক ব্যর্থতা এবং দুর্নীতির ফল। তাঁর অভিযোগ, কলকাতাকে ‘মৃত্যুপুরী’তে পরিণত করা হয়েছে এবং শুধুমাত্র অর্থ লুটের রাজনীতি হয়েছে। গার্ডেনরিচের বহুতল ধসের ঘটনার প্রসঙ্গ টেনে এনে তিনি বলেন, বারবার একই ধরনের দুর্ঘটনা ঘটলেও শিক্ষা নেওয়া হয়নি। তিনি ফিরহাদ হাকিম-সহ প্রাক্তন পুর প্রশাসনের একাধিক কর্তাব্যক্তির ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন এবং ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানান।
এদিন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী রাজ্য সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপ হিসাবে জানান, কলকাতা পুরসভা, রাজারহাট-নিউটাউন, মহেশতলা, বজবজ, উলুবেড়িয়া, বিধানগর, সোনারপুর ও বারুইপুর-সহ একাধিক পুর ও নগর এলাকার অনুমোদিত নির্মাণ পরিকল্পনা আগামী চার সপ্তাহের মধ্যে অডিটের আওতায় আনা হবে। তদন্তের আগে কোন নির্মিয়মান ভবনে কাজ করতে দেওয়া হবে না। অতীতে অনুমোদন পাওয়া প্রতিটি বহুতল ও বড় নির্মাণ প্রকল্প খতিয়ে দেখা হবে বলেও ঘোষণা করা হয়েছে। প্রশাসনের তরফে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথা জানিয়ে বলা হয়েছে, কোনও অনিয়ম ধরা পড়লে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।