সুনন্দা দত্ত, হুগলী: ভদ্রেশ্বরের তেঁতুলতলা বারোয়ারি জগদ্ধাত্রী পুজো এমন এক প্রাচীন ঐতিহ্যের সাক্ষী, যা আজও ব্যতিক্রম হিসেবে নজর কাড়ে সমগ্র হুগলি জেলাজুড়ে। এখানকার পুজোয় দেবী বরণের বিশেষ রীতিতে পুরুষরাই সেজে ওঠেন মহিলাবেশে। মাথায় ঘোমটা, কপালে সিঁদুর, পরনে শাড়ি এই সাজে এয়োস্ত্রী সেজে বরণ-ডালা হাতে দেবী জগদ্ধাত্রীকে স্বাগত জানান তারা। কয়েক শতাব্দী পুরনো এই প্রথা এখনও অবিকল পালন করা হয়, যা স্থানীয়দের কাছে গর্বের বিষয়।
জনশ্রুতি রয়েছে, ইংরেজ শাসনকালে ভদ্রেশ্বরের গৌরহাটি এলাকায় ছিল এক বড় ইংরেজ ছাউনি। চারিদিকে জঙ্গলে ঘেরা এই অঞ্চলে নিরাপত্তাহীনতা ছিল চরম। ব্রিটিশ সৈন্যদের টহলে মহিলারা বাইরে বেরোতে ভয় পেতেন। সেই সময়ে ঘরের সমস্ত ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের দায়িত্ব নিতেন পরিবারের পুরুষরাই। দেবী বরণের ক্ষেত্রেও সেই প্রথা বজায় ছিল। মহিলাবেশে সেজে পুরুষরাই বাইরে গিয়ে দেবীকে বরণ করতেন। সময়ের সঙ্গে যুগ পাল্টেছে, সমাজের ধরন বদলেছে, কিন্তু এই বিশেষ রীতি আজও অটুট আছে তেঁতুলতলা বারোয়ারির জগদ্ধাত্রী পুজোয়।
স্থানীয় ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, কৃষ্ণনগরের রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের দেওয়ান দাতারাম সুর একসময় গৌরহাটিতে বাস করতেন। তাঁর দুই বিধবা কন্যার ইচ্ছা ও রাজার অনুমতিতে তিনিই প্রথম নিজের বাড়িতে জগদ্ধাত্রী পুজোর সূচনা করেন। পরে সেই পুজো স্থানান্তরিত হয়ে আসে ভদ্রেশ্বরের তেঁতুলতলায়। সময়ের সঙ্গে এটি রূপ নেয় সর্বজনীন পুজোয়, যার নাম হয় ‘তেঁতুলতলা বারোয়ারী’। স্থানীয়দের কাছে এই পুজো আজও ‘বুড়িমা’র পুজো’ নামে পরিচিত।
২৩৩ বছরের পুরনো এই পুজোয় এখনো রীতিনীতির তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি। প্রতি বছর পুরুষদের বরণ পর্ব এই পুজোর অন্যতম আকর্ষণ। সকাল থেকেই সাজগোজ শুরু হয় কেউ পরে লাল পাড় সাদা শাড়ি, কেউ গায়ে দেয় চন্দন, কেউ আবার হাতে নেয় বরণ ডালা। এভাবেই শোভাযাত্রায় বের হন তারা, সঙ্গে বাজে ঢাক, শঙ্খ আর উলুধ্বনি। কমিটির সদস্যরা জানিয়েছেন তাঁদের এই পুজো দেখতে প্রতি বছরই দর্শনার্থীদের ভিড় হয়। তাঁদের মতে এইভাবে মহিলা বেশে মা-এর পুজো করে নিজেদের ভাগ্যবান বলে মনে করেন। শুধু ভদ্রেশ্বরই নয়, চন্দননগরের তেমাথা রানীমার পুজোতেও দেখা যায় একই প্রথা পুরুষরা মহিলাবেশে দেবীকে বরণ করেন।
