নিজস্ব সংবাদদাতা: ভিনরাজ্যে বাঙালি শ্রমিকদের উপর হামলা ও হেনস্থার খবর ঘিরে তীব্র আলোড়ন ছড়িয়েছে রাজ্যজুড়ে। তোলপাড় রাজ্য-রাজনীতি। এর প্রতিবাদে রাস্তায় নেমেছিলেন খোদ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায় এবং সঙ্গে ছিলেন অভষেক বন্দোপাধ্যায় সহ বাংলার শাষক দলের তাবড় তাবড় নেতারা। ভাষাজনিত বিদ্বেষের বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন বাংলার বহু বিশিষ্ট শিল্পী, অভিনেতা ও সংস্কৃতিমনস্ক মানুষ। একদিকে শহর জুড়ে বিক্ষোভ মিছিল, অন্যদিকে শাসকদলের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন অনেকে।
জনপ্রিয় সঙ্গীতশিল্পী রূপঙ্কর বাগচী জানিয়েছেন, এমন অমানবিক ঘটনার কথা কল্পনাতেও আসেনি। তাঁর কথায়, ‘‘খুবই দুঃখজনক ও একেবারেই অনুচিত। যারা এই ঘটনা ঘটাচ্ছে, তাদের তীব্র ধিক্কার। আর যারা আক্রান্ত, তাঁদের জন্য রইল সহানুভূতি। নিজে একজন বাঙালি, এই ভাষার জন্যই কাজ করি। যাঁরা বাংলায় কথা বলছেন, তাঁদের উপর এমন হামলা খুবই অনভিপ্রেত”। অভিনেত্রী-নৃত্যশিল্পী মমতাশঙ্কর বলেছেন, মাতৃভাষা বাংলার প্রতি তাঁর গর্ব এবং ভালোবাসার কথা। তিনি বলেন, ‘‘বাংলা আমার মাতৃভাষা। বাংলায় কথা বলাই আমার স্বাচ্ছন্দ্য। বিদেশি অতিথি এলে তাঁদের জন্য বিদেশি ভাষা ব্যবহার করতেই হয়। বিদেশে গেলে আমিও ইংরেজিতেই কথা বলি। প্যারিসে গিয়ে বাংলায় কথা বলা অযৌক্তিক। কিন্তু নিজের দেশে অন্য ভাষাভাষীদের সঙ্গে হিন্দিতে কথা বলার চেষ্টা করলেও তার জন্য এভাবে প্রতিবাদ, গালাগালি বা মারধর একেবারেই নয়”। ভাষা বির্তকে সরব হয়েছেন কৈশিক সেনও। তিনি বলেছেন, ‘‘এ ধরনের ঘটনা একেবারেই কাম্য নয়। রাজনৈতিক দলগুলির দলমত নির্বিশেষে ভাবা উচিত, আক্রান্তরা সবাই খেটে খাওয়া মানুষ। আমাদের কাছে প্রমাণ আছে আমরা বাঙালি না বাংলাদেশি। কিন্তু যাঁদের সঙ্গে এমন হচ্ছে, তাঁদের মধ্যে অনেকেই গরিব, নথি-পত্রও ঠিক মতো নেই। পেটের দায়ে কাজের জন্য বাইরে যাচ্ছেন, আর সেখানে এমন হেনস্তা খুবই দুর্ভাগ্যজনক”।
অন্যদিকে এই বির্তকে বাংলার শাষক দলকেও কটাক্ষ করেছেন কিছু শিল্পী। তাঁদের মধ্যে মমতা বন্দোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে মিছিল প্রসঙ্গে অভিনেতা ঋতব্রত মুখোপাধ্যায়ের মন্তব্য, ‘‘শাসকদলের নেতা-মন্ত্রীদের মুখের ভাষা আর ধর্ষণ নিয়ে ব্যাখ্যা শুনলে কি বাঙালির মুখ উজ্জ্বল হয়? প্রতিবাদ মিছিল ভালো, তবে এ যেন আয়নায় মুখ না দেখার অজুহাত নয়”। তিনি আরও বলেন, “আমরা যখন অন্য রাজ্যে কাজ করতে যাই, তখন শোনা যায়, এখানে স্বচ্ছভাবে কাজ করতে দেয় না। সেটা নিয়েও কি কথা হবে?’’ ঋতব্রতর পাশাপাশি তৃণমুলের বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন রুদ্রনীল ঘোষ। তাঁর কটাক্ষ, ‘‘বাঙালির প্রতি যদি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আর তাঁর দলে বিন্দুমাত্র শ্রদ্ধা থাকত, তাহলে বাংলায় যেভাবে নিজেরাই বাঙালিদের লুট করছেন, তার বিরুদ্ধে আগে মিছিল করতেন। বাংলাদেশিদের ভুয়ো ভোটার ও আধার কার্ড পাইয়ে দেওয়া বিষয়টি নতুন নয়। মুর্শিদাবাদ, মালদহ থেকে ভুয়ো ভোটার তৈরি হচ্ছে। পঞ্চায়েত নেতারা ধরা পড়ছেন। এই লুটের রাজত্বের জন্যই গরিব বাঙালিদের ভিনরাজ্যে কাজের জন্য যেতে হচ্ছে। যাঁদের আটকানো হচ্ছে, তাঁদের মধ্যে অনেকে বাংলাদেশি, যাদের তৃণমূল সাহায্য করেছে। দিল্লি হাই কোর্টও বলেছে, এদের বার করে দিতে হবে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই ঘৃণ্য রাজনীতি দেশের সার্বভৌমত্বকেই শেষ করে দিচ্ছে”।
দেশের রাজনৈতিক মহল মনে করছে, ভিনরাজ্যে বাঙালিদের হেনস্তার অভিযোগ সামনে আসতেই শাসক-বিরোধী দুই শিবিরেই বিতর্কের পারদ চড়ছে। তাতে ক্ষুব্ধ সাধারণ মানুষও। মাতৃভাষা আর সম্মানের লড়াই কি রাজনৈতিক খেলার বলি হবে সেই প্রশ্নেই অস্থির বাংলা ও বাঙ্গালীর আবেগ।
