মৌসুমী পাল
ভারতের দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত গ্রেট নিকোবর দ্বীপকে ঘিরে কেন্দ্র সরকারের উচ্চাভিলাষী উন্নয়ন পরিকল্পনা আন্তর্জাতিক কৌশলগত মহলে বিশেষ গুরুত্ব পেতে শুরু করেছে। দিল্লির মতে, ভারত মহাসাগর ও প্রশান্ত মহাসাগরের সংযোগস্থলের কাছাকাছি অবস্থিত এই দ্বীপ ভবিষ্যতে ভারত এবং চিনের জন্য এমন এক কৌশলগত কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে, যা আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। ভারতের তরফ থেকে এই দাবি কতটা যুক্তিসঙ্গত সেই নিয়ে সংশয়ও প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক মহলের একাংশ।
আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের সবচেয়ে দক্ষিণে গ্রেট নিকোবর দ্বীপ। এর ভৌগোলিক অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি মালাক্কা প্রণালীর খুব কাছাকাছি। বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ এই মালাক্কা প্রণালী দিয়ে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পরিচালিত হয়। পূর্ব এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে জ্বালানি ও পণ্য পরিবহণের ক্ষেত্রে এই সমুদ্রপথের গুরুত্ব অপরিসীম। বিশেষ করে চিনের বিপুল পরিমাণ তেল আমদানি এবং রপ্তানি বাণিজ্য এই রুটের উপর নির্ভরশীল।
এই পরিস্থিতিতে গ্রেট নিকোবরকে একটি গভীর সমুদ্রবন্দর, আন্তর্জাতিক মানের বিমানবন্দর, আধুনিক নগর কেন্দ্র এবং উন্নত পরিকাঠামো সমৃদ্ধ কৌশলগত কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা নিয়েছে ভারত সরকার। এই প্রকল্পের টেন্ডার পেয়েছে পদ্মশিবির ঘনিষ্ট আদানি গোষ্টী। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ভারতীয় নৌবাহিনী, উপকূলরক্ষী বাহিনী এবং বিমানবাহিনীর কার্যক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে বলে দাবি করা হচ্ছে। একই সঙ্গে ভারত মহাসাগর অঞ্চলে নজরদারি এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানানোর সক্ষমতাও বাড়বে বলে অভিমত দিল্লির।
গ্রেট নিকোবরের অবস্থান ভারতের জন্য একটি বড় কৌশলগত সুবিধা এনে দিতে পারে। মালাক্কা প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী বাণিজ্যিক ও সামরিক জাহাজের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করার ক্ষেত্রে এই দ্বীপ অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে। ফলে ভারত নিজের সামুদ্রিক নিরাপত্তা জোরদারের পাশাপাশি ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলেও নিজের উপস্থিতি শক্তিশালী করতে সক্ষম হবে।
বিশ্ব রাজনীতিতে বর্তমানে চিনের ক্রমবর্ধমান সামুদ্রিক প্রভাব এবং দক্ষিণ চিন সাগর থেকে ভারত মহাসাগর পর্যন্ত তাদের সক্রিয় উপস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন বহু দেশ। এই প্রসঙ্গে একাধিক বার সরব হয়েছে আমেরিকা। প্রশান্ত মহাসাগরে চিনা আধিপত্যকে ‘হুমকি’ বলেও মনে করে ওয়াশিংটন। এই প্রেক্ষাপটে গ্রেট নিকোবরকে ঘিরে ভারতের উদ্যোগকে অনেক বিশ্লেষক দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত বিনিয়োগ হিসেবে দেখছেন। তাঁদের মতে, ভবিষ্যতে এই দ্বীপ ভারতের জন্য এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে, যেখান থেকে গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথের ওপর নজর রাখা সম্ভব হবে।
গ্রেট নিকোবর প্রজেক্টকে ঘিরে আর একটি বিতর্ক উঠে আসছে। ভারতের এই প্রকল্প কী আদৌ প্রশান্ত মহাসাগরে চিনা আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করেত সক্ষম এবং ভারতের সামরিক পরিকাঠামোকে মুজবুত করতে গ্রেট নিকোবর প্রকল্প কতটা জরুরী। সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে গ্রেট নিকোবরের ঠিক উপরেই রয়েছে মালেশিয়ার কোকো দ্বীপ, যা বর্তমানে চিনের অধীনে। প্রশান্ত মহাসাগরে চিনা আধিপত্যের জন্য এই দ্বীপ খুবই গুরত্বপুর্ণ। নিজেদের আধিপত্য বিস্তারের পথে বেজিং-এর অগ্রাসন নীতিকে একেবারে উড়িয়ে দিতে চাইছে না নয়া দিল্লি। সেই কারণেই ভারতের মূল ভূখণ্ড থেকে দূরে নিজের ভূমিকে রক্ষা করার জন্য গ্রেট নিকোবরে সামরিক শিবির থাকা অত্যান্ত জরুরি বলে অভিমত। পাশাপাশি মালাক্কা প্রণালী চিনের জন্য খুব গুরুত্বপুর্ণ একটি সামুদ্রিক পথ। গ্রেট নিকোবর থেকে মালাক্কা প্রণালী মাত্র ৪০ নটিক্যাল মাইল দূরে অবস্থিত। বিশেষজ্ঞদের মতে মালাক্কা প্রণালীর পশ্চিম দিকের প্রবেশপথে ভারতের অবস্থান চিনের আন্তর্জাতিক সরবরাহ পথকে পর্যবেক্ষণে রাখা এবং দরকারে কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি করা যেতে পারে, যা ভবিষ্যতে ভারতকে বিশেষ সুবিধা দিতে পারে।
কেন্দ্র এবং আদানি গোষ্টীর সম্মেলিত এই বৃহৎ প্রকল্পকে ঘিরে পরিবেশগত উদ্বেগও রয়েছে। গ্রেট নিকোবর জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ এবং সেখানে বিরল প্রজাতির প্রাণী ও উদ্ভিদের বাস। পরিবেশবিদদের আশঙ্কা, ব্যাপক পরিকাঠামো নির্মাণের ফলে বনভূমি, উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্র এবং স্থানীয় আদিবাসী সম্প্রদায়ের জীবনযাত্রার উপর প্রভাব পড়তে পারে। তাই উন্নয়ন ও পরিবেশ সংরক্ষণের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। কংগ্রেস নেতৃত্ব একাধিকবার এই বিষয়ে আলোকপাত করার চেষ্টা করেছেন। রাহুল গান্ধী নিজে গ্রেট নিকোবর সফরে গিয়ে এলাকা পরিদর্শন করে এসেছে। দিল্লির তরফ থেকে প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষা বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করলেও এখনও পর্যন্ত সংরক্ষণের জন্য কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি বা ভবিষ্যতের জন্য কোন প্রকল্পের কথাও জানানো হয়নি দিল্লির তরফে।
আন্তর্জাতিক কৌশলগত মহলের মতে, আগামী কয়েক বছরে গ্রেট নিকোবরের উন্নয়ন প্রকল্প কতটা সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়, তার উপর নির্ভর করবে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ভারতের প্রভাব কতটা বিস্তৃত হয়। ফলে গ্রেট নিকোবর এখন শুধুমাত্র একটি দ্বীপ নয়, বরং ভারতের সামুদ্রিক নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং ভূ-কৌশলগত ভবিষ্যতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে উঠে আসছে।