ওঙ্কার ডেস্ক: ভারতের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থার সামনে নতুন ধরনের সন্ত্রাসবাদী চ্যালেঞ্জ তৈরি হচ্ছে বলে সতর্ক করলেন নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও গোয়েন্দা আধিকারিকরা। সাম্প্রতিক সময়ে দেশে যেসব জঙ্গি মডিউল ধরা পড়েছে, তাদের অধিকাংশের সঙ্গেই লস্কর-ই-তইবা, জইশ-ই-মহম্মদ, আল-কায়দা বা ইসলামিক স্টেটের মতো আন্তর্জাতিকভাবে ঘোষিত জঙ্গি সংগঠনের প্রত্যক্ষ যোগাযোগ পাওয়া যায়নি। বরং এই সব গোষ্টি আদতে তাদেরই অনুপ্রেরণায় তৈরি হচ্ছে, এবং অনুকরণের পথ বেছে নিচ্ছে।
নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, এই কৌশল মূলত পাকিস্তানের মদতেই গড়ে উঠছে। কারণ আন্তর্জাতিক স্তরে সন্ত্রাসবাদে মদতের অভিযোগে ফের ফিনান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্ক ফোর্সের নজরদারির আওতায় পড়তে চায় না ইসলামাবাদ। অতীতে পাকিস্তান ‘গ্রে লিস্ট’-এ থাকার কারণে বড় অর্থনৈতিক চাপে পড়েছিল। বহু প্রচেষ্টার পর সেই তালিকা থেকে বেরিয়ে এলেও বর্তমানে দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি অত্যন্ত সংবেদনশীল। ফলে সরাসরি ঘোষিত জঙ্গি সংগঠনকে ব্যবহার না করে পরোক্ষভাবে নতুন মডিউল তৈরির পথেই এগোচ্ছে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই বলে মনে করা হচ্ছে।
গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, এখন আর আগের মতো সুসংগঠিত জঙ্গি কাঠামো তৈরি করা হচ্ছে না। বরং ছোট ছোট স্বনির্ভর গোষ্ঠী, ‘বাডি পেয়ার’ বা একক হামলাকারীদের ব্যবহার করার প্রবণতা বাড়ছে। এই কাজের জন্য ব্যাবহার করা হচ্ছে দেশের ‘ইয়ং মাইন্ড’-কে। এর ফলে গোয়েন্দা নজরদারি এড়ানো সহজ হচ্ছে এবং হামলার আগে বড় নেটওয়ার্কের হদিস পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, কোনও নির্দিষ্ট সংগঠনের নির্দেশে নয়, বরং অনলাইন প্রচার, উগ্রপন্থী সাহিত্য ও ডিজিটাল প্রোপাগান্ডায় প্রভাবিত হয়েই যুবকদের একাংশ চরমপন্থার দিকে ঝুঁকছে। আর এই মডিউলে সম্মানিক পেশাদারিত্বের মানুষজনও সমানভাবে সামিল রয়েছে।
নিরাপত্তা আধিকারিকদের বক্তব্য, বর্তমানে জঙ্গি সংগঠনগুলি সরাসরি নিজেদের নাম ব্যবহার না করে আদর্শগতভাবে প্রভাব বিস্তারের উপর জোর দিচ্ছে। ফলে যে কোনও মডিউল একাধিক জঙ্গি সংগঠনের মতাদর্শ থেকে প্রভাবিত হতে পারে। সম্প্রতি এমনও কয়েকটি গোষ্ঠীর খোঁজ মিলেছে, যাদের কার্যকলাপে আল-কায়দা ও জইশ-ই-মহম্মদ উভয়ের প্রভাব দেখা গিয়েছে। এর ফলে তদন্তকারীদের পক্ষে হামলার উৎস, অর্থের জোগান বা যোগাযোগের শৃঙ্খল চিহ্নিত করা আরও কঠিন হয়ে উঠছে।
নিরাপত্তা আধিকারকদের প্রকাশিত তথ্যের জলজ্যান্ত উদাহরণ হিসাবে দিল্লী লাল কেল্লা বিস্ফোরণের ঘটনা নেওয়া যেতে পারে। ডক্টর উমর নবী, দিল্লির লালকেল্লা বিস্ফোরণের প্রধান পরিকল্পনাকারী ভারতীয় উপমহাদেশে আল-কায়েদা-র একটি শাখা সংগঠন আনসার গাজওয়াত-উল-হিন্দ-এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। জাতীয় তদন্ত সংস্থার মতে, উমর পাকিস্তান মদতপুষ্ট সন্ত্রাসী সংগঠন জইশ-ই-মোহাম্মদের সাথেও উগ্রপন্থী সন্ত্রাসী সেলের অংশ হিসেবে যুক্ত ছিলেন। নিজের প্রভাব খাটিয়ে ফরিদাবাদে আল ফালাহ বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরেই ‘ডক্টর মডিউল’ তৈরি করেছিল, যা দেশে একাধিক হামলার পরিকল্পনা করেছিল।
খালিস্তানপন্থী কার্যকলাপের ক্ষেত্রেও একই কৌশল নেওয়া হচ্ছে বলে দাবি গোয়েন্দা মহলের। বাব্বর খালসা ইন্টারন্যাশনালের মতো ঘোষিত জঙ্গি সংগঠনকে সরাসরি সামনে না এনে গ্যাংস্টার নেটওয়ার্ক ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে আন্তর্জাতিক নজরদারি তুলনামূলক কম থাকে এবং গোটা চক্রকে ট্র্যাক করাও কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। ডিজিটাল মাধ্যম এখন এই নতুন ধরনের সন্ত্রাসবাদী নেটওয়ার্কের অন্যতম বড় হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, এনক্রিপ্টেড মেসেজিং অ্যাপ এবং অনলাইন র্যা ডিক্যাল কনটেন্ট ব্যবহার করে যুবকদের প্রভাবিত করার চেষ্টা চলছে। বিশেষ করে ছোট শহর ও সীমান্তবর্তী অঞ্চলে এই ধরনের কার্যকলাপের উপর নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক ইতিমধ্যেই দেশের প্রথম সমন্বিত সন্ত্রাসবিরোধী নীতি প্রহার চালু করেছে। এই নীতিতে সন্ত্রাসদমন, সাইবার নিরাপত্তা, উগ্রপন্থা রোধ এবং কেন্দ্র ও রাজ্যের সমন্বিত নিরাপত্তা ব্যবস্থার উপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। নিরাপত্তা মহলের মতে, ভবিষ্যতে ভারতের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হতে চলেছে এই ধরনের অসংগঠিত, ছোট কিন্তু বিপজ্জনক জঙ্গি মডিউলগুলিকে দ্রুত চিহ্নিত করে নস্যাৎ করা।